advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মেঠো মানুষের গান

আজাদুর রহমান
৪ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৪ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:৩৬
advertisement

ছিপছিপে ছোট্ট নদী বরাবর মু-াপাড়া। নুয়ে পড়া গাছগাছালির ছায়াতলে মায়াময় নদী, শালিখা। শালিখার উঠোনেই জনবসতি। পাড়ামুখে মামুলি বাজার, একটু পর পর ছোটখাটো সরগরম আড্ডা, আড্ডার পাশে নিচু ছাউনিতলা, সেখানে টঙ খাটিয়ে কিছু লোক তাস খেলছে। ছেলে-ছোকরা বলে কোনো কথা নেই। দেদার চা-বিড়ি টানছে তারা। ছবি তুলতে গেলে গলা বাড়িয়ে একজন খালি বলতে পারলÑ ‘আপনারা কিসের লোক, কোত্থেকে আসিছেন? প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই সে ফের ছাউনিতলায় গলা নামিয়ে নিল। পরিবেশটা জমজমাট। শহুরেদের খবরদারির অনেক বাইরে নিবিড় এই পল্লী যেন নিজের মনমতন মজে আছে বহুকাল। সাতক্ষীরায় মু-াদের সহজ পরিচয় ‘বুনো’। বাজার ছেড়ে আমরা ক্রমে পাড়ায় ঢুকে যাই। মাটির ঘর, একটার পর একটা সাজানো। আলাদা করে ভণিতা তুলতে হলো না, প্রায় সবাই নেমে এলেন পাড়ার কিনারে, যেখানে পাথারের শুরু। আমরা হয়তো বেঞ্চে বসে পড়লাম, কেউ বা দাঁড়িয়েই কথা তুললেন। পরিবেশটা সহজ হয়ে গেল।

জমি নেই। পাড়ার জমিনটাও অন্যের। জীবন চলে গতরের ওপর। পুরোপুরি খেটেল বলে নারী-পুরুষ সমান হাতে চাষাবাদে হাত লাগান তারা। টানা অমানুষিক পরিশ্রম করতে পারলেও বালবাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে একদম গা করেন না তারা। পরিশ্রমী অথচ বেহিসেবি। কাজের মৌসুম পার হলে তাই আনন্দ জাগে। তাড়ি-হাঁড়িয়ার সঙ্গে মাদল বাজে, দুলতে থাকে মু-াপাড়া। ধর্মনাম, ধর্মগ্রন্থ, প্রবর্তক ইত্যাদি নিয়ে গোপালরা খোলাসাভাবে তেমন কিছু বলতে পারেন না। শুধু বিজয় বললেন, আমরা সনাতনী, ভগবান মানি এবং মনসাদেবীর পূজা করি। সুব্রত কথা টেনে নিলেনÑ ‘আমরা বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াই, জঙ্গলে কাজ করি। সাপখোপ থাকে। মনসাদেবী হলো সাপের রানি। তাই তার পূজা করি। ধর্মজীবনে গুরু অপরিহার্য। নারী-পুরুষ একটা নির্দিষ্ট বয়সে গুরু ধরেন। তবে ভগবানিয়া কিংবা বাউল ধর্মে গুরু যতটা অনিবার্য, মু-াদের বেলায় ঠিক ততটা নয়। কর্মকরণও অনেকটা সহজ আর সংক্ষিপ্ত। মূলত বংশপরম্পরায় বয়ে চলেছে তাদের ধর্মনদী। কিছু মন্ত্র পড়তে হয় বটে। জিজ্ঞাসা করলাম, কী মন্ত্র? তফাতে দাঁড়ানো এক মু-া নারী ঝাঁজিয়ে উঠলেনÑ ‘নিজের অন্তরের মন্ত্র কি বলা যাবে আপনাকে।’ নারীটির গলায় এমন ঝাঁজ ছিল যে, আমি এ নিয়ে আর বেশি বলতে পারলাম না।

বংশ নিয়ে মু-াদের খুব বেশি বাড়াবাড়ি নেই। মু-াই তাদের বড় পরিচয়। নেপাল অনেকটা অনিচ্ছা নিয়েই উদাহরণ দিতে গেলেনÑ যেমন ধরেন আমার বংশ হলো তিরকিয়া। তিরকিয়া ছাড়াও বহকাল, রাজপুত, ভূতকর, কেরকাটা, নারকমু-া ইত্যাদি নামে বেশ কিছু বংশনালিকা থাকলেও তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। বিয়েশাদির আগে গার্জিয়ানপক্ষ পরস্পর প্রাক-কথন এবং হবু বর-কনে দেখাদেখির প্রচলন আছে। বিয়ে হয় সাত পাকে বেঁধে। তবে বিয়ের পর বর ঘরের চালের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং সদ্যবিবাহিত বউকে লক্ষ করে চিৎকার করেন, ‘আমি একেনতে লাফ দে পড়ে মুরে যাব।’ স্বামীর হাহাকার শুনে নবপরিণীতা উত্তর দেন, ‘ওগো, তুমি লাফ দে পড়ে মুরো না, যেম্মায় পারি কোদাল, কুড়–ল মেরে আয় করে তোমাকে খাবাবো।’ স্ত্রীর মুখে ভরসার কথা শুনে বেচারা বর চাল থেকে নেমে এসে নববধূর সিঁথিতে সিঁদুর পরান। আগে বরপণ ছিল না। ইদানীং যৌতুকের লেনদেন চালু হয়েছে।

খাদ্যাভ্যাস বিচিত্র। সাধারণ খাবারের পাশাপাশি কুঁচে, ব্যাঙ, কাঁকড়া, কাঠবিড়ালি, কেঁচো, ইঁদুরও খান তারা। উপস্থিত কিছু নারীকে দেখলাম খানিক পর পর গুল খাচ্ছেন। নেপাল গোপালরাও লুঙ্গির গিঁটে রাখা গুলের কৌটা আলগোছে বের করছেন, তার পর এক হাতে নিচের ঠোঁট টেনে ধরে ঠোঁট ও দাঁতের ফাঁকে গুল ঢালছেন। বিড়ি-গুল ইত্যাদি সার্বক্ষণিক নেশা হলেও মূল নেশা হাঁড়িয়া-তাড়ি। হাঁড়িয়া বানানোর কায়দাটা জানার জন্য গোপালকে অনুরোধ করলাম। গোপাল ইতস্তত করলেন, এসব শুনে কী হবে, আপনি তো আর বানাতে পারবেন না, এই ধরেন কুঁচফল এবং বুজের বিচি ঢেঁকিতে গুঁড়া করে আটায় মিশিয়ে বড়ি বানাতে হবে। এবার দুই কেজি পরিমাণ চালের ভাত ছড়িয়ে রাখতে হবে। ভাতের সঙ্গে দু-তিনটি বড়ি গুঁড়া করে ভালোভাবে মিশিয়ে একটা হাঁড়িতে রাখলে তিন দিন পর সেটা মজে যাবে। তখন পনেরো-ষোলো কেজি গরম পানি মিশিয়ে ছেঁকে নিলেই হাঁড়িয়া হয়ে গেল। কুঁচফল চেনা যায়, কিন্তু বুজফলকে আর চিনতে পারলাম না।

বিশেষ ভাষায় কথা বলেন তারা। যেমন ‘কারোম হিস মালো’ মানে কেমন আছেন? তেমন ‘ভালো হি’ মানে ভালো আছি। ‘কাহা আলিস’ মানে হলো, কোথা থেকে এলেন? ভাষার ব্যাপারে নেপালের কথা হলো, ‘হিন্দি-উর্দু কিছু বুঝি না, মায়ের পেট থেকে পড়ার পর এই ভাষাই পেয়েছি, কোনো বইটই নাই।’ বিজয় মু-া অনেকক্ষণ ধরে গালে হাত দিয়ে গুম হয়ে বসেছিলেন। তিনি নড়ে উঠলেন, ‘আমাদের ভাষার নাম সম্ভবত বনুয়া সাদান।’ কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা নামে, অজগাঁ থেকে সাতক্ষীরায় ফিরতে হবে। এগিয়ে দিতে গিয়ে কেউ কেউ বাজারেই থেকে গেলেন। পরে পাশের গ্রামের আর কিছু পোলাপান আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। ওদের একজন বলল, ওরা গুলকে কি বলে জানেন? বলে ‘গিরগিল্লা’, আর গুল খাওয়া মানে হলো ‘গিরগিল্লা খাতুন’। গিরগিল্লা বলেই একে অন্যের গায়ে ধাক্কা মেরে হাসতে লাগল। ওরা ডাকে কেমন করে শোনেন, মনে করেন গোবিন্দকে ডাকবে, বলবে গোবিন্দ কুত কুত! মানে গোবিন্দ এদিকে আয়। ছেলেগুলো ফের আগের মতো হি-হি করে উঠল। জানতে পারলাম মু-ারা ইঁদুরকে বিলখাসি এবং কেঁচোকে উঠোন বরবটি বলে। মু-াপাড়া থেকে হাফ কিলোমিটার দূরে বাঁকের মুখে পৌঁছতেই মাগরিবের আজান পড়ে গেল। পিচ রাস্তা পেতে রাত ৮টা। পাথার চিরে সুতোর মতো এই পথ। চাঁদের আলো, হু-হু করে হাওয়া বইছে।

আজাদুর রহমান : সাহিত্যিক ও গবেষক

advertisement