advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সভ্যতার গায়ে আদিমতার কালি

তুষার কান্তি সরকার
২২ জানুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২০ ২৩:৪৩
advertisement

বহতা নদী। আমার বড় মেয়ে। ক্লাস টেনে পড়ে। ছোট মেয়ে থ্রিতে। ওদের স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজ ওদের মা-ই করে। দুজনের একই স্কুল হওয়াতে কিছুটা রক্ষে। বউকে হাঁটাহাঁটি করলেও দৌড়াতে হয় না। কোচিংয়েও ওদের মা সঙ্গে করে নিয়ে যায়। ফেরেও সঙ্গে করে। নাচ শিখতে যাবে; তাও মা। কোনো কাজের লোক নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের চেনা ছবি। তিনবেলা ভাত-মাছ-ভাজি রাধতে হয়। ঘর মুছতে হয়। কাপড় ধুতে হয়। থালাবাটি মাজতে হয়। বাথরুম ঘষতে হয়। টুকটাক কাঁচাবাজারও করতে হয়। বাসায় অতিথি এলে সামলাতে হয়। কেউ চিকিৎসার জন্য এলেও ছোটাছুটি করতে হয়। আবার মেয়েদের সখ-আহ্লাদ পূরণ করতে মার্কেটে যেতে হয়। মা-ই মেয়েদের ভরসা। অন্যদেরও। আমারও। সব সামলাতে বউয়ের নাভিশ্বাস। আমি জানি, বুঝি। কিন্তু আমার একটা লাল দাগ দেওয়া গণ্ডি আছে। সীতাকে রক্ষা করার জন্য লক্ষ্মণের কেটে দেওয়া গণ্ডি। গণ্ডি পেরোতে ইচ্ছে করে না। এ ছাড়া অলস স্বভাবের এই আমি কিছুটা গাছাড়াও বটে। চলছে যখন চলুক। কিন্তু এখন আর চলছে না। ভয়ে নিথর হয়ে আসছে শরীর। চারপাশের বাতাস খুব ভারী। আলোর চেয়ে অন্ধকারের দাপট বেশি। বউ সঙ্গে থাকতেও কি মেয়ে দুটো নিরাপদ? কিংবা বউ একদিন অসুস্থ থাকলে মেয়েদের স্কুল কি বন্ধ থাকবে? বারবার এই প্রশ্নগুলোই বিদীর্ণ করছে আমার বুক।

সভ্যতা এগিয়ে চলছে। মন মানসিকতা না এগোলে সভ্যতা এগোয় না। তা হলে এ কোন মানসিকতা যেখানে লেগে রয়েছে আদিমতার কালি?

আমাদের চারপাশ মেয়েদের জন্য বড্ড অনিরাপদ। পাঁচ বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। স্বামীকে বেঁধে রেখে তার সামনে স্ত্রীর সম্ভ্রম লুট হচ্ছে। প্রতিবন্ধী লালসার শিকার হচ্ছে। পাঁচ বছরের শিশু মানুষ নামের হিংস্র হায়েনার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। শিক্ষকের কাছে ছাত্রী সর্বস্ব হারাচ্ছে। অশিক্ষিত পশুত্বের কাছে পরাজিত হচ্ছে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রীর সম্মান-সম্ভ্রম। রক্ষক কখনো-সখনো ভক্ষক হয়ে উঠছে। সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও অন্ধকার রয়ে গেছে কোনো কোনো পশুর ভেতরাত্মা। লালসা চরিতার্থ করার পর অনেক মেয়েদের মেরে ফেলা হচ্ছে। গুম হয়ে কেউ সারা জীবন থেকে যাচ্ছে নিখোঁজের তালিকায়। অনেক খবর আমাদের কান পর্যন্ত আসছে না। বদনামের ভয়ে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে পরিবারের ভেতর। কোথাও প্রভাবশালীর ক্ষমতা জাহির হচ্ছে। পথ-বাস-বাসা, দোকান, শিক্ষাঙ্গন, অফিস-আদালত কোথাও কি নারীর নিশ্চিত নিরাপত্তা আছে? সমাজ এ কোন অসামাজিক পথে হাঁটছে? মনের কাছে মন সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে, এক কলস দুধের মধ্যে এক ফোঁটা গো-চোনা পড়ার মতো।

হাতেগোনা মানুষের কাছে সমাজ জিম্মি হতে পারে না। কেন আমার কন্যা মা ছাড়া স্কুলে যেতে পারবে না? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বোন রাতের আঁধার নামলেই পথে সম্ভ্রম হারাবে? কেন আমার পড়শি বাসে উঠে নিরাপদবোধ করবে না? অনেক কেনই আজ আহত করছে আমার মতো সাধারণ মানুষের চিত্ত। আমরা আর কোনো কেনর জন্ম হতে দেব না। হ্যাঁ আমরাই পারি সব কেন মুছে দিতে। আমরাই পারি। অবশ্যই আমরা পারি।

শিক্ষিত, অশিক্ষিত, প্রতিবন্ধী, শিশু, বৃদ্ধাÑ এরাই তো মা, দাদি, বোন কিংবা আমাদের কন্যা। ছয় মাস কিংবা এক বছরে কত মা-বোন-কন্যা নিগৃহীত হয়েছে সে তথ্য-উপাত্ত আমি দেব না। শুধু বলব, বড় হওয়ার পথে একটা জাতির জন্য এটা কলঙ্কের, চলতি পথের বাধা।

তুষার কান্তি সরকার : সম্পাদক, প্রকৃতিবার্তা

advertisement
Evall
advertisement