advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাসন্তী ভালোবাসায় মাতোয়ারা দেশ

মেহেদী হাসান
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:২৩
advertisement

‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে/মধুর মলয়-সমীরে মধুর মিলন রটাতে’Ñ হ্যাঁ, শুধু চারুকলা প্রাঙ্গণই নয়, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসই নয়; অমর একুশে গ্রন্থমেলাই শুধু নয়, পুরো রাজধানীজুড়ে গতকাল উৎসবমুখর মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তাদের বেশ-ভূষা, চলন-বলন সবকিছুতেই ছিল একটি বার্তাÑ মধুর বসন্ত এসেছে। এবং মধুর মিলন ঘটাতেই যে এসেছে, তাও সত্যি। এ জন্যই এবার বসন্ত বরণের দিন এলো ভালোবাসার দিনও। রাজধানী ছাড়িয়ে গতকাল তাই উৎসবে মেতেছিল পুরো বাংলাদেশ।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা রাজধানীর বাসন্তি ভালোবাসাকে দিয়েছিল এক অনবদ্য রূপ। বইমেলার পরতে পরতে ঋতুরাজ বসন্ত আর ভালোবাসা দিবসের ছোঁয়া। ভালোবাসা আর বসন্তের রঙের মুগ্ধতায় বইমেলা মাতোয়ারা রেখেছিলেন বইপ্রেমীরা। কেবল রাজধানীই নয়, সারাদেশেই যেন ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যরকম এক উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশাপাশি তারুণ্যের অদম্য উৎসব ছিল দেশের সবকটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে। বসন্তের

আগমনী দিন আর ভালোবাসা দিবসে লাল-নীল, কেউবা হিমু সেজে হলুদ পাঞ্জাবি পরেই প্রিয়জনের সান্নিধ্যে পার করেছে সময়। শার্ট কিংবা টি-শার্টের চেয়ে পাঞ্জাবিতে বেশি রঙিন হয়েছে ভালবাসার মানুষেরা। তরুণীরা এসেছিলেন হলদেসহ নানা রঙের শাড়ি পড়ে। কপালে টিপ, মাথায় খোঁপা, অনেকে কানে গুঁজে দিয়েছেন গোলাপ। সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যেন এক রঙিন উৎসবে মেতে উঠেছিল গতকাল সকাল থেকেই। প্রত্যয়ের প্রকাশে ফুল বিনিময় আর হাতে হাত রেখে চলতে চলতে পথও যেন গান ধরছিল। বিকেল গড়াতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা, মলচত্বর, সবুজ চত্বর, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ এলাকা, হাকিম চত্বর, টিএসসি, কার্জন হল সর্বত্র উৎসব-আড্ডার আমেজ বিরাজ করে।

ক্যাম্পাস ঘিরে ছিল প্রেমিকার লাল রঙের শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে হাত ভর্তি লাল চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ। সেই রিনিঝিনি ছন্দ যেন আন্দোলিত করছে লাল অথবা সফেদ পাঞ্জাবি পরা প্রেমিক হৃদয়। প্রেমের গল্প-আড্ডায় চলেছে সেলফির তুবড়িও।

দিবসটি উপলক্ষে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন চত্বরের সামনে ফুল বিক্রি করতে দেখা গেল অতিউৎসাহী কিছু শিক্ষার্থীকেও; ফুল বিক্রির মাধ্যমে যেন ভালোবাসাই ছড়াতে চান।

বসন্ত বরণের জন্য ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে(ঢাবি) দিনভর চলে উৎসব। বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলা, কলাভবনস্থ বটতলা, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি), কার্জন হলসহ পুরো ক্যাম্পাস, বাংলা একাডেমির বইমেলা মিলিয়ে সমগ্র এলাকায়ই তারুণ্যের জোয়ার যেন উপচে পড়ে। বসন্তের এ উৎসব উপভোগ করতে এসেছেন বিদেশিরাও। বাংলা একাডেমির বইমেলা প্রাঙ্গণ ফুল ও হলুদ রঙের পোশাকের আভায় বাসন্তী রং ধারণ করে।

কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, ভালোবাসা দিবসে উৎসবের আমেজে মজেছিলো রাজধানীর সর্বত্র। রবীন্দ্র সরোবরে ছিলো নানা আয়োজন। বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরায় ছিলো ভালোবাসা দিবসের বিশেষ আয়োজন। রাজধানীর বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে প্রেমিক যুগল ছাড়াও পরিবারের সদস্যদের নিয়েও ঘুরতে এসেছেছিলেন অনেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় ‘এসো মিলি প্রাণের উৎসবে’ শ্লোগানে অনুষ্ঠিত হয় এবারের বসন্ত উৎসব। জাতীয় বসন্তবরণ উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় বসন্তের এ অনুষ্ঠান। সকালে বসন্ত-বন্দনার মাধ্যমে শুরু হয় উৎসব। নাচ, গান এবং রবীন্দ্র্রনাথ নজরুলের লেখা গান ও কবিতা এ অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।

উৎসব উদ্যাপন সম্পর্কে বিশ^বিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী তাহিয়া তাহরিম বলেন, ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো উদযাপন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই উৎসবগুলোই সব ধর্মের মানুষের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িকতা থেকে আমাদের দূরে রাখতে ভূমিকা পালন করে। আজ খুব ভালো লাগছে। আমরা বন্ধরা মিলে একসাথে আনন্দ করছি। সকাল থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি।

এদিকে ভালোবাসা দিবসে ঢাবিতে প্লাস্টিক বর্জ্য মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার শপথ নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের নেচার কনজারভেশন ক্লাব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের আয়োজনে ‘প্লাস্টিক বর্জ্য মুক্ত ভালোবাসার ক্যাম্পাস ২০২০’ শীর্ষক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, পরিবেশ দূষণের অন্যতম নতুন উপাদান প্লাস্টিক। অবিলম্বে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধের বিকল্প নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো. আকতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. ইমদাদুল হক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহাম্মদ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হুমায়ুন রেজা খান প্রমুখ। প্লাস্টিক বর্জ্য মুক্ত ভালোবাসার ক্যাম্পাস ২০২০’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করে শপথ গ্রহণ’ করেন। পরবর্তীতে পরিবেশমন্ত্রী ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন।

এদিকে বসন্ত ও ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্যে কেবল রাজধানীই নয় দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও ছিলো নানা আয়োজন।

প্রতিবছরের ন্যায় ধারাবাহিকতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) বাংলা বিভাগের উদ্যোগে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বসন্তবরণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে সকাল ৯টায় কবি জীবনানন্দ দাশ একাডেমিক ভবনের সামনে থেকে বসন্তকে স্বাগত জানিয়ে কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন ও বাংলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. শেখ মো. রজিকুল ইসলামের নেতৃত্বে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর আয়োজন করা হয় বসন্তবরণে প্রভাতী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

সারা দেশের ন্যায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাসে এ চিত্র অনেকটা ভিন্ন। বৃদ্ধাশ্রমে থাকা সুবিধাবঞ্চিত কিছু মায়েদের সাথে নিয়ে এবারের বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবস উদযাপন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন একদল শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের মফিজ লেকে এসব অসহায় মায়েদের নিয়ে দিনব্যাপী সমাজ সচেতনতা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তারা। অনুষ্ঠানে বৃদ্ধ মায়েদের মাঝে নতুন কাপড় বিতরণ, ক্যাম্পাস পরিদর্শন ও দুপুরে খাবারের আয়োজন করা হয়।

advertisement
Evaly
advertisement