advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মাসটি কতই না আনন্দ আর বেদনার -ড. এম এ মাননান

১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:০৯
advertisement

বিজয়ের মাসটি নিঃসন্দেহে আনন্দের। কারণ দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন; হানাদারদের লজ্জায় ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছেন; না খেয়ে না দেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে থেকে জীবন বাঁচানোর যন্ত্রণা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিয়েছেন; সারাদেশে রাজাকারদের নিত্য হামলার কবল থেকে শহর-গ্রামগঞ্জের নিরীহ মানুষকে বাঁচিয়েছেন; আলবদর-আলশামসের নৃশংস অত্যাচার আর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে বধ্যভূমিতে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেওয়ার বর্বরতা থেকে রেহাই দিয়েছেন। বিজয়ের মাসটি আরও কয়েকটি কারণে আনন্দের। যে রেসকোর্স ময়দানের রমনা কালীমন্দিরে হানাদাররা অগণিত নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, সে মন্দিরের পাশেই একাত্তরে এ মাসের ১৬ তারিখে হানাদার বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তখনকার সময়ে বিশ্বের চৌকস সেনাবাহিনী হিসেবে পরিচিত হানাদার বাহিনীর পঁচানব্বই হাজার সেনা অসম্মানজনকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে; মাথা নিচু করে ব্যারাকে ফিরে গিয়েছে; ধুলায় ভূলুণ্ঠিত হয়েছে দম্ভ। আর দেশের শ্রেষ্ঠ সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধারা রাইফেল উঁচিয়ে দম্ভভরে ঢুকেছে তাদের অহঙ্কার নিজেদেরই তৈরি নতুন রাষ্ট্রের রাজধানীতে। বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে একটি নতুন পতাকা, একটি পরিবর্তিত বিশ্বমানচিত্র। আনন্দের এ মাসের প্রথম থেকেই বিজয় পতাকা উড়তে থাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রণাঙ্গনে। বিজয়ের মাসটি আনন্দের হওয়ার আরেকটি বড় কারণ, এ মাসে অর্জিত বিজয় এক কোটি শরণার্থীকে ভারতের আশ্রয় শিবির থেকে এবং বাঙালি জাতির শিরোমণি স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার আর স্বাধীনতার ঘোষক এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের জল্লাদখানা থেকে আপন দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

একই সঙ্গে বিজয়ের মাসটি বেদনা আর কান্নার। মুক্তিযোদ্ধা আর লুকিয়ে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী নাগরিকরা আপন আপন বাড়িঘরে ফিরে এসে দেখেছে শুধুই ধ্বংসস্তূপ, জ্বালিয়ে দেওয়া বাড়িঘর, আপনজনদের কঙ্কাল, গণহত্যার কবর আর বধ্যভূমি, লুণ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পুড়িয়ে দেওয়া ফসলি জমি, বিপর্যস্ত রাস্তাঘাট, ধ্বংসপ্রাপ্ত রেলযোগাযোগ, উড়িয়ে দেওয়া পুল-কালভার্ট, লুট করে নেওয়ার কারণে গরুবিহীন গোয়ালঘর, নদীখালে ভাসমান চেনা-অচেনা মানুষের লাশের সারি, রাজাকারদের হাতে চরম নির্যাতিত আব্রুহারা নারীদের ফ্যালফ্যাল করা অশ্রুসজল চাহনি, স্বামীহারা-পুত্রহারাদের চোখের জল আর সাজানো সংসার-বাগানে অনিশ্চয়তার কৃষ্ণছায়া।

এ মাসেই আলবদর বাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সেরা অধ্যাপকসহ সারাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী, নাট্যশিল্পী আর চিকিৎসক। হানাদার বাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসররা ডিসেম্বরে এসে নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে শুরু করে দেশটাকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পিত ছক বাস্তবায়ন। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের, ঢাকার বাইরে রেলগাড়ির ইঞ্জিনের জ্বলন্ত চুলায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে কিংবা ট্রাকের পেছনে বেঁধে চেঁচাতে চেঁচাতে মেরে ফেলে অনেক কবি-সাহিত্যিক-লেখককে। বুদ্ধিজীবী হত্যার বেদনা দেশবাসী কখনো ভুলতে পারবে না। প্রত্যেকটা বিজয়ের দিবসে মানসপটে ভেসে উঠবে নির্মম অত্যাচারের কাহিনি, বেদনায় ভরে যাবে সারা হৃদয়। যারা নয় মাস ধরে দখলদার বাহিনী আর রাজাকার-আলবদর বাহিনীর জল্লাদদের চালানো অবর্ণনীয় নির্মমতা নিজ চোখে দেখেনি, তাদের পক্ষে কোনোভাবেই বুঝে ওঠা সম্ভব নয় কী ভয়ঙ্কর সময় ছিল নয়টি মাস। তাই বিজয়ের মাস ডিসেম্বর একাত্তরে হয়ে উঠেছিল দেশবাসীর জন্য যেমন বেদনার, তেমনি একই সঙ্গে আনন্দের।

বিজয় এমনি এমনি অর্জিত হয়নি। আজকের তরুণ প্রজন্মর জানা দরকার বিজয়ের পেছনের রক্তক্ষরা দিনগুলোতে কী ঘটানো হয়েছিল সারা বাংলার বুকে। পাকিস্তানি সামরিক সরকার চেয়েছিল কতভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ) শোষণ করা যায়, ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায়, পূর্বের সম্পদ পশ্চিমে নেওয়া যায়, সিভিল সার্ভিস থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী, বিভিন্ন সরকারি চাকরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়। এমনকি বাঙালিদের মুখের ভাষা, প্রিয় বাংলা ভাষাকে বিলীন করে দিয়ে তার স্থলে পাকিস্তানিদের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্তে মেতে ওঠে। এমন সব ফন্দি আঁটা হয়েছিল যাতে রাজনীতিও বাংলার মানুষের নাগালের বাইরে থাকে। কতিপয় চিহ্নিত ক্ষমতালোভী আর লম্পট বাঙালিদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তাদের দিয়ে রাজনীতি শাসকদের পক্ষে রাখার চেষ্টা চালানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সঠিক সময়ে হাল না ধরলে এবং দিকনির্দেশনা না দিলে এ দেশের রাজনীতি কোথায় যে হারিয়ে যেত তা ভাবতেও ভয় হয়। পাকিস্তানি শাসকরা চক্রান্ত করেই সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পাওয়া সত্ত্বেও সরকার গঠন করতে দেয়নি। ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে তারা টালবাহানা করতে করতে শেষ পর্যন্ত বাঙালিদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিদের রুখতে না পেরে শাসকরা হঠাৎ করেই একাত্তরের ২৫ মার্চের রাত বারোটার পর ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে ঢাকাসহ সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে। প্রথম আত্রমণ চালায় বাঙালি পুলিশ অধ্যুষিত রাজারবাগ পুলিশ লাইনে; নির্মমভাবে হত্যা করে ঘুমন্ত পুলিশদের। একই সঙ্গে আক্রমণ চালায় জ্ঞানচর্চার রাজ্যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কটা আবাসিক হলে। উপাসনালয়কেও বাদ দেয়নি। সারা ঢাকা শহরে যাকে সামনে পেয়েছে, যাকে পেয়েছে বাড়িতে-দোকানে কিংবা অফিস-আদালতে, তাকেই পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে। তা-ব চালিয়েছে সারাদেশে।

বাঙালি কখনো অতীতে মচকায়নি, মুক্তিযুদ্ধেও তাদের মচকানো যায়নি। শির উঁচু করে হিমালয়ের মতো দাঁড়িয়ে অকুতোভয়ে যুদ্ধ করেছে এবং ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর পরই ঢাকার বুকে বিজয় পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরাধীন ঢাকা হয়ে ওঠে স্বাধীন সত্তার রাজধানী।

স্বাধীনতার পর ৪৮ বছর পার হয়ে গেল। মনে শঙ্কা অনেক। অনেক দামে কেনা স্বাধীনতা কি একাত্তরের অপশক্তির হাতে লাঞ্ছিত হবে? তখনকার কুচক্রী আর তাদের পরবর্তী বংশধররা চুপচাপ বসে নেই। জঙ্গিপনা, সন্ত্রাস, পুলিশের ওপর আচমকা আক্রমণ, শহরের এখানে সেখানে হঠাৎ বোমা ফাটানো ইত্যাদি ঘটনা শঙ্কা বাড়িয়ে তোলে। এদের হাত থেকে দেশটাকে রক্ষা করতে পারে তরুণ প্রজন্ম, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। তরুণ প্রজন্মকে বলি, তোমরা কখনো কল্পনাও করতে পারবে না কী রকম অচিন্তনীয় মানবতাবিধ্বংসী নৃশংসতার মধ্য দিয়ে তোমাদের বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন এবং দেশবাসী দিনাতিপাত করেছে। আর এ নৃশংসতা ঘটিয়েছিল যতটা না হানাদার বাহিনী, তার চেয়ে বেশি করেছিল এ দেশীয় বেইমান জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীরা। এসব ঘৃণ্য নরকীটরা নিজ দেশের এত বড় ক্ষতি করেছে যা তোমাদের কল্পনারও বাইরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তারা সদম্ভে অহঙ্কারের সঙ্গে ‘তারা যা করেছে তাতে কোনো ভুল ছিল না’ ধরনের মন্তব্যই শুধু করেনি, তারা কৌশলে পঁচাত্তর-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী সামরিক সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ করেছে, দেশের মানচিত্রখচিত পতাকা গাড়িতে ব্যবহার করে পতাকার সম্মান ভূলুণ্ঠিত করেছে, মন্ত্রিত্ব বাগিয়ে লুটপাট করে অর্থনীতির সর্বনাশ ঘটিয়েছে, বঙ্গভবন আর গণভবনকে অপবিত্র করেছে। সর্বোপরি দেশটাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানের মতো অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি টিকে থাকার মতো রাষ্ট্র নয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দৃঢ় নেতৃত্ব আর প্রজ্ঞার সঙ্গে দেশ পরিচালনার ভার স্কন্ধে না তুলে নিলে এ দেশটি হয়তো কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না। তোমরা ভেবে দেখো, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া আর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেঁচে থাকা মানুষগুলো চলে যাওয়ার পর কেউ তোমাদের স্বচক্ষে দেখা আর নিজ কানে শোনা অভিজ্ঞতা শোনাতে আসবে না। তোমরা জামায়াতে ইসলামীর নৃশংসতার কথা ভুলে যেও না, বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে হত্যার কথা বিস্মৃতির অতলে ঢেকে দিও না, তোমাদের পূর্বপুরুষদের উদোম গায়ে নির্যাতন করে হত্যার বিষয়টি শুধু বইপত্রের পাতায় আটকে রেখো না, তাদের আস্ফালনের বিকট হাসি অবহেলার চাদরে ঢেকে রেখো না। কালের বিবর্তনে মানুষ অনেক দুঃসহ যন্ত্রণা-বঞ্চনা-দুঃখ-কান্না-বেদনার কথা ভুলে যায়। তোমরা তেমন হয়ো না। সবকিছু তোমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়ে নিজেকে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যেয়ো। স্বাধীনতাপ্রাপ্তির প্রায় অর্ধশতক পরে বর্তমান তরুণ প্রজন্মর কাছে এমনটি প্রত্যাশা করা কি বেশি কিছু?

ড. এম এ মাননান : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম লেখক

advertisement