advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অপহরণ পরিকল্পনায় যুক্ত এক নারী, ৮ বছরেও মেলেনি সেলিমের সন্ধান

জনি রায়হান
১১ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৯:৪৯ | আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৪:১১
আবু সেলিম (৩০)। ছবি : আমাদের সময়
advertisement

স্ত্রী ও ছোট দুই ছেলেকে রেখে ২০১১ সালের ২৮ মে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন আবু সেলিম (৩০) নামে এক ব্যক্তি। ঢাকায় এসে প্রতিবারের মতোই তার পূর্ব পরিচিত ফিরোজ হোসেন নামে এক ব্যক্তির বাসায় উঠেছিলেন তিনি। পশ্চিম কাজী পাড়া এলাকায় সেই বাসা থেকেই ২০১১ সালের ২৯ মে নিখোঁজ হন সেলিম।

পরে আত্মীয় স্বজনরা জানতে পারেন, সেলিমকে ওই বাসা থেকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর সেলিমের চাচা বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই মামলাটির দীর্ঘ তদন্তে থানা পুলিশ, ডিবি সেলিমের কোনো সন্ধানই বের করতে পারেননি। অবশ্য এই মামলার আসামিরা সবাই এখন জামিনে মুক্ত হয়ে দিব্যি দিন কাটাচ্ছেন। শুধুমাত্র বাবার অপেক্ষায় দিন গুণছে সেলিমের দুই সন্তান, আর স্ত্রী।

ছেলেকে জীবিত ফিরে পাবেন এমন আশায় বুক বেঁধে বসে আছেন সেলিমের বাবা-মা। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে এটা কিছুটা স্পষ্ট হয়েছে যে, সেলিমকে হয়তো অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে। তবে সেলিমকে যদি হত্যাও করা হয়ে থাকে, তবে তার লাশ কোথায়? এমন প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারছেন না কেউই।

অপহরণের পর আট বছর পার হলেও এখনো সেলিমের কোনো সন্ধান পায়নি তার পরিবার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, মামলার নথিপত্র ঘেঁটে ও সেলিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

যেভাবে অপহরণ হয়েছিল সেলিম

সেলিম অপহরণের ঘটনায় তার চাচা ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান বাদী হয়ে ২০১১ সালের ২ জুন একটি মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আবু সেলিম (৩০) ২০১১ সালের ২৮ মে কে-লাইন বাসে করে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে ঢাকায় আসেন। এরপর ফিরোজ হোসেন নামে পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তির ৬৪৮/২ পশ্চিম কাজীপাড়ার ভাড়া বাড়িতে ওঠেন এবং রাতে থাকেন। পরের দিন অর্থাৎ ২৯ মে সকাল ৯টায় সেলিম মোবাইলে তার স্ত্রী এবং তার ইট ভাটার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলেন। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে সেলিমের স্ত্রী তার কাছে থাকা দুটি মোবাইলে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে নম্বর দুটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে না পেয়ে কাফরুল থানায় ৩০-০৫-২০১১ তারিখে একটি জিডি করা হয়।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ‘জিডি করার পরের দিন ৩১-০৫-২০১১ তারিখে সেলিমের বন্ধু মাসুম বিল্লাহ তাদের আরেক বন্ধু টুটুলকে ফোন করে বলেন, “তুই আমার সঙ্গে বিকেল ৬টায় দেখা করবি। তোকে সেলিমের নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে তথ্য দেব। কিন্তু তুই সেলিমের চাচা বা অন্য কোনো আত্মীয় স্বজনকে আনবি না। সাক্ষাতের স্থান এবং সময় পরে জানিয়ে দেব।” পরবর্তীতে টুটুল বিকেল ৫টায় তাকে ফোন করে জানতে চান “আমি তোর সঙ্গে কোথায় দেখা করতে আসবো।” তখন মাসুম বলেন, “আজ তোর আসার দরকার নাই। এখন অন্য জায়গায় কাজে যাব। তোকে পরে বিষয়টি জানাবো।”’

এজাহার বলা হয়, ‘এমন ঘটনার পরে আমরা জানতে পারি ফিরোজের ওই বাসাতেই সেলিমের ব্যাগ রয়েছে। এরপর আমরা আত্মীয় স্বজনরা সবাই মিলে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি যে, এলাকায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও বিষয়াদির জের ধরে আসামি মো. মাসুম বিল্লাহ, মো. ফিরোজ হোসেন, আশা আক্তার, রফিকুল ইসলাম রকি, জিয়াউর রহমান জিয়া, রবিউল ইসলাম, কামরুল ইসলাম ও রমজান আলী মেম্বারসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে সেলিমকে কাজীপাড়ার সেই বাসা থেকে অপহরণ করে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটক করে রেখেছে অথবা তাকে হত্যা করেছে।’

কী ঘটেছিল সেদিন?

সেলিমের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় আসার পরের দিন সকালে (অপহরণের দিন) সেলিম তার স্ত্রী ও ম্যানেজারের সঙ্গে মোবাইলে খুব স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছিল। তাই সবার ধারণা, এরপরই তার সঙ্গে কিছু একটা ঘটেছে। মামলা সূত্রে জানা যায়, ওই বাসা থেকেই সেলিমের ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু বাসার ভাড়াটিয়া ফিরোজ হোসেনের ( মামলার আসামি) দাবি, সে জানেই না সেলিম কোথায় গিয়েছে বা তার সঙ্গে কী ঘটেছে।

তবে ওই দিন রাতে বা সকালে আসলে কি ঘটেছিল সে বিষয়ে এখনো পুরোপুরি অন্ধকারে তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং সেলিমের স্বজনরা।

‘অপহরণের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন এক নারী’

এই মামলার সঙ্গে যুক্ত সাত আসামিকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তাদের মধ্যে আশা আক্তার নামে এক নারী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার পরে তার কাছ থেকে সেলিমের মোবাইল ফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছিল। যদিও গ্রেপ্তার হওয়া সেই নারী এখন জামিনে মুক্ত আছেন।

মামলা সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে এক নারী জড়িত ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারীকে দিয়েই ফাঁদ পেতে সেলিমকে ঢাকায় এনে অপহরণ করা হয়েছে।’

তবে সেলিমের পরিবারের সদস্যদের দাবি, তারা এই নারী সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, ওই নারী ২৮ মে রাতে সেলিমের সঙ্গেই ছিলেন। আর ঘটনার পরে তিনি ঢাকা থেকে পালিয়ে আবার সাতক্ষীরা গিয়েছিলেন। পরে তাকে সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

বাবার অপেক্ষায় দুই সন্তান

২০১১ সালে সেলিম যখন অপহরণ হয় তখন তার দুই ছেলে খুবই ছোট ছিল। বড় ছেলের বয়স ছিল পাঁচ বছর। আর ছোট ছেলের বয়স তখন মাত্র তিন বছর।

সেলিমের চাচা জিয়াউর রহমান দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘আমার ভাই প্রায় ২০ বছরে ধরে এলাকার চেয়ারম্যান। তার একমাত্র ছেলে সেলিম। আমার সঙ্গে বয়সের খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। তাই বন্ধুর মতোই মিশতাম। সেলিমের ফুটফুটে দুই ছেলে বাবা ছাড়া অনেক কষ্টে দিন পার করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেলিমের স্ত্রী ও সন্তানসহ আমরা সবাই মিথ্যা অপেক্ষায় আছি হয়তোবা কোনো দিন সেলিমের খোঁজ মিলবে। আসলে সে কি বেঁচে আছে না মারা গেছে সেটাও তো আমরা কেউই জানি না।’

‘ছেলের লাশটা পাইলেও শান্তি পাইতাম’

ছেলে হারানোর পর থেকে পাগল প্রায় সেলিমের বাবা-মা। তাদের দুই মেয়ের পর সেলিমই ছিলেন একমাত্র ছেলে। তাই ছেলের কথা মনে পড়লেই কেঁদে ওঠে মায়ের মন।

সেলিমের বাবা মো. আব্দুর রউফ দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা সন্তান হারা দুঃখ কাকে বোঝাবো। ছেলের লাশটা পাইলেও শান্তি পাইতাম। তাকে তো গুম করা হয়েছে। না হলে এত দিন হয়ে গেলো কেউই কোনো খবর বের করতে পারলো না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় কয়জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল। তারা সবাই এখন জামিনে মুক্ত হয়ে দিব্যি জীবন কাটাচ্ছে। সেই দিন ঢাকা থেকে পিবিআই পুলিশের একজন অফিসার এসেছিল তদন্ত করতে। এত বছরের তদন্ত কবে শেষ হবে আল্লাহ ভালো জানেন।’

মামলাটির সবই অন্ধকারে-পুলিশ

সেলিম অপহরণের বিষয়ে দায়ের করা মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আলামিন শেখ দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘এই মামলাটির সব কিছুই অন্ধকারে। উন্নত তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অনেক বিষয়ে জানা গেছে। যা তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। তবে এটি একটি সুপরিকল্পিত ঘটনা ছিলো। আর সেলিমকে অপহরণের সময় এক নারীকে কাজে লাগানো হয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেলিমের মোবাইল, ব্যাগ অনেক কিছুই ঘটনার পরে উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু সেলিমের কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি।’

advertisement