advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ককটেল : ত্রাসের রাজনীতির শেষ কোথায়?

গোলাম মোস্তফা
৫ জানুয়ারি ২০২০ ১৭:৪২ | আপডেট: ৫ জানুয়ারি ২০২০ ১৭:৪২
advertisement

টিএসসিতে বসে চায়ে চুমুক দিতেই খবর এলো ডাকসুর সামনে একটা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে! কয়েকদিন আগে মধুর ক্যান্টিনের সামনে একটা ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। আজ রোববার সকালে আবার ককটেল ফুটল! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ককটেল ফুটছে কিন্তু ককটেলবাজরা ধরাছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে কেন?

কে বা কারা এই ককটেল বোমার রাজনীতি করছে, তা জানা যায়নি, কেউ শনাক্ত হয়নি। কিন্তু কেন? প্রশাসন কী কাজে ব্যস্ত? প্রশাসনের তো ব্যস্ততা থাকতেই পারে, তবে এ ব্যাপারে উদাসীন থাকার কোনো যৌক্তিকতা আছে কি?

ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকাটাই প্রক্টরের প্রধান দায়িত্ব। একটি ঘটনার স্বরূপ উন্মোচন হতে না হতেই আরেকটি নাশকতার চেষ্টা! গত দুই সপ্তাহে বেশ কয়েকটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার আর কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি বলেই কি ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ নয়?

ক্যাম্পাসে প্রক্টরিয়াল টিম আছে। ডাকসুতে সিসিটিভি আছে, যা মধুর ক্যান্টিনের আশেপাশের কিছু অংশ কাভার করে। ক্যাম্পাসে ডজনখানেক গোয়েন্দাবাহিনী তৎপর আছে। প্রশাসন চাইলে এই শক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে সহজেই বোমাবাজদের শনাক্ত করতে পারে। এরপরও এরকম একটা সিরিয়াস বিষয়ে প্রশাসনের এমন উদাসীনতা কেন? প্রশাসন কি ডাকসুর হামলার ঘটনা থেকে ফোকাস সরাতে চাইছেন? এর পেছনে যে বা যারাই থাকুন না কেন তাদের বিশেষ স্বার্থ আছে। আর এই স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা ক্যাম্পাসে অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ককটেল বিস্ফোরণের ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

অতিসম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসুতে হামলার দায়ভার নুরুল হক নুরের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। নিজেদের দায় এড়াতে এবং ব্যর্থতাকে আড়াল করতে বহিরাগত জুজু সামনে এনেছে। শুধু তাই নয়, ডাকসুতে এত বড় নৃশংসতার ঘটনার পরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হামলাকরীদের নামে কোনো মামলা পর্যন্ত করেনি। অর্থাৎ ডাকসুতে হামলার ঘটনায় প্রক্টর ও উপাচার্য সরকারি এবং বেসরকারি বক্তব্যে যা প্রকাশ করেছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক!

ককটেল বোমার বিস্ফোরণের সঙ্গে প্রশাসনের কোনো হাত নেই, সেটা শতভাগ সত্য হলেও এ ব্যাপারে তাদের উদাসীন অবস্থানকে যে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সংশয় থাকার কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশে এই ককটেল বোমার রাজনীতির কবলে পড়ে বহু মানুষের জীবননাশ হয়েছে।

রাজনীতিতে ককটেল কেন লাগে? কোন রাজনীতিতে ককটেল লাগে? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো, ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং ক্ষমতায় যেতে ককটেল লাগে, আধিপত্য ধরে রাখতে, আধিপত্য বিস্তার করতে ককটেল লাগে, পেশিশক্তির জানান দিতেও ককটেল লাগে।

আমরা দেখেছি, ২০১৪ সালে সারা দেশে ককটেল ও পেট্রোলবোমায় শতশত মানুষ মরেছে। আওয়ামী লীগ প্রচার করেছে, বিএনপি আন্দোলনের নামে পেট্রোল-ককটেল বোমা ছুড়ে নাশকতার রাজনীতি করছে, মানুষ হত্যার রাজনীতি করছে। বিএনপি বলেছে, আওয়ামীলীগই পেট্রোলবোমা ফাটিয়ে বিএনপির আন্দোলন নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে। এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপের ভেতরেই বোমার আঘাতে সাধারণ মানুষই কিন্তু মরেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন প্রায়ই ককটেলের আওয়াজ শুনে ঘুমাতে যেতাম, উঠতামও ককটেলের বিকট শব্দে! তখন ছাত্রলীগ-শিবির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। 

ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দৌড়ে সফল হওয়ার জন্য হত্যার কৌশল কারা করে? গ্রেনেড হামলা, বোমা হামলা, পেট্রোলবোমা হামলা, ককটেল মারার ঘটনাগুলো ঘেঁটে দেখলে উঠে আসবে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নাম।  প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এসব দলের সদস্যরাই নাশকতার সঙ্গে যুক্ত হয়, বোমা ফাটিয়ে নাশকতা তৈরি করে।

সম্প্রতি আমরা দেখেছি, যশোরের বেনাপোল উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আকুল হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বোমা তৈরির সরঞ্জাম, ম্যাগজিন, গুলি, দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।

ভারতে চলমান উগ্র সাম্প্রদায়িক এনআরসি ও সিএএ বিরোধী আন্দোলনেও প্রায় এরকমই একটা ঘটনা দেখা গেল। নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতায় ভারতজুড়ে প্রতিবাদের ঘটনায় কিছুদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিক্ষোভকারীদের পোশাক নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। মোদি বলেছিলেন, ‘পোশাক দেখেই বোঝা যায়, কারা হিংসা ছড়াচ্ছে।’ এই মন্তব্যের চাক্ষুষ প্রমাণ হাজির করতে মোদি সরকারের অনুসারীরা ‘টুপি আর লুঙ্গি পরে’ আন্দোলনকারী সেজে নাশকতার উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে  ট্রেনে পাথর ছোঁড়ে। কিন্তু ট্রেনে পাথর ছোঁড়ার সময় তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে স্থানীয়রা। টুপি আর লুঙ্গি পরে ট্রেনে পাথর ছোঁড়ার অভিযোগে ছয় বিজেপি কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। বাংলাদেশ-ভারতসহ দেশে দেশে বিরোধী মত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের এই নাশকতামূলক, বিদ্বেষপূর্ণ কূটকৌশলের রাজনীতি চালু রেখেছে জনবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠী।

এবার আসি আগের প্রসঙ্গে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা যেকোনো স্থানে ককটেল, পেট্রোল, গ্রেনেড-যাই ফাটুক তা সর্বসাধারণের জন্য বা সমাজের জন্যই হুমকি ও নাশের আতঙ্ক কিংবা জীবনহানি ঘটাতে পারে। ক্যাম্পাসে বোমা ফাটলে শিক্ষার্থীদের চলাচলের এবং নৈমিত্তিক জীবনযাপনের স্বঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়। দেশে বোমা ফাটলে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বিঘ্ন ঘটে। কিন্তু এই নাশকতামূলক ঘটনাকে পুঁজি করে কেউ কেউ ‘রাজনীতি’ যে করে আজকের দিনে সেটা সবার কাছে পরিস্কার।

ছাত্রসমাজের কাছে এবং দেশবাসীর কাছে একটাই বলার সেটা হচ্ছে, প্রশাসন ও সরকারের বা ক্ষমতা লিপ্সু লুটেরাদের কথায় বা গুজবে কান দেবেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিৎ দ্রুত ককটেল বিস্ফোরণকারীদের শনাক্ত ক্যাম্পাসে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। আর যদি তারা নীবর থাকেন, তাহলে তাদের প্রতি ছাত্রসমাজ এবং দেশবাসী আস্থাহীন হয়ে পড়বেন।

গোলাম মোস্তফা : কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন

advertisement