advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পরিবহন খাতের স্বেচ্ছাচারিতা কি বন্ধ হওয়ার নয়

আহমদ রফিক,ভাষাসংগ্রামী কবি প্রাবন্ধিক ও গবেষক
২৫ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৯ ০৮:৫৭
advertisement

বাংলাদেশের পরিবহন খাত, যাকে বলে পাবলিক পরিবহন- বাংলায় জনপরিবহন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন থেকে চরম বিশৃঙ্খলা ও উচ্ছৃঙ্খল অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। এর প্রমাণ দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রতিদিনকার যাতায়াত পাতার সংবাদ। নিত্য সড়কে প্রাণ ঝরছে পথচলা মানুষের। সম্প্রতি পুলিশেরও রেহাই নেই বেপরোয়া বাসচালকের হাত থেকে। নিহত হয় পুলিশ।

স্কুলছাত্রী, কলেজছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী, নিরীহ পথচারী এমনকি ফুটপাতের কথিত নিরাপদ স্থানে দাঁড়ানো নর-নারী কারোরই জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই- একবার পথে বের হলে প্রাণটা নিয়ে ঘরে ফেরার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। উদাহরণ অনেক, অনেক। দুর্ভাগ্য যাদের তারা লাশ হয়ে ঘরে নয়, হাসপাতালের মর্গে। তারা খবরের কাগজের পাতায় শিরোনাম- সৌভাগ্যই বলতে হয়।

এই তো কদিন আগে এক সরকারি নারী কর্মকর্তা রাস্তার নিরাপদ স্থানে পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে রেহাই পেলেন না। তবে অর্ধেক সৌভাগ্য, একটা পায়ের বদলে প্রাণটা বেঁচে গেল, বাকি জীবন পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকা। তার এই সর্বনাশা ক্ষতি কে পূরণ করতে পারবে? বাসচালক না বাসমালিক না সড়ক পরিবহনের হর্তাকর্তা বিধাতারা? টাকা দিয়ে এসব ক্ষতি পূরণ হয় না।

আমরা বহুবার লিখেছি, প্রতি ঈদ উৎসবে ঘরে ফেরার আকাক্সক্ষায় কত প্রাণ যে হয় বলিদান, তার হিসাব কেউ রাখে না। যেসব পরিবারের ঈদ উৎসব প্রতিবছর একজনের অভাবে হারাম হয়ে যায়, সংসারটা চিরদিনের জন্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, শুধু সেই ভুক্তভোগীরাই বোঝেন স্বজন হারানোর মানসিক যন্ত্রণা এবং অর্থনৈতিক দুঃখ-কষ্ট। কী বুঝবে সেই উন্মাদ বাসচালক কিংবা তার মুনাফালোভী অর্থপিশাচ বাসমালিক?

গোটা পরিবহন ব্যবস্থাটা এজন্য দায়ী। মাস-মাইনের বদলে চুক্তিতে ড্রাইভার নিয়োগ যে বাড়তি ট্রিপ মারার লোভে বেপরোয়া গতিতে বাস চালায়, ওভারটেক করার নেশায় উন্মাদ, যায় পথচারীর প্রাণ যাক, পকেট তো ভরবে? মানবতাবোধহীন চালক কিংবা অদক্ষ হেলপার-চালক কেউ বোঝে না একটি প্রাণের কত দাম একটি সংসারের জন্য।

তেমনি ফিটনেসবিহীন তথাকথিত লক্কড়ঝক্কড় বাস, গায়ে রঙ চড়িয়ে ফিটনেসের বিশেষ সুবিধার তকমা নিয়ে রাজপথে নেমে কিংবা মহাসড়ক যাত্রায় কত সর্বনাশ যে ঘটায়, দুর্ঘটনার নামে পার পেয়ে যায় নামমাত্র শাস্তিতে- কিছু অর্থদ- বা দু-চার মাসের কারাবাস (সেটাও কদাচিত বড় একটা দেখা যায় না)। ঘটনাগুলো তো আমাদের চোখের সামনেই নিত্যদিন ঘটছে।

এক-একটি গুরুত্বপূর্ণ তথা ভিআইপি প্রাণহানির সড়ক ঘটনা (আমি দুর্ঘটনা বলি না, বলি হত্যাকা- ঘটনা) ঘটলে পরে সরকারের টনক নড়ে। পত্রপত্রিকাগুলো প্রচণ্ড ক্ষোভ ফেটে পড়ে। লেখা হয় অনেক সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় সড়ক আইন কঠোর করার জন্য। দাবির পর দাবি উঠতে থাকে।

বেশ কিছুদিন আগে নিরাপদ সড়ক চাই দাবিতে ছাত্রছাত্রীরা পর্যন্ত রাজপথে নেমে পড়েছিল সহপাঠী প্রয়াণের মর্মবেদনা প্রকাশ করতে, নিতান্তই স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায়। যাতায়াত ব্যবস্থা অচল করে দিয়েছিল। কোনো রাজনৈতিক দল তাদের ডাক দেয়নি, কথিত উসকানি দেয়নি। তাদের দমন করার পদ্ধতিটা ছিল রীতিমতো আপত্তিকর, অন্যায্য।

প্রতিদিন নিয়মিত মহাসড়কে-সড়কে প্রাণ ঝরছে। কখনো প্রতিবাদ। কখনো তা শেষ হয় প্রতিবাদহীন কান্নায়। প্রতিকারহীন এক পরিবহন ব্যবস্থা বাংলাদেশে। বাদ যায় না এই বেহিসেবিপনা থেকে রাজধানী ঢাকা তথা ঢাকার রাজপথ। সেখানেও মাঝে মধ্যে ছাত্রছাত্রীর রক্তে রঞ্জিত রাজপথ, কখনো শিশু বা নারীর। নির্বিকার সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। অথবা তারা পরিবহন খাতের অপশক্তির কাছে অসহায়।

পরিবহন ব্যবস্থার এমন এক অমানবিক চরিত্রের কারণে নিরাপদ সড়ক আইন তথা প্রচলিত দুর্বল আইন সংশোধনের দাবি উঠেছে দীর্ঘদিন থেকে। এক-একটি বিশেষ মৃত্যু সে দাবি জোরদার করেছে। প্রতিবাদ কখনো এক ব্যক্তির কণ্ঠে, কখনো সম্মিলিতভাবে, কখনো নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে।

তারেক-মিশুকের মৃত্যু বা ইলিয়াস কাঞ্চন ও কচিকাঁচাদের দাবির মুখে পরিবহন মালিকরা নির্বিকার। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মুখে সংসদে চঞ্চলতা, সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের আলোচনা, অবশেষে বোধোদয়। দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে সরকার পক্ষে নতুন সড়ক আইনের বিধিমালা তৈরি করা হলো। এটা ক্ষমতাসীন সরকার দলের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রতিশ্রুতি ছিল।

ব্যস, প্রতিবাদে শুরু হয়ে গেল হঠাৎ চমকের পরিবহন খাতে কর্মবিরতি, জনগণের চরম দুর্ভোগ। আমাদের বক্তব্য, পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের যেমন স্বার্থরক্ষার অধিকার আছে, তেমনি জনগণেরও অধিকার আছে তাদের জীবনের নিরাপত্তার। যাতায়াত ব্যবস্থাকে অচল করে জনগণকে জিম্মি রাখার অধিকার পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও তাদের সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেই।

দেশে অরাজক অবস্থা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অধিকার কারও নেই, নেই পরিবহন খাতে জঙ্গল আইন জারি রাখা, অবাধে পথচারীর মৃত্যু ঘটানোর। দাবি কখনো একতরফা হয় না। তা উভয়ত। তেমনি কর্মের নীতিগত দায়িত্ব সবারই থাকে। চালকের কম নয়, বরং বেশি। কারণ এ ক্ষেত্রে জীবন নিয়ে কথা।

নির্ধারিত গতিতে চলা, ওভারটেকিং না করা, যথাযথ স্থানে পার্কিং করা, যাত্রীকে ওঠানামার সময় দেওয়া- এ জাতীয় দায়িত্বগুলো কি সঠিকভাবে পালিত হয়? এই তো সেদিন পত্রিকার খবর- বাস থেকে নামার সময় পেলেন না রুমা। এ দায় কি বাসের হেলপার তথা সহকারী ও চালকের নয়? এমন দুর্ঘটনা তো কম ঘটে না? ক’জনের তাতে শাস্তি হতে দেখা গেছে? যদি রুমার ঘটনার কথাই বলি?

পরিবহন খাতের এই জনদুর্ভোগের নৈরাজ্য নিয়েই কি মালিক-শ্রমিক তাদের পরিবহন সাম্রাজ্য চালাবে? আর মাশুল গুনবে যাত্রী তথা সাধারণ মানুষ? তাই পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে সরকারকে নতি স্বীকার করলে চলবে না। তাতে জনস্বার্থ রক্ষিত হবে না। বরং জনস্বার্থের বিরোধিতাই করা হবে। উল্লিখিত ঘটনাগুলো কি যথাযথ নিরিখে মূল্যায়ন করা হয়, বিচার কিংবা শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়? প্রায়ই হয় না। বাস ছুটে পালিয়ে যায় আহত বা নিহত যাত্রীকে রাস্তায় ফেলে রেখে।

এখানে একটি বড় প্রশ্ন- সরকারের কাছে কি জনগণের স্বার্থ বড় নাকি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের অনাচারী স্বার্থ ও স্বেচ্ছাচারিতার মূল্য বড়? যেহেতু পরিবহন ধর্মঘট বা কর্মবিরতি ডেকে তারা দেশে যাতায়াত ব্যবস্থা অচল করে দিতে পারে, তাই জনদুর্ভোগ ঘটানোর সেই শক্তির মাধ্যমে মালিক-শ্রমিকরা নতুন সড়ক আইন সংশোধনের জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে হঠাৎ ধর্মঘট ডেকে।

নতুন সড়ক আইনে যদি কিছু ত্রুটি থাকে, অবশ্য সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে তা সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু পূর্বাহ্নে সংলাপে না বসে হঠাৎ ধর্মঘট ডেকে যাতায়াত ব্যবস্থা অচল করাও শ্রমিক আইনসম্মত নয়, আইএলওর তেমন বিধান নেই। নীতিটা হলো সংলাপ, সমঝোতার চেষ্টা, সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে ধর্মঘট।

বাংলাদেশের পরিবহন খাত এ যুক্তিসম্মত বিধিবিধান মেনে চলার ধার ধারে না। তাদের হাতে একটাই হাতিয়ার- হঠাৎ ধর্মঘটে যাতায়াত ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া। কিছু ত্রুটি যা এ আইনে আছে, শ্রমিক নেতা মঞ্জুরুল আহসান খানের মতে, তা হলো কঠোরতা যেখানে চালকদের ওপর, তা বাস্তব বিচারে হওয়া উচিত মালিকদের ওপর।

যেমন বাসের লাইসেন্স না থাকা বা যথাযথ ফিটনেস সার্টিফিকেট না থাকার দায়টা বাস বা ট্রাকের মালিকের, চালকের নয়। সে ক্ষেত্রে শাস্তিটা হতে হবে মালিকের, চালকের নয়। এসব ত্রুটি অনায়াসে সংশোধনযোগ্য। কিন্তু মোদ্দা কথা সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে।

চুক্তিভিত্তিতে নিযুক্ত চালক বেপরোয়া গতিতে চলে, কখনো ওভারটেকিংয়ে কখনো বাস ফুটপাতে তুলে মানুষ মারবে, এ স্বেচ্ছাচারের নামকাওয়াস্তে শাস্তি হবে, সেটাও তো মেনে নেওয়া যায় না। সড়ক হত্যার শাস্তি দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী হওয়া উচিত। নতুন আইনে মৃত্যুর মূল্য কঠোর ধারায় নির্ধারিত হওয়ার কথা।

কিন্তু বাংলাদেশে যুক্তিসঙ্গত আইন প্রায়ই প্রায়োগিক সুবিধা পায় না। আইন ক্ষমতাশালী-প্রতাপশালীর পক্ষে যায়। তাই শুক্রবারের (২২ নভেম্বর) একটি দৈনিকের খবর ‘আইন সংশোধনের আশ্বাস’ বা ‘কঠোর শাস্তি আপাতত প্রয়োগ নয়।’ যা আশঙ্কা করা গিয়েছিল শেষ পর্যন্ত তাই ঘটতে যাচ্ছে। জয় যানবাহন মালিকদের।

advertisement
Evall
advertisement