advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

দিনে দিনমজুর রাতে ডাকাত

চক্রের চার সদস্য গ্রেপ্তার, শনাক্ত শতাধিক

আহমদুল হাসান আসিক
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১০:১৬
advertisement

তাদের টার্গেট নদী-তীরবর্তী বাজারের জুয়েলারি দোকানে লুট। বাহন দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট বড় স্পিডবোট। দলের সদস্যসংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ জন। সঙ্গে থাকে হাতবোমা, আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র। রাত গভীর হলে তারা টার্গেট করা বাজারে প্রবেশ করে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয় দিয়ে অস্ত্রের মুখে তারা বাজারের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের বেঁধে ফেলে।

এ সময় টহল পুলিশ বাধা হলে তাদেরও একইভাবে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বেঁধে ফেলা হয়। এর পর জুয়েলারির যত দোকান আছে, সেসব দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নেয়। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে পুরো কাজ শেষ করে যাওয়ার আগে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং স্পিডবোটে উঠে দ্রুত সরে যায়। সংঘবদ্ধ এ চক্রটি ডাকাতির প্রস্তুতি নেয় এক জেলায়, আর ডাকাতি করে অন্য জেলায়। ডাকাতির আগে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার দূরে নিজেদের মোবাইল ফোনগুলো বস্তাবন্দি করে রেখে আসে। আগেই সংশ্লিষ্ট বাজার ও জুয়েলারি দোকানগুলো রেকি করে থাকে ডাকাত দল। এ দলের অধিকাংশ সদস্য দিনে দিনমজুরের কাজ করে আর রাত হলে হয়ে যায় ডাকাত।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত এমন অভিনব কায়দায় দেশের বিভিন্ন জেলার নদী-তীরবর্তী বাজারের জুয়েলারি দোকানে অন্তত ১২টি দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পাঁচটি ঘটনার তদন্ত করছে সিআইডি। গত ২২ জানুয়ারি চাঁদপুরের মতলবের কালিরবাজার এবং কালিপুর বাজারে ১১টি স্বর্ণের দোকানে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর এ তথ্য পেয়েছে সিআইডি। তাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি স্পিডবোটে ডাকাতির মাস্টারমাইন্ডকেও শনাক্ত করেছে সিআইডি।

ডাকাত দল প্রায় ৪২ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মালামাল লুট করে। গত ৩ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন-সবুজ, তার স্ত্রী আঁখি বেগম, মজনু ও দানেশ। ডাকাতিতে ব্যবহৃত দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট স্পিডবোটটিও জব্দ করা হয়েছে। শনাক্ত করা হয়েছে ৬-৭টি গ্রুপের শতাধিক সদস্য।

সিআইডির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ডাকাতি বন্ধে সব জেলা পুলিশকে ওই জেলার স্পিডবোটের মালিকদের নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি নদী-তীরবর্তী এলাকার বাজারগুলোতে এলাকাভিত্তিক ডিফেন্স পার্টি গঠন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের তরফে। সম্প্রতি স্পিডবোটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জেলা পুলিশের পাশাপাশি সিআইডিকে বলা হয়, এসব ঘটনার তদন্ত করতে।

সিআইডি বলছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজীপুরের শ্রীপুর, একই জেলার কালীগঞ্জের উলুখোলা, বরিশালের বাকেরগঞ্জ, মুলাদী ও চাঁদপুরের মতলবের কালিরবাজার ও কালিপুরে একই কায়দায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার তদন্ত করছে সিআইডি। এগুলোর বাইরে নরসিংদীর পলাশ, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে একই কায়দায় একের পর এক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওই মামলাগুলোও তদন্ত করছে জেলা পুলিশ।

সিআইডি জানায়, মতলবের ডাকাতির মাস্টারমাইন্ড শরীয়তপুরের জাজিরার দুই ব্যক্তি। তারা সম্পর্কে আপন ভাই। ওই স্পিডবোটের মালিকও তারা। স্পিডবোটটির কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই। এটি তারা অন্য ডাকাত দলকে ভাড়া দিত। ডাকাত দলের সর্দার ওই মাস্টারমাইন্ডের ৭০টি মোবাইল সিম রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। ডাকাতির দুটি ঘটনাস্থলই মেঘনা নদীর তীরে। ঘটনাস্থলের পাশের নদীতে কয়েক কিলোমিটার পেরোলেই মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার সীমানা। যেসব নদী একাধিক জেলার সীমানা নির্ধারণ করেছে ডাকাত দল ওই নদীর তীরের বাজারগুলোকে ডাকাতির জন্য বাছাই করে পাশের জেলাতে ডাকাতির প্রস্তুতি নেয়। সেখানেই তারা সব সদস্যের মোবাইল ফোন বন্ধ করে বস্তায় পুরে রেখে আসে।

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, স্পিডবোটে জুয়েলারি দোকানের স্বর্ণালঙ্কার লুটপাটে ৬-৭টি গ্রুপ সক্রিয়। একটি গ্রুপের সঙ্গে অন্যটির যোগাযোগও রয়েছে। যে এলাকায় ডাকাতির পরিকল্পনা করা হয়, অধিকাংশ সদস্যকে সংগ্রহ করা হয় ওই এলাকার আশপাশ থেকে। ডাকাত দলের প্রধানকে অধিকাংশ সদস্যই চেনে না। সদস্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিই ডাকাতির পর তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা মালামাল বুঝিয়ে দেয়। ডাকাত দলের অনেক সদস্য দিনের বেলায় সাধারণ শ্রমিক হিসেবে মাঠে কিংবা ড্রেজার মেশিনে মাটি কাটার কাজ করে।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. রাজীব ফরহান আমাদের সময়কে বলেন, স্পিডবোটে এসে নদীর তীরবর্তী বাজারে ডাকাতির ঘটনায় দেখা গেছে তাদের মূল টার্গেট স্বর্ণালঙ্কার। অল্প সময়ের মধ্যে পালিয়ে যেতে তারা স্পিডবোট ব্যবহার করে। এ চক্রের বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। আশা করছি খুব শিগগিরই তারা ধরা পড়বে।
ডাকাতি বন্ধে পুলিশের সুপারিশ ডাকাতি বন্ধে পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। নতুন নতুন ডাকাত দল চিহ্নিত করতে জেলা পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআইকে আলাদা তালিকা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরে সমন্বয় সভার মাধ্যমে এসব তালিকা যাচাই করা যেতে পারে।

চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার পুলিশ সুপার সমন্বয় সভা করে প্রতিটি জেলায় আলাদা টিম গঠন করে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। নৌ-পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা যেতে পারে। পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক ডিফেন্স পার্টি গঠন করে বল্লম, লাঠি ও টর্চলাইট নিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করা এবং বড় বাজারগুলোতে বেতনভুক্ত পাহারাদার নিয়োগ করার সুপারিশও করা হয়েছে ওই ইউনিটের তরফে।

advertisement