advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রোহিঙ্গা গণহত্যা ইস্যুতে আজ হেগের শুনানিতে সবার নজর
মিয়ানমার বর্জনের ডাক

আরিফুজ্জামান মামুন ও সুমন মজুমদার
১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৪:৩৮
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান।
advertisement

নেদারল্যান্ডসের হেগে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে, যা একটানা চলবে আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ২০১৭ সালের ওই গণহত্যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বইলেও মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি অবশ্য শুনানিতে এর পক্ষে সাফাই গাইবেন বলেই মনে করছেন অনেকে।

একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি প্রমাণেও মরিয়া চেষ্টা চালাবে মিয়ানমার। তবে তার পরও মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমছে না। ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সেনাবাহিনীর পক্ষ নিতে হেগে যাওয়ায় সু চির তুমুল সমালোচনা করেছে।

এ ছাড়া নেপিদোর ওপর চাপ আরও বাড়াতে বিশ্বব্যাপী ‘বয়কট মিয়ানমার’ ক্যাম্পেইন শুরু করেছে ১০ দেশের ৩০ সংগঠন। আজ শুনানি চলাকালে এসব সংগঠন আদালতের বাইরে মিয়ানমারবিরোধী বিক্ষোভও করবে বলে জানা গেছে। গতরাতে কানাডা ও নেদারল্যান্ডস এক যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় গাম্বিয়াকে সর্বতোভাবে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেকদিন পর হলেও আইসিজেতে রোহিঙ্গা ইস্যুটি উঠেছে- এটি একটি বড় বিষয়। ফলে মিয়ানমার কিছুটা যে চাপে পড়েছে, সেটি বলাই যায়। তবে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে।

রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে গত ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলা করে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা ওআইসির
সদস্য ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। ফলে এরই মধ্যে মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থন দিচ্ছে ওআইসির অন্য সদস্য দেশগুলোও। হেগে পিস প্যালেসে আইসিজের শুনানিতে গাম্বিয়ার পক্ষে মামলা লড়বেন দেশটির আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদোউ। তিনি ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডা গণহত্যার মামলায় এক দশকের বেশি সময় লড়াই করেছেন।

আদালতের শিডিউল অনুযায়ী, আজ গাম্বিয়া তার বক্তব্য উপস্থাপন করবে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে ১১ ডিসেম্বর বক্তব্য উপস্থাপন করবে মিয়ানমার। ১২ ডিসেম্বর হবে যুক্তিতর্ক। প্রথমে গাম্বিয়া যুক্তি দেবে, পরে মিয়ানমার তা খণ্ডনের সুযোগ পাবে। এই আদালতের বিচারকের সংখ্যা ১৫ জন এবং প্রত্যকের উপস্থিতিতে ওই শুনানি হবে। আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের চার মাসের মধ্যে কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তা গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয়কেই জানাতে হবে।

শুনানিতে অংশ নিতে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশেরও ২০ সদস্যের শক্তিশালী প্রতিনিধি দল হেগে পৌঁছেছে। দলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক সচিব মাসুদ বিন মোমেন, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার সফিউর রহমান, ইরানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গাউসুল আজম সরকারসহ কয়েক কূটনীতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তিন প্রতিনিধিও আছেন।

এ ছাড়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও আইসিজেতে গাম্বিয়াকে সমর্থন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। ইতোমধ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত বব রয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গতকাল নেদারল্যান্ডসে পৌঁছেছে। ফলে সব মিলে নেদারল্যান্ডসে মিয়ানমার যে বিষম এক চাপের মধ্যেই পড়তে যাচ্ছে তা স্পস্ট।

অবশ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান মনে করেন এই মামলা বাংলাদেশের জন্য তেমন কোনো শুভ ফল বয়ে আনবে না। তার পরও আন্তর্জাতিক আদালতে মামলাকে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের শুভসূচনা হিসেবে দেখছেন তিনি।

আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ‘এটা কোথায় গিয়ে পৌঁছবে সেটা বোঝা মুশকিল। তবে আস্তে আস্তে তা প্রকাশ হবে। বড় বিষয় হলো- যে কোনোভাবেই হোক, ইস্যুটি আন্তর্জাতিক আদালতে উঠানো গেল এবং মিয়ানমার এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাজি হলো। এর পর আরেকটি বিষয় হবে- রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিকভাবে আরও আলোচিত থাকবে। একটা ঘটনা যখন আদালতে উঠে যায়, তখন এটা একটা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে এর বিচারের রায় হতে বহু বছর লাগবে। বাংলাদেশের উচিত হবে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ব্যবস্থা করা।’

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আইসিজের এ ধরনের মামলা কয়েক বছর চলার কারণে গাম্বিয়া কয়েকটি বিষয়ের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন রায় প্রার্থনা করেছে। যেসব বিষয়ের জন্য গাম্বিয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়েছে সেগুলো হলো- গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমার অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবে। সামরিক, আধাসামরিক ও বেসামরিক অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা যাতে আর কোনো ধরনের গণহত্যা ঘটাতে না পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। মিয়ানমার গণহত্যা সংক্রান্ত কোনো ধরনের প্রমাণ নষ্ট করবে না এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও খারাপ করে- এমন কোনো কাজ তারা করবে না।

এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘বয়কট মিয়ানমার’ নামে যে ক্যাম্পেইনটি শুরু হয়েছে, এর উদ্যোক্তা জার্মানিভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনস। তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ফরসি ডট কো, রেস্টলেস বিংস, ডেস্টিনেশন জাস্টিস, রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক অব কানাডা, রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ অব ইন্ডিয়া ও এশিয়া সেন্টারের মতো সংগঠনগুলো।

কর্মসূচি নিয়ে বয়কট রোহিঙ্গা ডট অরগ তাদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে- রাখাইনে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নৃশংসতা ও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পক্ষে প্রত্যক্ষ ও নথিভুক্ত প্রমাণও রয়েছে। সারাবিশ্ব এর নিন্দা জানালেও হতাশার কথা- এ অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি।

ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা নাই সান লুইন বলেন, ‘জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন স্পষ্ট করেছে- মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের নির্মূলে একটি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী হিসেবে আমরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অধীনে ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকা অং সান সুচির মুক্তির আন্দোলন করে এসেছি। তবে তিনি সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শুধু খুনি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে চলছেন। তাই আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে সবার প্রতি আহ্বান জানাই।’

এ ছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার চূড়ান্ত শুনানি হওয়ার আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের আপাত সুরক্ষা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিতে আইসিজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফর্টিফাই রাইটস। তারা বলছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রেখেছে। দেশটি জাতিসংঘ জেনোসাইড কনভেনশনের আওতায় তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

নতুন প্রমাণাদিতে দেখা যাচ্ছে- মিয়ানমার সরকার কীভাবে তার এ সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে যাচ্ছে; কিন্তু ফর্টিফাই রাইটস সবার জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করতে চায়। আমাদের হাতে আসা নতুন প্রমাণে উঠে এসেছে- রোহিঙ্গাদের কীভাবে দাস-শ্রমিক হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে শ্রম শিবিরগুলোতে ব্যবহার করে আসছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এমনকি রোহিঙ্গা শিশুদেরও এসব কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এমনকি তাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে আসছে দেশটির সরকার।

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ওই সময় প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের উপকূলে এসে আশ্রয় নেয়; সৃষ্টি হয় একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকটের। এর পর শরণার্থীদের দেশে ফেরাতে তিনবার চেষ্টা করা হলেও রাখাইনের বর্তমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভয়, অনাগ্রহ, মিয়ানমারের গড়িমসি ও অসহযোগিতায় সব উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

কানাডা ও নেদারল্যান্ডস এক যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় গাম্বিয়াকে সর্বতোভাবে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে যুক্ত বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় কানাডার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অফিস। অটোয়া থেকে প্রচারিত বিবৃতিতে বলা হয়- কানাডা ও নেদারল্যান্ডস দ্য হেগের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যাসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে গাম্বিয়ার বিচার প্রার্থনার আবেদনকে স্বাগত জানায়।

আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতাকে সমুন্নত রাখা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি ঠেকাতে দেশ দুটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, যুগ্মভাবে তারা সম্ভাব্য সব ধরনের বিকল্প খুঁজবে এবং গাম্বিয়ার উদ্যোগে অব্যাহতভাবে সমর্থন ও সহায়তা দিয়ে যাবে। গণহত্যা প্রতিরোধসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে গণহত্যাসংক্রান্ত অপরাধ ঠেকানো এবং এর জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মানবতার প্রতি দায় থেকেই গাম্বিয়াকে এ সমর্থন দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং আইসিজের প্রতিনিধিদের মধ্যে পৃথক মতবিনিময়ের দায়িত্ব নিয়েছে নেদারল্যান্ডসে কর্মরত একটি আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা। গতকাল গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবুবাকার তামাদুর সম্মানে ওআইসির চার সদস্য রাষ্ট্র- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ এক সংবর্ধনার আয়োজন করেছিল। আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলার প্রক্রিয়ায় যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আছে, সেটার বহির্প্রকাশ হিসেবে ওই আয়োজন করা হয়।

 

advertisement