advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাংলাদেশ : জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে

আবুল কাসেম ফজলুল হক
২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ০১:৩৪
আবুল কাসেম ফজলুল হক
advertisement

দেশ এবং রাষ্ট্র এক নয়। দেশ প্রকৃতির সৃষ্টি আর রাষ্ট্র মানুষের। দুর্লঙ্ঘ্য পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, মরুভূমি ইত্যাদি দ্বারা পরিবেষ্টিত একেকটি বিশাল ভূভাগ হলো একেকটি দেশ। দেশের বেলায় সাধারণত ভূখ-, নদীনালা, গাছপালা, পশুপাখি, প্রাকৃতিক পরিবেশ, আকাশ-বাতাস ইত্যাদির কথাই আগে আসে-মানুষের কথা আসে পরে। শিল্পবিপ্লব বিকশিত হওয়ার আগে প্রতিটি দেশই অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে পরস্পরবিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত ছিল, অখ- দৈশিক সত্তা তখনো রূপ লাভ করেনি। তখন মানুষের বিচরণের পরিসর ছিল ক্ষুদ্র। পরে স্টিম ইঞ্জিন, মুদ্রণযন্ত্র ও অটোমোবাইলস ইত্যাদি বিকাশের ফলে মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগের ক্ষেত্র দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। তখন ক্রমে স্থানীয় অর্থনীতি থেকে আঞ্চলিক অর্থনীতি, আঞ্চলিক অর্থনীতি থেকে দৈশিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে। পাশাপাশি জনগণের মনোজীবনেও আনুষঙ্গিক নানা পরিবর্তন দেখা দেয়-জনগণের সাংস্কৃতিক সত্তা দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। দৈশিক সত্তা বজায় রেখে যাতায়াত ও যোগাযোগের গতি দেশের বাইরেও বিস্তৃত হতে থাকে। তার পর বিদ্যুতের আবিষ্কার ও বহু বিচিত্র ব্যবহার এতে নতুন মাত্রা যোগ করে। বিদ্যুতের ব্যাপ্তির আগেই জনমনে দেশভিত্তিক ঐক্যবোধ বা ঐক্যচেতনা দেখা দেয়।

দেশভিত্তিক এই ঐক্যবোধ বা ঐক্যচেতনাই জাতীয়তাবোধ বা জাতীয় চেতনা। জাতীয়তাবোধ বা জাতীয় চেতনাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীই জাতি (Nation)। ক্রমে দেশের জনগণের মধ্যে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের অন্তরগরজ দেখা দেয়। প্রত্যেক জাতির জনগণ স্বতন্ত্রভাবে অনুভব করে- ‘আমরা যদি আমাদের দেশে আমাদের জন্য একটি ভালো রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি, তা হলে সেই রাষ্ট্রে আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট জীবন সম্ভব হবে।’ তাতে শুরু হয় রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা-গড়ে তোলা হয় রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক আন্দোলন-জাতীয়তাবোধ উন্নীত হয় জাতীয়তাবাদে (Nationalism) এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিরাষ্ট্র।

ইউরোপে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় রাজতন্ত্র ও গির্জার কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে। উপনিবেশ দেশগুলোতে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় উপনিবেশকারী শক্তির ও সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটিয়ে। রাজতন্ত্র, জমিদারতন্ত্র, গির্জাতন্ত্র, উপনিবেশবাদ, ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ ও সাম্রাজবাদ জাতীয়তাবাদের শত্রু। জাতি, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র বিকাশশীল ব্যাপার। ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯) পর থেকে তিনটি আদর্শ অবলম্বন করে রাজনীতি বিকশিত হয়েছে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিকতাবাদ।

কয়েক বছর ধরে কোনো কোনো মহল থেকে কিছু লোক অত্যন্ত প্রবলভাবে জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করে চলছেন। জাতীয়তাবাদ একটি ধারণা-এর বাস্তব ভিত্তি আছে। বিষয়টি নিয়ে নানাজনের নানা মত হতেই পারে।

তবে বাংলাদেশে জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করতে গেলে জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর না ভেবে পারা যায় না। বাংলাদেশে জনজীবনের সমাধানযোগ্য সমস্যাবলির সমাধানকে জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা সমীচীন। জাতি, জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র ইত্যাদির বিরোধিতা যারা করেন তাদের বক্তব্য আমি ঠিক বুঝতে পারি না। উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবাদ ইত্যাদিকে আমি জাতীয়তাবাদ মনে করতে পারি না। এগুলো জাতীয়তাবাদের বিকার এবং জনগণের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। জাতীয়তাবাদের সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ, আন্তর্জাতকিতাবাদকে আমি জাতীয়তাবাদের পরিপন্থী মনে করতে পারি না। লেনিন, স্তালিন, মাও জেদং জাতীয়তাবাদের বিরোধী ছিলেন না। নিজ নিজ দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয়তাবাদকে তারা দরকারি মনে করেছেন।

গণতন্ত্রের কথা অনেকে বলেন। গণতন্ত্র কী? গত প্রায় ৪৮ বছরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কোনো লক্ষণ কি স্পষ্ট হয়েছে? বাংলাদেশ কি গণতন্ত্রের পথে চলছে? এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ কি একটি রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে? যে ধারায় বাংলাদেশ চলছে, তাতে আগামী দশ, বিশ, পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতখানি? অনেকে জাতি না বলে জাতিসত্তা বলে, জাতি (Nation) আর জাতিসত্তা কি এক? জাতি বাদ দিয়ে কথিত জাতিসত্তা নিয়ে কি রাষ্ট্র গঠন সম্ভব? বাংলাদেশে চাকমা, রাখাইন, গারো, সাঁওতাল প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর উন্নতির জন্য বাঙালি জনগোষ্ঠীর উন্নতিকে স্থগিত রাখা কি সমীচীন হবে? চাকমা, রাখাইন, গারো, সাঁওতাল প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর বিলীয়মান সব মাতৃভাষার উন্নতির জন্য বিকাশমান বাংলা ভাষার উন্নতি স্থগিত রাখা কি সমীচীন হবে?

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আমরা ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’রূপে পালন না করে ‘আন্তর্জাতকি মাতৃভাষা দিবস’রূপে পালন করে কি ঠিক কাজ করছি? বাংলা ভাষাকে তো ধীরে ধীরে রাষ্ট্রভাষার অবস্থান থেকে কেবল মাতৃভাষার অবস্থানে নামিয়ে ফেলা হচ্ছে। বাংলাদেশে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের বিবেচনা বাদ দিয়ে আমরা কোন লক্ষ্য নিয়ে সামনে চলছি। বাংলাদেশে ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ কিংবা ‘বহুত্বমূলক ঐক্য’ অবলম্বন করতে হয়। বৈচিত্র্যে কিংবা বহুত্বে যেমন গুরুত্ব দিতে হয়, তেমনি গুরুত্ব দিতে হয় ঐক্যে। তা না করে কেবল ‘বহুত্ববাদ’ অবলম্বন করে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনৈক্য সৃষ্টি করে চলার মধ্যে কল্যাণ কোথায়?

জাতিসত্তা, বহুত্ববাদ ও জাতীয় অনৈক্য নিয়ে বাংলাদেশ তো রাষ্ট্র হয়ে উঠছে না! জাতীয়তাবাদবিরোধী চিন্তাকে আমার কাছে ক্ষতিকর মনে হয়। আমি মনে করি বাংলাদেশে ‘জাতি’ ও ‘রাষ্ট্র’ গঠন আজ একান্ত দরকার। কথিত বিশিষ্ট নাগরিকদের কারও মধ্যেই এই দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে মানবাধিকার আজ একান্ত দরকার। সেই সঙ্গে দরকার সর্বজনীন গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নয়নের সঙ্গে ন্যায় বৃদ্ধি করা।

নিজেদের জাতি ও রাষ্ট্র গঠন না করে বিশ্বব্যাংক দ্বারা পরিচালিত হয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিণতি শতকরা অন্তত আশি ভাগ মানুষের জন্য কল্যাণকর হচ্ছে না।

গত চার দশকের মধ্যে নিঃরাজনীতিকৃত (depoliticized) হতে হতে জাতি, রাষ্ট্র ও রাজনীতি সম্পর্কে সুস্থ স্বাভাবিক ধারণাও আমাদের হারিয়ে গেছে। কথিত বিশিষ্ট নাগরিকরা এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাস অভিমুখী রাজনীতি করতে করতে সম্পূর্ণ অনুচিত ও বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক চিন্তার মধ্যে আছেন। সর্বোপরি আছে নৈতিক চেতনার নিদারুণ নিম্নগামিতা। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল দূতাবাসমুখী হওয়ার ফলে ঢাকায় অবস্থানকারী বৃহৎ শক্তিবর্গের কূটনীতিকরা ‘টুইসডে গ্রুপ’ নামে সংস্থা গঠন করে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি ও প্রকৃতি নির্ধারণ করে রাজনীতিকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছেন। মুক্তি ও উন্নতির উপায় বের করতে হলে এসব খতিয়ে দেখতে হবে।

আমাদের দরকার জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য। নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের কার্যক্রম বাদ দিয়ে শুধু সমাজতন্ত্র বা মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠার আয়োজন ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমাদের রাষ্ট্র না থাকলে আমরা কি ভালো থাকব? বাংলার বদলে ইংরেজিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা করার আয়োজন যারা করছেন, তাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কি স্বাধীন রাষ্ট্র থাকবে? তাদের আগ্রহ তো বাংলাদেশকে রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা নয়। তাদের আগ্রহ শুধু রাজত্ব করার দিকে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থা এখন এমন যে জাতি, রাজনীতি, রাষ্ট্র ইত্যাদি সম্পর্কে ইতিহাসের দিক দিয়ে সব মৌলিক ধারণাকে মূলগতভাবে পুনর্গঠিত করা আজ একান্ত দরকার। বিশ্বায়ন তো সাম্রাজ্যবাদেরই উচ্চতর স্তর। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র না হয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গের অধস্তন অবস্থানে থেকে বিশ্বব্যাংক দ্বারা পরিচালিত হয়ে চললে তা জনগণের জন্য চরম দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হবে। ভারতও এখন যুক্তরাষ্ট্রের জোটে আছে। সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সাত দফা চুক্তি হয়েছে, তার প্রতিটি দফাই ভারতের অনুকূল। বাংলাদেশকে আত্মশক্তি অর্জন করতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপন্থি ও ভারতপন্থি হতে গিয়ে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশ বিপন্ন। জনজীবনে বিপন্নতা তো আছেই। বাংলাদেশে রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেশবোধ, জাতীয়তাবোধ, রাষ্ট্রবোধ দরকার। তাদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধ দরকার। বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলতে হবে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের-বহুত্বমূলক ঐক্যের-নীতি নিয়ে জাতি গঠন করতে হবে। দুর্বল শক্তি কী করে প্রবল হতে পারে তার কর্মনীতি উদ্ভাবন করে নতুনভাবে কাজ আরম্ভ করতে হবে।

দূতাবাসমুখী রাজনীতি, কূটনীতিকদের মুখাপেক্ষী রাজনীতি নিপাত যাক। কথিত উদার গণতন্ত্রের পরিবর্তে সর্বজনীন গণতন্ত্রের আদর্শ উদ্ভাবন করতে হবে। দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সরকার গঠনের কর্মনীতিকে বাংলাদেশ-উপযোগী করে কার্যকর করতে হবে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে উদযাপন করতে হবে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’রূপে। রাষ্ট্রভাষা দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নবচেতনা সৃষ্টি করতে হবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক : প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement
Evall
advertisement