advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৩:৪৮
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে গতকাল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ফুলেল শ্রদ্ধায় স্মরণ করতে রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে গিয়েছিল শিশুরাও। - আল আমিন লিয়ন
advertisement

দেশপ্রেম ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ নিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করেছে পুরো জাতি। এ সময় সারাদেশে ঘাতকদের হাতে শহীদ হওয়া বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা দ্রুত প্রণয়নের দাবি জানান শোকাহত মানুষজন। গতকাল শনিবার যথাযথ মর্যাদায় রাজধানীসহ সারাদেশে দিবসটি পালিত হয়।

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ঠিক দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর বাঙালির শ্রেষ্ঠ মেধাবী সন্তানদের ধরে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনীর এ দেশীয় দোসর আলবদররা। পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য

করতে ঘৃণ্য এ নীলনকশা বাস্তবায়ন করে এ দেশেরই কিছু মানুষ। শহীদদের অনেকের ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায় মিরপুর ও রায়েরবাজার এলাকায়। এ দুটি স্থানে স্থাপিত স্মৃতিসৌধ গতকাল সকাল থেকে ছেয়ে যায় শ্রদ্ধার ফুলে।

মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সকাল ৭টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল সামরিক কায়দায় সালাম জানায়। পরে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর দলীয় প্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বেদিতে আবারও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। পরে উপস্থিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন তিনি। এ সময় হুইপ ইকবালুর রহিম ও আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এবং সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার চলে যাওয়ার পর সর্বস্তরের জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ। জাতীয় পতাকা আর শ্রদ্ধার ফুল হাতে নিয়ে নানা বয়সের মানুষ শ্রদ্ধা জানান শহীদ বেদিতে। একে একে শ্রদ্ধা জানান শহীদ পরিবারের সন্তান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ১৪ দল, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাসদ, গণফোরামসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি বিশ^বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়। সকাল পৌনে ১০টায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটির নেতারা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যান। এ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

সকালে রাজধানীর রায়েরবাজারে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এনামুল হক শামীম, মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের ওবায়দুল কাদের বলেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ বলায় দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছি। এখনো যেসব অপশক্তি সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে তাদের মূলোৎপাটন করা হবে।

আওয়ামী লীগ ছাড়াও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, সিপিবি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকরাও এসেছিলেন রায়েরবাজারে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।

এদিন রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচি পালন করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর। ‘স্মৃতিতে রায়েরবাজার বধ্যভূমি’ শীর্ষক এ অবস্থান কর্মসূচিতে খেলাঘরের সদস্যরা সাদা কাপড় পরে চোখে কালো কাপড় বেঁধে অবস্থান নেন। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ছিল যন্ত্রসংগীত, গান, কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের দাবিও এসেছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ ৭১-এর মহাসচিব হারুন হাবীব এ দাবি জানান। তিনি বলেন, গণহত্যার জাতীয় স্বীকৃতি এসেছে। এখন জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায়ের দাবি জানাচ্ছি।

দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল গতকাল বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে। সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দিবসটির তাৎপর্য নিয়ে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধ এবং শহীদদের নিয়ে আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এদিন সকালে ধানম-িতে বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে আওয়ামী লীগ নেতারা যান রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে। বেলা ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটশন মিলনায়তনে বুদ্ধিজীবী দিবস নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের আলোচনাসভা। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে বক্তৃতা করেন।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মিরপুরের বাসিন্দা আবদুল মান্নান বলেন, দেশ মাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সুতরাং দেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থেকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে পাওয়া স্বাধীনতা যেন দেশ বিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার না হয় সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

সাইফুল ইসলাম নামে এক মুক্তিযোদ্ধা বলেন, নিশ্চিত পরাজয় জেনেই পাকিস্তানি আর্মিরা তাদের এ দেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে হত্যা করে। তারা এ হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল। আজকের এ দিনে সেই খুনিদের প্রতি তীব্র ঘৃণা জানাচ্ছি।

advertisement