advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সারাদেশেই গদখালীর ফুলের সৌরভ

উত্তম ঘোষ যশোর
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ২৩:৩৯
advertisement

আজ ১৪ ফেব্রæয়ারি। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তবে কাকতালীয়ভাবে চলতি বছর একই দিনে পহেলা ফাগুন হওয়ায় বসন্তবরণ উৎসব উদযাপন করবে বাঙালি। উভয় উপলক্ষকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন দেশব্যাপী বহুগুণে বেড়েছে ফুলের চাহিদা। বৃহস্পতিবার শেষ মাঘের দুপুর গড়িয়ে বিকাল নামতেই ফুলের খোঁজখবর নিতে ছুটে যাওয়া হয় দেশের ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ‘গদখালী’ গ্রামে। যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের গদখালী ফুলহাট থেকে দক্ষিণ দিকের ছোট্ট পিচঢালা রাস্তায় এগিয়ে যেতেই দুধারে যতদূর চোখ যায় শুধু হরেক রঙের ফুল আর ফুল। আবহমান বাংলার অপরূপ সাজের হাতছানি চারদিকে। কোনটা লাল কোনটা গাড় লাল, কমলা, হলুদ ফুলের সমারোহে প্রকৃতি সেজেছে মনের মতো করে।

স্থানীয়রা এ প্রতিবেদককে জানালেন, গদখালীসহ আশপাশের এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে গোলাপ, জারবেরা, গøাডিওলাস, রজনীগন্ধা, হলুদ গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকাসহ সব জাতের ও রঙের মাঠভরা ফুলের চাষ হয়েছে। কয়েকমাস আগে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতের ক্ষতি না কাটতেই স¤প্রতি গোলাপের ‘কুঁড়ি’ পচা ভাইরাসে চাষিদের বড় অঙ্কের লোকসানের শঙ্কা দেখা দেয়। তবে ফুলের দাম কয়েকগুণ বাড়ায় লোকসান কাটিয়ে এখন লাভের হিসাব কষছেন চাষিরা।

গত কয়েকদিন ধরেই বসন্তবরণ অনুষ্ঠান, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও একুশে ফেব্রæয়ারিকে কেন্দ্র করে চাহিদা মোতাবেক ফুলের জোগান দিতে পরিচর্যায় ব্যস্ত চাষিরা। মূলত আসন্ন ফুলের সরবরাহ ও দামের ওপর নির্ভর করছে চাষিদের অর্থনৈতিক ভাগ্য। চাষিরা সারা বছর ধরে এ মৌসুমকেই টার্গেট করে ফুল চাষ করেন।

ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী এলাকার নারী ফুলচাষি সাজেদা বেগম বলেন, চলতি মৌসুমে তিনি এক বিঘা জমিতে গাঁদা, এক বিঘা জারবেরা ও ত্রিশ শতাংশ গøাডিওলাস ফুলের চাষ করেছেন। আসন্ন বিভিন্ন দিবসে তার জমি থেকে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ফুল বিক্রির আশা করছেন।

ফুল চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফুল চাষাবাদ খুবই লাভজনক। প্রতিবছরের মতো ফেব্রæয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই ফুলের চাহিদা ব্যাপক বাড়ে। সারাদেশের মধ্যে যশোর জেলার ফুলের গুণগত মান ভালো থাকায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে ভালো মানের গোলাপ প্রতি পিস ১৭-১৮, প্রতি পিস গøাডিওলাস কালার ভেদে ৬ থেকে ১২, জারবেরা প্রতি পিস ৬ থেকে ১২, রজনীগন্ধার প্রতি স্টিক ৪ এবং প্রতি হাজার গাঁদা ফুল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সরেজমিন এলাকা ঘুরে জানা যায়, যেসব কৃষক গত ১০ বছর আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে দুমুঠো ভাত পর্যন্ত জোগাড় করতে হিমশিম খেয়েছেন ফুল চাষের মাধ্যমে তারা সাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। প্রত্যেকেই পাকা বাড়ি করেছেন। ঘুচে গেছে সংসারের অভাব-অনটন।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, বাংলাদেশে ফুলের চাহিদা অনুযায়ী কমপক্ষে ৭০ শতাংশ ফুল যশোরের গদখালী থেকে সরবরাহ হয়ে থাকে। ১৪ ফেব্রæয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও বসন্তবরণ উৎসবে অন্তত ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার ফুল বেচাকেনা হয়েছে। এ ছাড়া ২১ ফেব্রæয়ারি মহান ভাষা দিবসে এ অঞ্চলের ফুলচাষিরা কমপক্ষে ২০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির টার্গেট করেছে।

ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, চলতি মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই গোলাপ ফুলের কুঁড়ি পচা ভাইরাসের আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে চাষিদের।

যশোর জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলার আট উপজেলায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হয়। তার মধ্যে শুধু ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী-পানিসারায় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কৃষক ৬ হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ করছেন। সারাবছর ফুল উৎপাদন করলেও বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস ও ২১ ফেব্রæয়ারি এ তিন দিবসই মূল লক্ষ্য থাকে চাষিদের।

স্থানীয় কৃষকদের একমাত্র পেশা ফুল চাষ : ১৯৯৫ সালের আগে এ অঞ্চলের যে কৃষকরা ধান কিংবা সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেছে, এখন তারা পুরোপুরিই ফুলচাষের ওপর নির্ভরশীল। অন্য ফসলের তুলনায় ফুলচাষ লাভজনক হওয়ায় গদখালীসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে অন্য কোনো ফসল চাষ হচ্ছে না। স্থানীয় চাষিদের উৎপাদিত ফুল বিক্রির জন্য যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী নামক স্থানে গড়ে উঠেছে বিশাল একটি ফুলের হাট। এ হাটে প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের বেচাকেনা জমে ওঠে। বেলা ১০টা পর্যন্ত চলে ফুল বেচাকেনা।

ফসলের তুলনায় অধিক লাভজনক ফুলচাষ : স্থানীয় ফুলচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্য যে কোনো ধরনের ফসলের তুলনায় ফুলচাষ অধিক লাভজনক। স্থানীয় পুটপাড়া গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে গোলাপ কিংব গøাডিওলাস ফুলের চাষ করতে খরচ হয় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। এর পর চারাগাছে একবার ফুল ধরলে তা কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ বছর ফুল দেয়। এতে বছরে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা আয় আসে।

১৯৮৩ সালে স্থানীয় হাতেগোনা কয়েকজন কৃষক ফুল চাষ শুরু করলে তাদের সাফল্য দেখে অনেকেই ফুল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। একপর্যায়ে ১৯৯৫ সাল থেকে অধিকাংশ কৃষক ফুল চাষ শুরু করেন। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার কৃষক আয়ের উৎস হিসেবে ফুল চাষকে বেছে নিয়েছেন।

advertisement