advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিদিশায় গ্যাঁড়াকলে জাতীয় পার্টি

মুহম্মদ আকবর
২৩ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ১৫:১৭
বিদিশা এরশাদ। ছবি : সংগৃহীত
advertisement

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিকের গ্যাঁড়াকলে পড়েছে জাতীয় পার্টি। এরশাদ-বিদিশার পুত্র শাহতা জারাব এরিককে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করেই বিদিশা জাপার নতুন রাজনীতির নকশা করছেন বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।

জাপার নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিদিশা সিদ্দিক রাজনীতি করার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তার রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাও জাতীয় পার্টিকে ঘিরে। কিন্তু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবদ্দশায় সাংসারিক জীবনের ইতি ঘটে যাওয়ায় এরশাদের অবর্তমানে তার স্ত্রীর পরিচয়ে স্বাভাবিকভাবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। সে কারণে সন্তানকে নিয়েই তিনি নাড়াচ্ছেন জাপার রাজনীতির ঘুঁটি।

উদাহরণ হিসেবে জাপার নেতারা বিদিশার ফেসবুক স্ট্যাটাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এরিকের প্রতি অবহেলার খবর গণমাধ্যমে আসার আগে থেকেই বিদিশা প্রতিনিয়ত জাপার বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে (জিএম কাদের) নিয়ে ফেসবুকে নেতিবাচক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সম্ভবত বিদিশা রাজনীতিতে আসার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করছেন জিএম কাদেরকে।

এর আগে তিনি গণমাধ্যমে রাজনীতিতে আসার আকাক্সক্ষার কথা গণমাধ্যমে বলেছেন। তিনি বলেছেন, এরশাদের স্ত্রী হিসেবে তিনি সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন। মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। ফলে তার পক্ষে রাজনীতি করা কঠিন হবে না বলেও গণমাধ্যমে ও ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি জানিয়েছিলেন।

যদিও এখন বিদিশা সিদ্দিকের সোজাসাপ্টা উত্তর, তিনি তার সন্তান এরিককে ছাড়া কিছুই চান না। জানতে চাইলে গতকাল শুক্রবার বিকালে আমাদের সময়ের সঙ্গে ফোনালাপে বলেন, আমার ছেলে এরিককে ছাড়া আমার কোনো চাওয়া নেই। ছেলের ভবিষ্যৎই আমার কাছে সব। এজন্য প্রেসিডেন্ট পার্কে থাকতে হবে এমন নয়। প্রেসিডেন্ট পার্ক ছাড়া কি আমার পরিচয় নেই? কিন্তু শুনতে পাচ্ছি আমার নামে যাচ্ছেতাই করা হচ্ছে। গুজব রটানো হচ্ছে। এ সবকিছু মিথ্যা, যা সত্য তা তো আমার ছেলে এরিকই বলে দিয়েছে। এরিককে নিয়মিত খাবার দেওয়া হচ্ছে না। ট্রিটমেন্টও করা হচ্ছে না। ফলে তার শরীরের ওজন কমে গেছে। এ জন্যই আমি আমার পুত্রকে আর একা থাকতে দিতে চাচ্ছি না।

গত ১৮ নভেম্বর এরশাদের ছোট ছেলে শাহতা জারাব এরিক তার মা বিদিশাকে বারিধারার বাসা প্রেসিডেন্ট পার্কে রাখতে গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডিতে এরিক বলেছেন, মা কাছে না থাকায় তার সেবা হচ্ছে না। তিনি প্রতিবন্ধী তাই মাকে নিজের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পার্কে রাখতে চান। জিডিতে এরিকের প্রতি অবহেলার জন্য চাচা জিএম কাদেরকে পরোক্ষভাবে দায়ী করেন এরিক।

তবে জিডির ঘটনাটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন প্রয়াত এরশাদের ছোট ভাই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি বলেন, এরিক একজন ‘স্পেশাল চাইল্ড’। আমার মনে হয় না, সে নিজে থেকে এসব (জিডি) করেছে। কেউ হয়তো তাকে দিয়ে করাচ্ছে। দলে বা দলের বাইরে তার কোনো শত্রু এ কাজ করাচ্ছে বলে মনে করেন জিএম কাদের।

এরিকের দেখভাল ঠিকমতো হচ্ছে না এ খবর যারা রাখেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের তৎকালীন একান্ত সচিব ও বর্তমান জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব) খালেদ আক্তার। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘তার খাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে না এটা ঠিক নয়। এরিকের জন্য প্রতিদিন যে হোটেল থেকে খাবার আনা হয় সেখানেও তার তথ্য আছে। এরিক সে খাবার রিসিভ করছেন কিনা সে তথ্যও আছে। ফলে এরিকের অবহেলা হচ্ছে এ অভিযোগ দিয়ে লাভ হবে না। আসলে এরিককে দিয়ে এসব করানো হচ্ছে। এরিককে ভুল বোঝানো হচ্ছে।

এর আগে ৭ এপ্রিল এরিকের ভরণপোষণের জন্য এরশাদ জীবদ্দশায় তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে ট্রাস্ট গঠন করেছেন। এরশাদের ব্যক্তিগত আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলামের ব্যবস্থাপনায় সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে ট্রাস্ট গঠন করা হয়। এ ট্রাস্টিতে এরশাদসহ পাঁচজন রয়েছেন। অন্যরা হলেন এরিক এরশাদ, এরশাদের একান্ত সচিব মেজর (অব) খালেদ আক্তার, চাচাতো ভাই মুকুল ও এরশাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তবে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ভাই জিএম কাদের নেই ট্রাস্টে। ট্রাস্টের সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে এরশাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসা, গুলশানের দুটি ফ্ল্যাট, বাংলামোটরের দোকান, রংপুরের কোল্ডস্টোরেজ, পল্লিনিবাস, রংপুরে জাতীয় পার্টির কার্যালয়, ১০ কোটি টাকার ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিট।

জাতীয় পার্টির এক প্রেসিডিয়াম সদস্য আমাদের সময়কে বলেন, পৈতৃক সূত্রে এরিকের পাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং এরশাদের দ্বিতীয় পুত্র হিসেবে জাপা রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ রয়েছে এরিকের। সে কারণে এরিককে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন এরিকের মা বিদিশা সিদ্দিক। এদিকে ভাতিজা হাতছাড়া হয়ে গেলে অর্থ ও রাজনীতি দুটো দিক থেকেই অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে সে জন্য খুব বুঝেশুনেই পা ফেলছেন জিএম কাদের।

এরশাদ ও বিদিশার দ্বন্দ্বের অবসান হয় দুজনের সম্পর্কের অবনতির মাধ্যমে ১৪ বছর আগে। কিন্তু আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী এরিককে রাখতেন পিতা এরশাদ প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায়। স্বাভাবিকভাবেই বিদিশাকে আলাদা থাকতে হয়। গত ১৪ জুলাই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মারা যান। এর পর থেকে বিদিশা এরিককে নিয়ে নানা শঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। অবশেষে গত ১৭ নভেম্বর বিদিশা প্রেসিডেন্ট পার্কে চলে যান। সেখানে যাওয়ার পর এরিকের অযতেœর খবর গণমাধ্যমে আসে। বিদিশার পাশাপাশি এরিকও গণমাধ্যমকে এসব অভিযোগের কথা গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেন।

জাপার আরেক নেতার ভাষ্য, বিদিশা তার সন্তানের কাছে এসেছেন। সন্তানও বলছেন তার কাছে থাকতে। ফলে এরশাদের পরিবারের কেউ বা জাতীয় পার্টির কেউ এখানে এসে হস্তক্ষেপের সুযোগ আইনিভাবে পাবে বলে মনে হচ্ছে না। বিদিশার সঙ্গে জিএম কাদেরের মিচ্যুয়াল ছাড়া এ দ্বন্দ্বের অবসান সম্ভব নয়। এ মিচ্যুয়াল হতে পারে একমাত্র জাপা রাজনীতিতে বিদিশাকে স্পেস দিয়ে, অন্যভাবে সম্ভব নয়। কিন্তু সেটা জাপার অন্য নেতারা বা এরশাদের প্রথম স্ত্রী সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ মানবেন কিনা এ সংশয় তো আছেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিএম কাদের আমাদের সময়কে বলেন, আমি কয়েকদিন ঢাকার বাইরে ছিলাম। এ কয়দিনে কী হয়েছে তা পুরোপরিভাবে জানতে পারিনি। আমি পুরা পরিস্থিতি অবজার্ভ করে বিস্তারিত গণমাধ্যমকে জানাব।

advertisement