advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আবুল কাসেম ফজলুল হক
নৈতিক চেতনা ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতা

২২ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০০
আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২০ ২৩:৪৩
advertisement

ব্রিটিশশাসিত ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের কালে স্বাধীন জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের কিছু চিন্তা দেখা দিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ, ব্রিটিশ সরকারের ফরারফব ধহফ ৎঁষব ঢ়ড়ষরপু এবং কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার রাজনীতির মধ্যে তখন জয়ী হয়েছিল জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব। জাতীয়তাবাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদ ও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদ। সাম্প্রদায়িকতাবাদ (পড়সঁহধষরংস) ও জাতীয়তাবাদ (হধঃরড়হধষরংস) এক নয়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয় এবং তা ব্যর্থ হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় পূর্ববাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৪৭-৭১), যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা আন্দোলন (১৯৫৪-৫৮) এবং আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলনের (১৯৬৬-৭১) মধ্য দিয়ে ক্রমে বিকশিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা। ছয় দফা আন্দোলনের ধারায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অগণিত নর-নারীর প্রাণের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। তার পর আটচল্লিশ বছর পার হয়েছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে? বাংলাদেশের জনগণ কি রাষ্ট্র গড়ে তোলার উপযোগী একটি জাতি (হধঃরড়হ) রূপে চলছে?

বাংলাদেশের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ (বাঙালি কিংবা বাংলাদেশি) আছে, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র আছে। আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বাংলাদেশে রাজনীতিবিদদের এবং রাজনীতিতে তৎপর বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ, জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্র, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। ভেবে দেখা দরকার, এই অনাগ্রহের ফল কী হচ্ছে? এর মধ্যে চিন্তা ও কর্মের একটি ধারাকে দেখা যায় ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে খুব সক্রিয় এবং অপর একটি ধারাকে দেখা যায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে খুব সক্রিয়। রাজনীতি ও সমাজ এই দুই ধারার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল কী হচ্ছে? ১৯৮১ সাল থেকে প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে নিরঙ্কুশ সুবিধাবাদের। নৈতিক বিবেচনার প্রতি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। বাংলাদেশ হয়ে চলছে নিঃরাজনীতিকৃত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো সুস্থ রাজনৈতিক চিন্তা নেই। নির্দলীয় রাজনীতি, অদলীয় রাজনীতি, নাগরিক কমিটি, নাগরিক আন্দোলন, সামাজিক আন্দোলন, রাজনীতিবর্জিত সুশাসনের তত্ত্ব ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে রাজনীতির গতি ও প্রকৃতি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারভিত্তিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র। জাতি হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এখন অতিক্রম করছে এক অনিশ্চিত সময়। এই বাস্তবতায় উন্নতির পথে উত্তরণের জন্য দরকার উন্নত নতুন চিন্তা ও কাজ। প্রথমে ইতিহাসের দিক দিয়ে সমস্যার জটিলতাকে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ইবহমধষ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের শেষ অধ্যায়ে যদুনাথ সরকার বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার সময়কার অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে যেসব কথা লিখেছেন, তার একটি অংশের বাংলা করলে এই দাঁড়ায় :

ক্লাইভ যখন নবাবের ওপর আঘাত হানে, তখন দেখা যায়, মোগল সভ্যতা তার সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ভালো কিছু করার সামর্থ্য তখন তার আর নেই এবং তার অস্তিত্ব নিষ্প্রাণ। দেশের প্রশাসনব্যবস্থা তখন নৈরাশ্যজনকভাবে অসৎ ও অকর্মণ্য এবং দেশের জনগণ একটি সংকীর্ণচেতা, স্বার্থপর, উদ্ধত, অথর্ব শাসকশ্রেণি দ্বারা চরম দারিদ্র্য, অজ্ঞতা ও নৈতিক অধঃপতনে নিক্ষিপ্ত। ... সেনাবাহিনী বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে হতে একেবারে অকেজো ও ঝাঁঝরা হয়ে পড়েছিল। রাজদরবার ও অভিজাত শ্রেণির বিপুল অনাচার ও লাম্পট্যের ফলে সাধারণ পারিবারিক জীবনের পবিত্রতা হয়েছিল বিপর্যস্ত এবং রাজদরবার ও অভিজাতদের পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত ইন্দ্রিয়-উদ্দীপক সাহিত্য তাতে জুগিয়েছিল ইন্ধন। ধর্ম তখন পরিণত হয়েছিল সর্বপ্রকার পাপ ও অনাচারের রক্ষাকবচে।

ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে যদুনাথ সরকারের এই উক্তির যথার্থ বিচার করতে গেলে স্বীকার করতে হয়, ‘সাম্রাজ্য লোলুপ ব্রিটিশ বেনিয়ারা ভারতবর্ষ দখল করে নিয়েছিল’Ñ এ কথা বলে, ভারতবর্ষের পরাধীনতার কারণ কেবল ব্রিটিশ বেনিয়াদের ক্ষমতালিপ্সা ও অর্থলিপ্সার ওপর চাপিয়ে যে ইতিহাস রচনা করা হয়, তাতে সত্যের অপলাপ ঘটে। প্রকৃতপক্ষে অবক্ষয়ের ধারা চলে আসছিল মুর্শিদকুলী খানের পর থেকেই। মুর্শিদাবাদের রাজনীতি ও নবাব আলীবর্দীর পরিবার তখন নিপতিত হয়েছিল চরম অবক্ষয়ে। তখনকার অবস্থা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করলে জনসাধারণের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্দশা সম্পর্কেও অনেক কথা জানা যায়। কোনো কোনো দিক দিয়ে লক্ষ্মণ সেনের কালের সঙ্গে, এমনকি সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর মাৎস্যন্যায়ের সঙ্গে, ওই কালের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।

এসব বিষয় উল্লেখ করছি এই কারণে যে, ঢাকার সাম্প্রতিককালের রাজনীতির সঙ্গে মুর্শিদাবাদের তৎকালীন রাজনীতির কোনো কোনো দিক দিয়ে আশ্চর্য মিল আছে। বর্তমান সময়ের ঢাকা শহরের রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিকভাবে তৎপর বুদ্ধিজীবীদের, এনজিওপতিদের, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোর বিশিষ্ট নাগরিকদের, আমলাদের ও ধনিক-বণিকদের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে সেকালের মুর্শিদাবাদ শহরের শাসক সম্প্রদায়ের লোকদের ঐতিহাসিক ভূমিকার তুলনামূলক বিচারে গেলে দেখা যায়, দেশাত্মবোধ, স্বাজাত্যবোধ, আত্মমর্যাদাবোধ ও নৈতিক চেতনার দিক দিয়ে দুই কালের দুই শহরের শাসক সম্প্রদায়ের লোকরা প্রায় একই চরিত্রের। ভিন্নতা অনেক আছে, সেগুলো সবারই জানা। কিন্তু চরিত্রগত মিলের দিকটা সম্পর্কে সবাই জ্ঞাত নন। যারা জ্ঞাত, তারাও বিষয়টি নিয়ে উদাসীন থাকতেই পছন্দ করেন। তারা সন্তুষ্ট থাকেন কেবল ইংরেজদের ওপর দোষ চাপিয়েই। মুর্শিদাবাদের নবাব-দরবারের লোকদের রাজনৈতিক চরিত্র ও দুর্বলতাকে বিবেচনায় ধরতে চান না।

আজ যদি আমাদের উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির কথা ভাবতে হয়, তা হলে অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণাকেও পুনর্গঠিত করতে হবে। উন্নত ভবিষ্যতের পরিকল্পনা যেমন দরকার, তেমনি দরকার অতীত সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার পুনর্গঠনও। এজন্য কেউ কেউ বলেন, প্রত্যেক জেনারেশনকে তার ইতিহাস নতুন করে লিখতে হয়। জাতীয় চরিত্রকে উন্নত করতে হলে ইতিহাসের শিক্ষাকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হয়। গতানুগতির জন্য ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ দরকার হয় না।

কার্ল মার্কস ভারতে ব্রিটিশশাসন সম্পর্কে ১৮৫৩ সালে লিখেছেন : মহামোগলদের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভেঙে ফেলেছিল স্থানীয় মোগল শাসনকর্তারা, স্থানীয় শাসনকর্তাদের ক্ষমতা চূর্ণ করল মারাঠারা, মারাঠাদের ক্ষমতা ভাঙল আফগানরা এবং সবাই যখন সবার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন প্রবেশ করল ব্রিটেন এবং সক্ষম হলো সবাইকেই অধীন করতে। দেশটা শুধু হিন্দু আর মুসলমানেই বিভক্ত নয়, বিভক্ত বহু উপজাতিতে ও বর্ণাশ্রম জাতিভেদে। এমন একটা ভারসাম্যের ভিত্তিতে সমাজটার কাঠামো গড়াÑ যা এসেছে সমাজের সদস্যদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরাগ ও প্রথাবদ্ধ পরস্পরবিচ্ছিন্নতা থেকে। এমন একটা দেশ, এমন একটা সমাজÑ সে কি বিজিত হওয়ার এক অবধারিত শিকার হয়েই ছিল না? হিন্দুস্তানের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে যদি কিছুই আমরা না জানতাম, তা হলেও অন্তত এই একটি বিরাট ও অবিসংবাদিত তথ্য তো থাকত যে, এমনকি এই মুহূর্তেও ভারত ইংরেজ রাজ্যভুক্ত হয়ে আছে ভারতেরই খরচে এক ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বারাই। বিজিত হওয়ার নিয়তি ভারত তাই এড়াতে পারত না এবং তার অতীত ইতিহাস বলতে যদি কিছু থাকে তো, তার সবটাই হলো একের পর এক বিজিত হওয়ার ইতিহাস। ভারতীয় সমাজের কোনো ইতিহাসই নেই, অন্তত জানা ইতিহাস। ভারতের ইতিহাস বলে যা অভিহিত হয়, সে শুধু একের পর এক বহিরাক্রমণকারীদের ইতিহাস, যারা ওই প্রতিরোধহীন নিষ্ক্রিয় ও অপরিবর্তমান সমাজের ভিত্তির ওপর তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে গেছে। ভারত-বিজয়ের অধিকার ইংরেজদের ছিল কিনা, এটা তাই প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হলো : আমরা কি চাই তুর্কি বা পারসিক বা রুশদের দ্বারা ভারত বিজয়, নাকি ব্রিটেনদের দ্বারা ভারত বিজয়?

তখনকার নিতান্ত অপ্রতুল তথ্যের ভিত্তিতে কার্ল মার্কস ভারতবর্ষের ব্রিটিশশাসনাধীনে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া নির্দেশ করেছেন, পরবর্তীকালের অজস্র তথ্য তাকে সমর্থন করেছে, নাকচ করেনি। আত্মকলহে ভারতবর্ষ যখন দুর্বল হয়েছে, তখন বাইরে থেকে প্রবল এসে দুর্বল দেশটিকে দখল করে নিয়েছে।

আজকের দিনেও তো বাংলাদেশে তাই দেখা যাচ্ছে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অন্তর্দলীয় ও আন্তঃদলীয় কলহ ইত্যাদিতে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রধান দুই দলের নেতারা দেশের রাজনীতিকে করে তুলেছেন বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাস অভিমুখী, ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্ক অভিমুখী। বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় কূটনীতিকরা টুইসডে গ্রুপ নামে সংস্থা গঠন করে প্রতি মঙ্গলবারে বৈঠকে বসে আলাপ-আলোচনা করে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি ও প্রকৃতি নির্ধারণ করছেন। সেদিন মুর্শিদাবাদের ক্ষমতালিপ্সুরা সলাপরামর্শের জন্য যেতেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাসিমবাজার কুঠিতে। বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির লোকরা তাদের সন্তানদের করে চলছেন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। যাদের বলা যায় দ্বৈত নাগরিক, কার্যত বাংলাদেশে তারাই রাজত্ব করছেন। বাংলা ভাষাকে তারা রাষ্ট্রভাষারূপে রক্ষা করছেন না। এ অবস্থায় বিদেশি প্রবল শক্তি এসে দুর্বল এই দেশটির ওপর কর্তৃত্ব করছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় অর্ধশতাব্দীর ইতিহাস তো আত্মকলহে জাতির আত্মশক্তি ক্ষয় করা ও পরমুখাপেক্ষী হওয়ার ইতিহাস। বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাংক দ্বারা। জাতি ও রাষ্ট্র গঠন করা হচ্ছে না, দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ জুলুম-জবরদস্তি, প্রতারণা ও বঞ্চনার শিকার।

ব্রিটিশশাসিত বাংলায় অবশ্য নতুন মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল। পলাশীর যুদ্ধকালের অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছিল। দেখা দিয়েছিল এক রেনেসাঁস এবং পরে রেনেসাঁসের ধারায় গণজাগরণ। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ ও দেশভাগ সত্ত্বেও সম্ভব হয়েছিল ব্রিটিশশাসনের অবসান ঘটানো ও জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপ সাধন এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে রেনেসাঁসের ও গণজাগরণের সেই ধারা চলমান নেই। রাজনৈতিক দুর্গতির জন্য সব দায়িত্ব কেবল সেনাশাসকদের ওপর চাপিয়ে যে ইতিহাস প্রচার করা হয়, তাতে বড় রকমের তথ্য বিকৃতি থাকেÑ তা ইতিহাস নয়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বদলে ‘পূর্ববাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বিকশিত হয়ে চলছিল এবং সেই চেতনা অবলম্বন করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও হয়েছিল। সেই ধারায় ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা আর জাতিরূপে বিকশিত হতে পারলাম না, আত্মকলহে ভেঙে খানখান হয়ে গেলাম এবং রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণির লোকরা নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশি আধিপত্যবাদীদের ডেকে আনতে লাগল।

পূর্বোক্ত লেখায় কার্ল মার্কস আরও উল্লেখ করেছেন, বিজয়ীর তরবারির চাপে পড়ে কখনো কখনো ভারত ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, স্বাভাবিক অবস্থায় ভালো কিছু করার সংকল্প নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, ‘হিন্দুস্তানে মুসলমান বা মোগল কিংবা ব্রিটিশদের চাপ যখন থাকেনি, তখন হিন্দুস্তান যতগুলো বিবদমান স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছে, তার সংখ্যা হিন্দুস্তানের নগরগুলোর, এমনকি গ্রামগুলোর সংখ্যার মতো।’ এই অন্তর্কলহ ও সংহতিহীনতা আর জাতিরূপে বিকশিত না হওয়ার স্বভাবটা আজকের বাংলাদেশের বাঙালিদের সম্পর্কে বোধহয় একটুও কম সত্য নয়। ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ কথাটি এ দেশে ছিল, এখন নেই। ‘বহুত্ববাদ’ চালু করা হয়েছে। ‘বহুত্বমূলক ঐক্য’ আর ‘বহুত্ববাদ’ এক নয়। কেন্দ্রীয় ঐক্যের বিবেচনা বাদ দিয়ে কেবল বহুত্বের নীতি গ্রহণ করলে জাতি টেকে নাÑ রাষ্ট্রও টিকতে পারে না।

বাঙালিকে যারা হুজুগে, আত্মবিস্মৃত, আত্মকলহপরায়ণ, আত্মভ্রষ্ট ও আত্মঘাতী বলে অভিহিত করেছেন, তারা এ জাতির মহান সব সম্ভাবনার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনাবলিতে ব্যথিত হয়েই তা করেছেন। বাংলাদেশের জনজীবনের গোটা ইতিহাস তলিয়ে দেখলে এবং অভ্যন্তরীণ সব সম্পদ হিসাবে ধরলে উন্নত ভবিষ্যতের বিরাট সম্ভাবনা অনুভব করা যায়। দেশে উৎপাদন বাড়ছে, সম্পদ বাড়ছে, বৈষম্য বাড়ছে, অন্যায়-অবিচার বাড়ছে, সহিংসতা বাড়ছে, পাশবিক প্রবণতা বাড়ছে, মানবিক গুণাবলি কমছে। বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, জাতীয় হীনতাবোধ (হধঃরড়হধষ রহভবৎরড়ৎরঃু পড়সঢ়ষবী) এ জাতির প্রতিটি নর-নারীর জীবনকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যুদ্ধোত্তর প্রথম বছরগুলোতে সার্বিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে বাঙালি জাতিকে কেউ কেউ বলেছেন নৈতিক চেতনাহীন, কেউ কেউ বলেছেন ইতিহাস চেতনাহীন। সর্বজনীন কল্যাণে এই বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। পরিবর্তনের জন্য দেশবাসীর সচেতনতা ও প্রস্তুতি দরকার।

আবুল কাসেম ফজলুল হক : প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement