advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঢালো টাকা ঘোরাও চাকা

তাওহীদুল ইসলাম
৮ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ ১১:০৯
advertisement

দেশে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ফিটনেসবিহীন গাড়ি রয়েছে। আবার সনদ থাকলেই গাড়িটির সত্যিকারের ফিটনেস রয়েছে এমনটি মনে করার কারণ নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এবং লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি রাজস্ব খাতে ফি জমার বিনিময়ে পাচ্ছে ফিটনেস। মানে টাকার বিনিময়ে মিলছে ফিটনেস। এ তো গেল বৈধ টাকার বিষয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে গাড়ি না দেখেই মেলে ভৌতিক পরিদর্শন।

যানবাহনের ফিটনেস সনদ প্রাপ্তির একমাত্র মাপকাঠি এখন রাজস্ব ফি দেওয়া, না-দেওয়া। উপেক্ষিত থাকে গাড়ির কারিগরি ও বাহ্যিক দিক। তাই গাড়ি না দেখে ফিটনেস সনদ দেওয়ার অভিযোগ বাড়ছে। সে সুযোগে দুর্র্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তার অবৈধ অর্থ উপার্জনের এ সুযোগ বন্ধ হচ্ছে না কোনোভাবেই।

নিয়ম হচ্ছে, গাড়ির কারিগরি ও বাহ্যিক অন্তত ৬০টি বিষয় বিবেচনায় এনে ফিটনেস সনদ প্রাপ্তির কথা। বাস্তবতা হচ্ছে, বছর শেষে গাড়ি নবায়নে প্রথমে নেওয়া হয় ফি ও ট্যাক্সটোকেনের অর্থ। এর পর গাড়ি হাজির করার কথা বলা হয়। সে ক্ষেত্রে তদবির বা অবৈধ অর্থের মাধ্যমে গাড়ি না দেখিয়ে পরিদর্শকের সই নেওয়ার অভিযোগ আছে। বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসে গাড়ি হাজির করলেও এক মিনিটের মধ্যেই সেরে ফেলা হয় পরিদর্শনপর্ব। নিয়মানুযায়ী এ ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ মিনিট সময় লাগার কথা। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের অজুহাতÑ জনবল কম; গাড়ি বেশি। তাই দ্রুত সময়ে যাচাই সম্পন্ন করতে হয়। আসলে ফিটনেস নিয়ে চলে দুর্নীতি। তবে

ব্যক্তিমালিকানার গাড়ি হাজির করার কিছুটা প্রবণতা আছে। সেখানে দালাল-কর্মচারীদের ‘ম্যানেজ’ না করলে হয়রানি করা হয়। আর পরিবহন নেতা কিংবা কোনো কোম্পানির সহায়তায় গেলে গাড়ির বদলে কাগজ হাজির করলেই চলে। অভিযান বা কোনো বিশেষ কারণে অবশ্য কড়াকড়ির খবর পাওয়া যায়।

গাড়ি নবায়নের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, নিবন্ধনপ্রাপ্ত বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট অফিসে গাড়ি হাজির করে নবায়ন করাতে হবে। দেখা যায়, রেজিস্ট্রেশনের পর গাড়ি ঢাকার বাইরে কোনো এলাকায় চলাচল করছে। ফিটনেস নবায়নের জন্য আবার আনা ‘কঠিন’ বিবেচনায় সার্কেল অফিসে হাজির করতে নিরুৎসাহী থাকেন গাড়ি মালিকরা। বিকল্প পন্থায় ‘আন সিন’ গাড়ি নবায়নের জন্য তখন অনৈতিক পথ খোঁজেন। আবার গাড়ি সার্কেল অফিসের কাছাকাছি থাকলেও উপার্জনের ক্ষতি বা অন্য কাজে ব্যস্ত রাখার কারণেও গাড়ি হাজির করতে অনাগ্রহ দেখা যায়। কেউ কেউ সময় বাঁচানোর অজুহাত দেখান। এ প্রেক্ষাপটে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১২৪ (১) (খ) এর ক্ষমতাবলে বিআরটিএর যে কোনো সার্কেল থেকে ফিটনেস নবায়নের সুযোগ দিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। গত ১ ডিসেম্বর সই করা প্রজ্ঞাপনের পর সফটওয়্যারের সঙ্গে গাড়ির বিবরণ যুক্ত করতে হয়। আজ রবিবার থেকে তা কার্যকর হতে পারে।

এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান বলেন, ফিটনেস সনদ নিয়ে বড় অভিযোগ নিবন্ধিত অফিসে হাজির হওয়া নিয়ে। এখন সরকার নতুন নিয়ম করেছে, যে কোনো সার্কেল অফিস থেকেই সুযোগটি পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে অনিয়ম ও হয়রানি অনেকাংশেই কমে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নবায়নের জন্য গাড়ি হাজির করলেই দুর্র্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে এমনটি নয়। কারণ দেশের মোট ৪৩ লাখ গাড়ির বিপরীতে মোটরযান পরিদর্শক রয়েছেন মাত্র ১২৫ জন। ফিটনেস সনদ দিতে হলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন কারিগরি ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। এ জন্য অন্তত ৬০ মিনিট সময় লাগে। খতিয়ে দেখতে হয় গাড়ির ৬০টি দিক। এর মধ্যে রয়েছেÑ গাড়ির ধরন, ইঞ্জিন অ্যাসেম্বলি (পাওয়ার ইউনিট), ধোঁয়া নির্গমনের অবস্থা, চাকা মান, টায়ারের ধরন ও আকার, বাম্পারের অবস্থান, অতিরিক্ত চাকা রাখার ক্যারিয়ার, গাড়ির আকার, যাত্রীর দরজা, চালক ও জরুরি প্রয়োজনে বহির্গমনের পথ, চালকের আসন ও তার সামনের যন্ত্রাংশ, গাড়ির বডির নিরাপত্তা, গাড়ির ভেতর ও বাইরের খুঁটিনাটি সব দিক, চালকের নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মান, স্টিয়ারিং ও ব্রেক সিস্টেমের ধরন এবং মান, সতর্কতা ব্যবস্থা, ব্রেক সিস্টেমের সব দিক, ইঞ্জিন ও চেসিসের অবস্থান ও মান, তেল রাখার ট্যাংকির ত্রুটিমুক্ত অবস্থা, ফুয়েল ট্যাংক সিস্টেম, লুকিং গ্লাস, সব ধরনের বাতির কার্যকারিতা, মিটার, ইন্ডিকেটর, এক্সেল লোড, পাওয়ার স্টিয়ারিং। এসব পরিদর্শনের কাজ শেষ করার পর মেলার কথা ফিটনেস সনদ। কিন্তু চোখের দেখায় মিনিটখানেকের মধ্যেই দেওয়া হয় ফিটনেসের বৈধতা। এ রকম অবৈজ্ঞানিক পন্থায় ফিটনেস সনদপ্রাপ্তির দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগী প্রতিষ্ঠান কোইকার অর্থায়নে ৫টি ভেহিক্যাল ইন্সপেকশন সেন্টার (ভিআইসি) স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে চালুর আগেই সব কটি অচল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে একটি আবার মেরামত করে একমাত্র মিরপুর অফিসে চালু করা হয়। বাণিজ্যিক পরিবহন যাচাইয়ের কাজটি করে এ ভিআইসি। আর ব্যক্তিগত ও হালকা যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা করা হয় খালি চোখে।

ভিআইসির মাধ্যমে পরিদর্শনকর্মী চালকের আসনে বসে ওজন, টায়ারের বিট বা ঘনত্ব, গতি ও গতিরোধক বা ব্রেক পরীক্ষা দেড় মিনিটের মধ্যে শেষ করেন। নামার আগে ভেতরের আসন, রং ঠিক আছে কি না, সেটি পরীক্ষা করে নেন। ভিআইসিতে পরিদর্শনের ধাপে চার ধরনের পরীক্ষা হয়। ওজন স্কেলে ‘এক্সেল লোড’ পরীক্ষা করা হয়। দেখা হয় টায়ারের ঘনত্ব। এর পর পরীক্ষা করা হয় গতি। সবশেষে গাড়ির গতিরোধক বা ব্রেক পরীক্ষা করা হয়। পরিদর্শন ধাপটি শেষ করতে ১৮-২০ মিনিট লাগার কথা। সব মিলিয়ে ১ ঘণ্টা লাগার কথা।

বড় ব্যাপার হচ্ছে, একমাত্র বিআরটিএর মিরপুর অফিসে গণপরিবহন ভিআইসির মাধ্যমে দেখা হয় এতে সময় লাগে কয়েক মিনিট। আর খালি চোখে অন্য গাড়ি দেখতে সময় যায় মিনিটখানেক। এভাবেই বিআরটিএর ৫৭ সার্কেল অফিসজুড়ে গাড়ি পরিদর্শন চলছে। তাই লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়িও ফিটনেস সনদের দাবিদার। কারণ সনদপ্রাপ্তির বৈধতা নির্ভর করছে কেবল সরকারি ফি দেওয়ার ওপর।

ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা : সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রয়েছে ৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪টি। এর মধ্যে বাস ১৩ হাজার ৮৯০, কার্গো ভ্যান ১৫৪৪, কাভার্ডভ্যান ৫ হাজার ৫৮৯, ডেলিভারিভ্যান ৭ হাজার ৫৭, হিউম্যান হলার ১৩ হাজার ৫৪৬, জিপ ৯ হাজার ৬৬০, মাইক্রোবাস ২১ হাজার ৭৮৭, মিনিবাস ৮ হাজার ৭৪৮, পিকআপ ৪৯ হাজার ৮০৮, ট্রাক ৫১ হাজার ৫৭৫, প্রাইভেট কার ৪৬ হাজার ১৩৩, ট্যাক্সিক্যাব ১৬ হাজার ৯৪৫ এবং অটোরিকশা ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৭টি। এ ছাড়া ট্যাঙ্কার, ট্রাক্টর, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন ফিটনেসবিহীন গাড়ি রয়েছে। এর আগে ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে বিস্তর সমালোচনার পর আদালতের কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয। এর একটি হচ্ছে ফিটনেস খেলাপি মোটরযানে জ্বালানি সরবরাহ না করা সংক্রান্ত। এ বছরের ২৩ অক্টোবরের আদেশের পর পেট্রল পাম্প ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে বিআরটিএ। পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গত ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়Ñ ‘মোটরযানের ফিটনেস হালনাগাদ করা না থাকলে জ্বালানি সরবরাহ করা হয় না’ মর্মে ব্যানার টানাতে হবে। প্রতিটি স্টেশনে এটি টানাতে হবে এমন নির্দেশনা বাস্তবায়নে গত ৪ ডিসেম্বর চিঠি দিয়েছে বিআরটিএ। গাড়ির সামনের গ্লাসে থাকা ফিটনেসের স্টিকারে (ডিকাল) মেয়াদ দেখে জ্বালানি সরবরাহ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ফিটনেসবিহীন গাড়ির জরিমানা মওকুফসহ বিভিন্ন দাবিতে পরিবহন নেতারা গত মাসে আন্দোলনে নামে। সড়ক আইন সংশোধনের দাবিতে ডাকা পণ্য পরিবহনের অঘোষিত ধর্মঘট ডাকা হয়। তখন বলা হয়, আগামী বছরের জুন পর্যন্ত ফিটনেসের মেয়াদ পার হওয়া গাড়ির জরিমানা মওকুফ করতে হবে। অবশ্য এর আগেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কয়েক দফা ফিটনেসখেলাপির জরিমানা মওকুফ করা হয়। পরিবহন নেতারা এবারও একই চাপ দেন। নতুন আইনে ফিটনেস খেলাপি হলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৬ মাসের কারাদ-ের বিধান রয়েছে। ফিটনেস সনদ নবায়নের ব্যাপারে আগের মোটরযান অধ্যাদেশে বলা আছে, ফিটনেসের মেয়াদ হবে এক বছর। নতুন আইনে এ সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা নেই।

advertisement