advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রাজনীতিকে হতে হবে সৃজনশীল এক কর্মপ্রবাহ

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ
২৭ নভেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০১৯ ০৩:১৬
ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। ফাইল ছবি
advertisement

বাংলাদেশের রাজনৈতিক চত্বর সব সময় এত উত্তপ্ত কেন? এখানে যুক্তির পরিবর্তে আবেগের প্রাচুর্য কেন এত বেশি? যারা প্রতিনিয়ত রাজনীতির মাঠ গরম করে রাখছেন, কেন তারা এত সংকীর্ণমনা? এসব প্রশ্নের উত্তর কী কারও জানা আছে? স্বাধীনতার চার দশক পরেও বাংলাদেশ রাজনীতি লাভ করল না এতটুকু স্থৈর্য্য। এতটুকু স্থিতিশীলতা। বিন্দুমাত্র সৃজনশীলতা। এভাবে চলতে থাকলে এ দেশের বেহাল অর্থনীতির কী হবে? কোন অবস্থায় পৌঁছবে নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান? মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ পাওয়া বাংলাদেশ কোন পর্যায়ে উপনীত হবে? জনগণের প্রাত্যহিক জীবন কী এভাবেই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে?

একটি দেশের অবস্থা আর একটি জনপদের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা শুধু কঠিন নয়, পুরোপুরি সঠিকও নয়। তা জেনেও কিছুটা বাস্তব ধারণার লক্ষ্যে আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ১৮৬১-৬৪ সময়কালীন গৃহযুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে আমেরিকার রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ওই সময়ের আমেরিকার পরিস্থিতিকে ঠাট্টা করে বলা হতো ‘সোনালি যুগ’ (‘Gilded Age')। এই নামটি গৃহীত হয় ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত মার্ক টোয়েনের একটি উপন্যাসের শিরোনামের অনুকরণে। আজকের বাংলাদেশ যেমন বছরের পর বছর ধরে দুর্নীতির ক্ষেত্রে সারাবিশ্বে শীর্ষস্থানের অধিকারী হচ্ছে, সেই ‘সোনালি যুগে’ও আমেরিকা দুর্নীতি ক্ষেত্রে ছিল শীর্ষস্থানীয়। মার্ক টোয়েনের কাহিনিতে এমনি বিবরণ রয়েছে। কংগ্রেসের সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে নিজেদের প্রভাব বিক্রয় করতেন। অর্থের বিনিময়ে রেলপথ নির্মাতাদের কন্ট্রাক্ট দিতেন। দিতেন অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। Gredit Mobilier Scandal-এর মতো ঘটনা এরই সাক্ষী। শুধু তাই নয়, সেই ‘সোনালি যুগে’র রাজনীতিও ছিল তীব্রভাবে দলীয়। গৃহযুদ্ধের পর আমেরিকার রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক এই প্রধান দুটি দলের সম্পর্ক ছিল সাংঘর্ষিক, অনেকটা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের মতোই।

দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পারস্পরিক সম্পর্কও ছিল মূলত শত্রুভাবাপন্ন। তাদের মধ্যে বাক্যালাপ ও আলোচনা হতো কচিত, যেমন বাংলাদেশে সরকার প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ বা পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা হয় কদাচিৎ। বাংলাদেশের দুটি প্রধান দলের শীর্ষস্থানীয় নেতানেত্রী যেভাবে তাদের প্রতিপক্ষকে মারাত্মক ধরনের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন এবং হাজারো সত্য-অসত্য অভিযোগের ডালা সাজিয়ে একে অপরকে সম্বোধন করেন, আমেরিকার দুই প্রধান দলের নেতারা প্রায় তেমনি করতেন। কোনো দলের পক্ষেই সামগ্রিকভাবে আমেরিকার শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্সি (Presidency) দখলে রেখেছিলেন ১৮৬৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯১২ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে শুধু গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের দখলে থেকেছে কংগ্রেস এবং অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যের আইন পরিষদ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতারা যেমন বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে, অতীতকে মূলধন করে নির্বাচন পরিচালনা করে থাকেন, বিশেষ করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাদের কি ভূমিকা ছিল তা হাজার বার উচ্চারণ করে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে অতীতকে বারবার টেনে আনেন, অমেরিকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তেমনি প্রায় তিন দশক পর্যন্ত অতীতমুখীই থেকে ‘রক্তাক্ত শার্টের’ (‘Bloody Shirt’) প্রদর্শনী এবং এর মাধ্যমে দক্ষিণের ভোটদাতাদের স্মরণ করানো হত যে তারাই বিচ্ছিন্নতাবাদী। তারাই গৃহযুদ্ধ সংঘটনের প্রধান হোতা। তারাই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্যের শত্রু। তাদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণার মূল বিষয় হতো রিপাবলিকানদের সীমাহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনে অরুচিকর দলীয়করণ। নির্বাচিত রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট যেন সফলকাম হতে না পারেন সেই লক্ষ্যে, ডেমোক্র্যাট-প্রাধান্যের কংগ্রেস অনেক সময় প্রকাশ্যে এবং অধিকাংশ সময় গোপনে ব্যবস্থা গ্রহণ করত, যেমন বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারকে পর্যুদস্ত করতে বিরোধী দল সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশে শীর্ষ পর্যায়ের নেতানেত্রীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যেভাবে অকথ্য ভাষা প্রয়োগ করে, অসত্য তথ্যের সম্ভার সাজিয়ে, মিথ্যা পরিসংখ্যান গুছিয়ে, এমনকি সরকার পতনের জন্য সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্ধারণ করে সজ্ঞাতভাবে দেশময় এক অনিশ্চিত পরিবেশ সৃষ্টি করেন, আমেরিকাতেও প্রায় তেমনি অবস্থা বিরাজ করত। এদিক থেকে বিচার করলে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তীকালের আমেরিকার রাজনীতি এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির মধ্যে দেখা যাবে ভয়ঙ্কর রকম মিল। দুটিই সম্ভাবনাময় দেশ, কিন্তু রাজনীতিকদের ভাষা ও কার্যক্রমে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। দুটি দেশেই বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাঠামো, কিন্তু কোনো দেশেই এই সময়কালে রাজনীতিকদের মন গণতন্ত্রের জন্য তৈরি হয়নি। দুটি দেশেই রাজনৈতিক দলের নেতারা বসবাস করেছেন অতীতে। আমেরিকার ক্ষেত্রে সেই গৃহযুদ্ধ (Civil War) এবং বাংলাদেশে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা প্রকট হয়ে উঠেছিল। অনিশ্চয়তা মূর্ত হয়েছে। কল্যাণমুখী পদক্ষেপ হয়েছে বিরল।

তিন দশক পর আমেরিকার গভীর এক পরিবর্তন সূচিত হয়। এই পরিবর্তনের মূলে ছিল বৌদ্ধিক বা বুদ্ধিবৃত্তির এক আন্দোলন (‘An Intellectual Movement’)। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বহু জ্ঞানী-গুণী-দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন উইলিয়ম জেমস্ (William James), চার্লস পিয়ার্স (Charles Price) মার্ক টোয়েন (Mark Twain) এবং পরে জন ডিউয়ি (John Dewey), অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস্ (Oliver wendel holmes) প্রমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তি। সেই আন্দোলন ছিল প্রয়োগবাদী (Pragmatism)। কোনো বক্তব্য বা উক্তি বা ধারণা বা নীতি মানবকল্যাণের ক্ষেত্রে কতটুকু প্রাসঙ্গিক সেই মানদ-ে তার বিচার হবে, অন্য কোনো মানদণ্ডের নয়। রাজনীতিকদের ব্যর্থতায় ক্লিষ্ট হয়ে, তাদের আবেগতাড়িত আত্মম্ভরিতায় ক্ষুব্ধ হয়ে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের অনীহায় ব্যথিত হয়ে, বিশেষ করে তাদের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের অনীহায় ব্যথিত হয়ে, বিশেষ করে তাদের অতীত-প্রিয়তায় বিরক্ত হয়ে প্রয়োগবাদিতায় (Pragmatism) এই দর্শন এসব চিন্তাবিদ তুলে ধরেন জাতির সামনে। প্রয়োগবাদিতার রাজনীতিকদের সামনে এই প্রশ্ন তুলে ধরা হতো ‘যা বলেছেন তা যে সঠিক তা প্রমাণ করুন। (‘Show me’)। অসত্য উচ্চারণ পরিহার করুন। আপনাদের দুই দলের সমর্থক যতজন, তার একশ গুণ বেশি জনসমষ্টি আপনাদের আওতার বাইরে। আপনাদের ঝগড়া সারাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। জনগণের নামে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার কোনো অধিকার নেই কারও।’ এই প্রয়োগবাদের (Pragmatism) অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশের রাজনীতিকে অতীত থেকে টেনে এনে বর্তমানের বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য উপস্থাপন করা। এর লক্ষ্য ছিল কর্মসূচি বা আদর্শের এক বাজার তৈরি করা (Create `a market place of ideas'), যে বাজারে ওইসব কর্মসূচি বা আদর্শের যাচাই-বাছাই হতে পারে মুক্তাঙ্গনে, গোপনে নয়। সরবে, বাকবিত-ার মাধ্যমে, নীরবে নয়। এভাবে চিন্তাবিদদের বুদ্ধিবৃত্তির আন্দোলনের ফলে আমেরিকার সমাজের বহু বাচনিক (Pluralism) বৈশিষ্ট্য, রাজনীতির ওপর জনসমষ্টির অভিভাবকত্ব (public Oversight), বিশেষ করে রাজনীতির বস্তুনিষ্ঠতার (political neutrality) সূচনা হয় গৃহযুদ্ধের (Civil war) প্রায় তিন দশক পরে। বাংলাদেশেও এমনি এক বৌদ্ধিক আন্দোলনের (intellectual movement) প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে তীব্রভাবে। বাংলাদেশে রাজনীতিকে হতে হবে সৃজনশীল এক কর্মপ্রবাহ। হতে হবে যুক্তিভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যম। হতে হবে পরিশীলিত এবং রুচিকর এক যৌথ কার্যক্রম।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বিরাট অংশ এখনো আঁটকে রয়েছে ‘বৈধতার’ সংকীর্ণ গুহায়। দক্ষতা বা সুষ্ঠু নীতির মানদ-ে কোনো রাজনৈতিক কর্মকা-ের মূল্যায়নে প্রবৃত্ত হতে আমাদের অধিকাংশ নেতা এখনো শেখেননি। শেখেননি বলেই নিজেদের মনগড়া ‘বৈধতার’ প্রশ্নটি সারাক্ষণ আওড়াতে থাকেন। সবার মনে থাকার কথা, ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১৯৭৫ সালের পরের সব সরকার ছিল অবৈধ। এই ধারণা পোষণ করেই তিনি ১৯৯১ সালে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকার সম্পর্কে বলেছিলেন, এ সরকারকে একদিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি বিএনপির নেতানেত্রীর প্রচণ্ড ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছিল সপ্তম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনের ওয়াকআউটে। এই অসহিষ্ণু অসহযোগিতার মূলে রয়েছে এই জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের এক ধরনের বিশ্বাস এবং বদ্ধমূল ধারণা। সেই মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন প্ল্যাটফরম থেকে হাজারো লেখক, বুদ্ধিজীবী, ইতিহাসবিদ জনযুদ্ধরূপে চিত্রিত করলেও আওয়ামী লীগের বেশকিছু নেতার বিশ্বাস, তা আওয়ামী লীগের অর্জন। তাই তাদের বিশ্বাস, মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাংলাদেশকে শাসন করার বৈধ অধিকার একমাত্র আওয়ামী লীগের। অন্য কোনো দলের নয়।

ফলে জাতি হয়ে উঠেছে বিভক্ত। বিএনপি সরকার যাই করুক না কেন, ভালো হোক আর মন্দ হোক, আওয়ামী নেতৃত্ব ও সহযোগীরা তার তীব্র সমালোচনা করবেই। অন্যপক্ষে আওয়ামী লীগ যা করবে তার বিরোধিতা বিএনপি ও তার সহযোগীদের পক্ষ থেকে আসবেই। আমেরিকাতেও অনেকটা এমনি হয়েছিল ওই সময়ে।

আমেরিকা ওই সংকট থেকে অব্যাহতি লাভ করেছিল ঊনিশ শতকের শেষদিকে গড়ে ওঠা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে। আমরা কী তেমন কিছু করতে পারি না? সত্যি বটে, যে বৈধতার প্রশ্নটি আজ আমাদের জাতীয় জীবনে এক অভিশাপরূপে দেখা দিয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দু হলো শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান। একটু সুস্থভাবে ভাবলে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না যে, এই দুই মহান নেতা আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই অর্থে একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আমাদের যেমন জাতীয় সম্পদ, তেমনি জাতীয় সম্পদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন প্রতিভাবান দিশারি আরও আছেন এবং সবাই আমাদের জাতীয় সম্পদ। তারা সব দলের ঊর্ধ্বে। সব সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে। ঊর্ধ্বে সব সংকীর্ণতার। তার পরও আমরা এ সম্পর্কে কোনো ঐকমত্য গঠনে সক্ষম হইনি। হয়তো হবেও না অদূর ভবিষ্যতে।

আমেরিকার বুদ্ধিজীবীরাও তাদের বৃহৎ দুটি দলের নেতৃত্বকে কাছাকাছি আনতে চেষ্টা করেননি, কেননা তাদের ধারণা ছিল, চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হবে না। তাই তারা পরামর্শ দিয়েছিলেন, প্রয়োগবাদের মাধ্যমে জনস্বার্থ সম্পর্কিত এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে বিরোধী দল বিরোধিতা করবে কিনা করবে তা ঠিক করুক এবং ক্ষমতাসীনরা আকাশছোঁয়া উদারতার আলো চারদিকে ছড়িয়ে দিক এবং বর্তমানকে মহান ও ভবিষ্যৎকে মহত্তর করুক। গৃহযুদ্ধের চার দশকের মাথায় এই আন্দোলনের সেরা সৃষ্টি উড্রো উইলসন এভাবে নতুন নেতৃত্বের প্রতিনিধিরূপে আমেরিকার সংঘাতময় রাজনীতিকে ঘৃণাভরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ১৯১৩ সালে তার The News Freedom শীর্ষক বক্তৃতায় বলতে পেরেছিলেন : ‘এই শ্রেষ্ঠ জাতির শক্তি ও উদ্যোগকে পুরোপুরি মুক্ত করে দিতে হবে। এভাবেই আমেরিকার ভবিষ্যৎ তার অতীত থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠবে এবং আমেরিকার গৌরব বৃদ্ধি পাবে নতুন নতুন অর্জনের মাধ্যমে। যতদিন যাবে আমেরিকা টের পাবে যে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের সুসন্তানরা নিয়ে আসবে নতুন নতুন গৌরবগাথা। কেননা এই প্রজন্মের সুসন্তানরা অতীতের থেকে অনেক বেশি আলোকিত এবং সমগ্র মানবজাতির প্রতি আমেরিকার যে প্রতিশ্রুতি তা সে পালন করবে।’ {‘We have got to set the energy and the initiative of this great people absolutely free, so that the future of America will be greater than the past, so that the pride of America will grow with achievement, so that America will know as the advances from generation to generation that each brood of her sons is greater and more enlightened than that which preceded it, know that she is fulfilling the promise that she has made to mankind...’] আমেরিকার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ফলে আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব মাটির কলকোলাহল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, তারা ভরা আকাশের দিকে দৃষ্টি দিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে আবাহন করতে শিখেছে। অতীতের সংঘাতময় দিনগুলো ভুলে বর্তমানের কর্মময়তাকে ভালোবাসতে শিখেছে। অরুচিকর পরিবেশের জেদ বিস্মৃত হয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পাঠ নিয়েছে। এভাবে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে বিধ্বস্ত আমেরিকা সংকীর্ণতার ধূলিমলিন আবরণ ছুড়ে ফেলে বিশ্বজয়ের শত সম্ভাবনায় সচকিত হয়ে ওঠে। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমেরিকার সেই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন (Intellectual movement) থেকে কিছু শিখবে কি? শিখবে কি আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতো ক্লেদাক্ত বর্তমানকে ভুলে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে সচকিত হতে? শিখবে কি আজকের মাটির হাজারো সমস্যার মধ্যেও খানিকটা আকাশচারিতার অভিযানে প্রবৃত্ত হতে? জানি তো সবাই, মাত্র দুই হাজার ফিট ওপর থেকে দেখলেও এই ধূলির ধরণীকে কত সুন্দর ও সুষমাম-িত দেখায়। এই মুহূর্তে এটির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement