advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গওহার নঈম ওয়ারা
নির্বাচন কমিশন কি সিরিয়াস

৮ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০০
আপডেট: ৮ জানুয়ারি ২০২০ ০১:০২
ফাইল ছবি
advertisement

সনাতন ধর্মীয় বিধান অনুসারে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা পালিত হয়। ওই হিসাবে ৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিমা স্থাপনের মাধ্যমে বুধবার (২৯ জানুয়ারি) মাঝরাতে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। পূজা-অর্চনা হবে বৃহস্পতিবার সকালে আর সন্ধ্যায় হবে আরতি। বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর পূজা সনাতনী প্রতিটি পরিবার যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপন করে থাকে। আগের মতো এখনো হয়তো পূজা শেষে ছোট ছেলেমেয়েদের হাতেখড়ি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে পূজাম-পেই। পুরোহিতের কাছে কলাপাতায় লিখে শিশুরা লেখাপড়া পর্ব শুরু করে। বাংলাদেশের প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই এ পূজা হয়। সনাতন ধর্মের অনুসারীদের আর বিদ্যার্থীদের জন্য এটি একটি বিশেষ দিন। সরস্বতী পূজা শুধু উৎসব-উদযাপনে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনুসারী, ভক্ত, এমনকি ধর্মকর্মে কম মতি আছে-এমন ব্যক্তিরাও এদিনটির আনুষ্ঠানিকতা মেনে চলার চেষ্টা করেন।

এমন এক বিশেষ দিনে বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানীর দুই নগরপিতা নির্বাচিত হবেন। গঠিত হবে তাদের নিজ নিজ নগর পরিষদ। নির্বাচন কমিশন কোন বিবেচনায় এমন একটি সিদ্ধান্ত নিল, কে জানে? আমার এক বন্ধু এ বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পুজো তো প্রতিবছর হয়, এক বছর না হলে কী হবে! নির্বাচন তো প্রতিবছর হয় না। আর তা ছাড়া আমরা তো ধর্মনিরপেক্ষ। তাই হিন্দুদের পূজা হলো কী, না হলো-তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ভোটের আনন্দ পূজার আনন্দে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। ভোট দেব, নাড়ু খাব-সমস্যা কী?’ সিরিয়াস টাইপ আরেক বন্ধু লিখেছেন, ‘তা হলে নির্বাচন কমিশনের কি কোনো বিবেচনা নেই?’

আমার বন্ধু সিরিয়াস হলেও নির্বাচন কমিশন যে মোটেও নির্বাচনের বিষয়টি সিরিয়াসলি নেয়নি, তা এই একটি আলামত থেকে বোঝা যায়। এমনকি নির্বাচন কমিশনের যে সদস্য যাত্রাদলের বিবেক চরিত্রের মতো মাঝে মধ্যে নির্দিষ্ট বিরতিতে বিবেকের গান গেয়ে ওঠেন, তিনিও নিশ্চুপ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা ভোটের দিন সাধারণত ভোটের নানা দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তাদের সানন্দ উপস্থিতি কি নিশ্চিত করা যাবে এ রকম একদিনে। ইতোমধ্যেই মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর তাদের সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনের কোনো দায়িত্ব না দিতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন।

প্রার্থীরা : আপাতত বাতিল জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিএম কামরুল ইসলাম ছাড়া ঢাকা উত্তরে থাকছেন সদ্য গদিছাড়া মেয়র আতিকুল ইসলাম, বিএনপির তাবিথ আউয়াল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) আহমেদ সাজেদুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের (পিডিপি) শাহীন খান।

ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে সাতজন থাকছেন-বিএনপির ইশরাক হোসেন, আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন মিলন ছাড়াও গণফ্রন্টের আবদুস সামাদ সুজন, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আক্তার উজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লাহ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবদুর রহমান, বাংলাদেশ পিপলস পার্টির বাহারানে সুলতান বাহার। বলা বাহুল্য, তাদের মধ্যে একজনও নারী প্রার্থী নেই। নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছাড়া ওয়ার্ড কমিশনার পদেও নারী প্রার্থী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিএনপি চার নারী প্রার্থীকে সমর্থন দিলেও আওয়ামী লীগ সমর্থন দিচ্ছে মাত্র দু’জনকে। মুজিব শতবর্ষে এ চেহারাটা প্রচারের জন্য হলেও অন্যরকম করা যেত।

মাঠে নামার আগেই বিরোধী প্রার্থীদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার গন্ধ : ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীরা এখনো প্রতীক পাননি। প্রতীক পেলে প্রচারে মাঠে নামবেন তারা। কিন্তু সেখানেও আলামত ভালো নয়। প্রার্থীদের সমর্থকসহ হয়তো গা-ঢাকা দিয়েই থাকতে হবে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির সমর্থনে কাউন্সিলর প্রার্থী তাজউদ্দিন আহমেদ তাজু গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি রাজধানীর গোপীবাগে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে নিজ ওয়ার্ডের দিকে যাচ্ছিলেন। মতিঝিলের ইত্তেফাক মোড় থেকে বিকাল সোয়া ৪টার দিকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি বংশাল থানা বিএনপির সভাপতি। বংশাল থানার ওসি শাহীন ফকির বলেছেন, ‘তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে এবং কয়েকটিতে গ্রেফতারি পরোয়ানাও আছে। তাই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

জানা গেছে, শুধু তাজউদ্দিনই নন, দুই সিটিতে অংশ নেওয়া বিএনপির প্রায় সব কাউন্সিলর প্রার্থীই বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলার আসামি। অনেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। ডজন মামলার ওপরে বিএনপির প্রায় সব প্রার্থীই। ভোটের শুরুতেই তারা গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছেন। অন্যদিকে বিএনপিসহ স্বতন্ত্র অনেক প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের হুমকি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন। তারা বলছেন, এরই মধ্যে ফোনে বা কেউ সরাসরি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ দিচ্ছেন লোভনীয় প্রস্তাব।

ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন কি?

বাছাইয়ে বাদ পড়ার আগে জাতীয় পার্টির প্রার্থী কামরুল ইসলাম গণমাধ্যমের কাছে আশাবাদ ব্যক্ত করার সময় বলেছিলেন, ‘সরকারের সদিচ্ছার ওপর ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়া নির্ভর করছে। নানা পরিস্থিতির কারণে সরকার সদিচ্ছা দেখাবে বলে আমার বিশ্বাস। তাই আমার ভেতরে কোনো আশঙ্কা নেই।’ প্রথমবারের মতো মেয়র পদে লড়তে আসা সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ষড়যন্ত্র চলছে।’ নিজেকে বৈধ প্রার্থী দাবি করে আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি ডিওএইচএস এলাকায় থাকি বলে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলো। ভোটার তালিকায় আমার ২ নম্বর ওয়ার্ড ও সিটি করপোরেশন দেখানো হয়েছে। সেহেতু আমি যোগ্য ভোটার হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি, সেহেতু এখন আমি আইনের সহায়তা নেব।’

এরেকটু খোলসা করে বলেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি এক বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘ওই নির্বাচনের (৩০ ডিসেম্বর ২০১৮) কারণে ভোটারদের একটা আশঙ্কা আছে যে, তারা ভোট দিতে পারবেন কিনা। কারণ ভোটারদের ইচ্ছার ওপর ভোট দেয়া এখন আর নির্ভর করে না। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঠিক ভূমিকা এবং নির্বাচনে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার বিষয়টি নির্ভর করে। এই বিষয়গুলো ঠিক না থাকলে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আরেকটি মহড়া হতে পারে সিটি নির্বাচন।’

গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ২০১৫ সালের সিটি নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি এবার প্রার্থী হননি এবং নির্বাচন বর্জন করেছেন। তার কথা-‘নির্বাচন করে কী হবে? এরই মধ্যে দুজনকে তো অভিনন্দন জানানো শুরু হয়ে গেছে। তা হলে পূর্বনির্ধারিত ফলের এই নির্বাচনে গিয়ে লাভ কী? ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের নামে যে প্রহসন হয়েছে, এরই পুনরাবৃত্তি হবে।’

সব প্রতিকূলতা, আশঙ্কা, অনিচ্ছা, অনীহার মধ্যেও মুজিব শতবর্ষ সামনে রেখে একটি অবাধ, সুস্থ (নাকি সুষ্ঠু), গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আবহ সৃষ্টি করা সম্ভব। নতুন-পুরনো জটিল-কুটিল মামলা-হামলা এক মাসের জন্য শিকেয় তুলে রেখে খুব সহজেই একটা প্রায় অবাধ, কম অসুস্থ, অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কি খুবই কঠিন হবে? কে যেন বলেছেন, এ নির্বাচনের ফলাফলে আমরা তো আর গদি হারাব না। তবে তা-ই হোক, গদি আটকানোর ভোটের সময় কী হবে, সেটি পরে ভাবা যাবে। এটি অন্তত সুন্দর হোক, মানুষের আস্থা ফিরুক।

গওহার নঈম ওয়ারা : লেখক ও গবেষক

advertisement
Evall
advertisement