advertisement
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাংলাদেশ-ভারত জ্বালানি তেল সরবরাহ : পাইপলাইন হবে কবে

লুৎফর রহমান কাকন
১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১০:৩৬
advertisement

বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম হলো ‘বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ তেল পাইপলাইন’। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ করার কথা। অন্যদিকে ২০২১ সালের মধ্যে পাইপলাইন দিয়ে চালু হওয়ার কথা জ্বালানি তেল সরবরাহ। কিন্তু ভারত অংশে জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের অন্য কাজে বেশ অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ অংশে খুবই কম। এ প্রেক্ষাপটে ভারতের পক্ষ থেকে প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে তাগিদ দিচ্ছে।

দেশের উত্তরাঞ্চলের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে ভারতের শিলিগুড়ি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ-ভারত। সরকারের পরিকল্পনা ভারত থেকে পাইপলাইনে উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল (ডিজেল) আমদানি করতে পারলে সেখানে খুব সহজে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। দীর্ঘ পরিবহন ব্যবস্থা এড়িয়ে নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে দ্রুত সময়ে তেল সরবরাহ করা যাবে। এতে পরিবহন খরচ অনেক কমে আসবে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয়সহ জ্বালানি বিভাগের প্রয়োজনীয় অসহযোগিতা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জনবল সংকটসহ নানা কারণে যথাসময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন আশানুরূপ এগিয়ে নিতে পারছে না (বিপিসি)। বাংলাদেশ অংশে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি চা-বাগানের ওপর দিয়ে পাইপলাইনের রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ওই চা-বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের বাগানের ওপর দিয়ে তেল পাইপলাইন স্থাপনে আপত্তি তুলেছে। এতে নতুন করে একটি সংকট বিপিসির সামনে এসেছে। বিপিসির চেয়ারম্যান এ বিষয়টিসহ সংশ্লিষ্ট আরও কিছু কাজ দ্রুত শেষ করতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের পরামর্শ চেয়েছেন। কারণ প্রকল্প সম্পন্ন করতে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত।

২০১২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে প্রস্তাব দেওয়া হয় ভারতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এলআরএল) থেকে বাংলাদেশে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সবরাহ করার। তাদের প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের একাধিক বৈঠকে পাইপলাইল স্থাপন এবং ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন-২০১০’-এর আওতায় ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেডের (এলআরএল) শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন (আইবিএফপিএল) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ-ভারত সরকার গত বছর ৯ এপ্রিল একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন করেন।

প্রকল্পের আওতায় শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটর পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে, যার মধ্যে ভারতীয় অংশে মাত্র ৫ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশ অংশে ১২৫ কিলোমিটার স্থাপন করতে হবে।

বিপিসি সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের প্রায় ১৪৭ দশমিক ৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে হুকুম দখল করতে হবে ১২৬ দশমিক ১৪ একর। পাইপলাইন রুটে তিনটি জেলার মধ্যে পঞ্চগড়ে ১২১ দশমিক ৩৫ একর, দিনাজপুরে ৫২ দশমিক শূন্য ১৮ একর, নীলফামারী জেলায় ১৪ দশমিক ২৮ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। পঞ্চগড়ে হুকুম দখল করতে হবে ৮২ দশমিক ১৮৯ একর, দিনাজপুরে ৩৩ দশমিক ৪৪ একর, নীলফামারীতে ৯ দশমিক ৪৯ একর। এ ছাড়া পার্বতীপুর রেলওয়ের ভূমিতে ৬টি তেলের স্টোরেজ ট্যাংকার নির্মাণ করতে হবে, যার জন্য সাড়ে পাঁচ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।

বিপিসি সূত্র জানায়, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলা প্রশাসক এবং ১ অক্টোবর দিনাজপুর জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র পাঠিয়ে জমি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখলের অনুমোদন চেয়েছে। এ ছাড়া ১৪ নভেম্বর বিপিসি থেকে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে বলা হয় সেকশনালাইজিংয়ের (এসভি স্টেশনের) জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতে। ভূমি অধিগ্রহণ, হুকুমদখল ও ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ১২০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, পাইপলাইন বাংলাবান্ধা থেকে পার্বতীপুর যাওয়ার পথে একাধিক নদী, সড়ক ও রেলপথ অতিক্রম করবে। বিআইডব্লিউটির অধীনে চারটি নদীর (তিস্তা, ইছামতি, করতোয়া, ডাউক নদী) ৬টি পয়েন্ট এবং রেলওয়ের অধীনে ৩টি পয়েন্ট সড়ক ও জনপথের চারটি পয়েন্ট এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ২৮ পয়েন্ট অতিক্রম করবে। ফলে এসব মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা দরকার।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এসব মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার জন্য কয়েক দফা চিঠি পাঠানো হলেও তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকেও প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে তৎপরতা দেখানো হচ্ছে না।

এদিকে দুদেশের সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান, পরিচালক (অপা. ও পরিকল্পনা) মো. সারওয়ার আলমসহ তিনটি তেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চলতি মাসের ১ ও ২ তারিখ পঞ্চগড়, নীলফামারী, দিনাজপুর বাংলাবান্ধা এলাকাসহ যেসব এলাকা দিয়ে পাইপলাইন স্থাপিত হবে সেখানে পরিদর্শন করেন। এ সময় কাজী অ্যান্ড কাজী চা-বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমস্যা সমাধানকল্পে আলোচনা করেন। প্রকল্পটি ঘুরে এসে বিপিসি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সঙ্গে দেখা করে প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করেন। পরে মুখ্য সচিব সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে একটি জরুরি সভার আয়োজনের নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ভারতীয় অংশে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পাইপলাইন। ফলে তারা সহজেই জমি অধিগ্রহণ ও পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ করতে পারবে। কিন্তু আমাদের এখানে ১২৫ কিলোমিটার এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। নদী, রেল, সড়ক ক্রস করতে হবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা দরকার। তিনি বলেন, একই সঙ্গে বিপিসির জনবল অত্যন্ত কম; ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে বিপণন কোম্পানির লোকবল যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে একটি চা-বাগান কর্তৃপক্ষের আপত্তি রয়েছে। সরকার তাদের আপত্তির বিষয়টিও বিবেচনা করছে।

এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ভারত সরকার গ্রান্ড ইন এইড প্রোগ্রামের আওতায় ৩০৩ কোটি রুপি অর্থায়ন করবে। ভারতীয় কোম্পানি পাইপলাইন স্থাপন করে দেবে। ইঞ্জিনিয়ার ইন্ডিয়া লিমিটেড পাইপলাইন স্থাপনে ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করে সেটা মূল্যায়ন পর্যায়ে রেখেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পাইপ সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিকাদার কোম্পানিটি।

দুই দেশের অগ্রাধিকার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চাপ দিচ্ছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। গত ২৯ নভেম্বর ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পার্বতীপুর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। এ ছাড়া একই ইস্যুতে গত ৪ ডিসেম্বর বিপিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

উল্লেখ্য, ভারত-বাংলাদেশ তেলের পাইপলাইন দেশের স্বনামখ্যাত চা-বাগান কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের মধ্য দিয়ে স্থাপনের নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি টি এস্টেট কোম্পানির শীর্ষ ব্যক্তিরা সরকারের কাছে অনুরোধ করেছে পাইপলাইনের রুট কিছুটা পরিবর্তন করে তাদের পুরনো চা-বাগান রক্ষা করতে। বিষয়টি নিয়ে টি এস্টেট কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত যোগাযোগ করেছে।

টি-বাগান কর্তৃপক্ষ বলছে, এ চা-বাগান প্রধানত অর্গানিক নীতিমালা অনুসরণ করে শতভাগ অর্গানিক চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত। সরকারের সহযোগিতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুবিধার্থে নব্বই দশকের শেষের দিকে সীমান্তবর্তী প্রায় পরিত্যক্ত পাথুরে জমিতে দার্জিলিংয়ের আদলে চা কোম্পানি অর্গানিক চা উৎপাদন শুরু করে। প্রায় ৩ দশক ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এই অর্গানিক বাগানটি বাংলাদেশের চা-শিল্পের নবদিগন্তের সূচনা করেছে। বৈচিত্র্যময় চা উৎপাদনকারী বাগানটি শ্রেষ্ঠ বাগান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জাতীয় রপ্তানি ট্রফি-২০১৭ অর্জন করে।

চা-বাগান কর্তৃপক্ষ বলছে বর্তমান পাইপ লাইনটির বর্তমান রুট অনুযায়ী বাগানের ওপর দিয়ে নিলে বাগানের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। কিন্তু অ্যালাইনমেন্ট প্রস্তাবনানুযায়ী কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে বাগানের বাইরের জমির মধ্যেই নির্মাণ করে নিলে চা-বাগান রক্ষা পাবে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক তথা জাতীয় স্বার্থও অক্ষুণ্ন থাকবে।

advertisement