advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিরোধীদের ঐক্যেই নাছির বাদ

হামিদ উল্লাহ চট্টগ্রাম
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১২:১৯
আ জ ম নাছির উদ্দীন। ছবি : সংগৃহীত
advertisement

শুরুতে আলোচনায় ছিলেন না; তবু শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে রেজাউল করিম চৌধুরী হয়ে ওঠেন আ জ ম নাছিরবিরোধীদের একমাত্র প্রার্থী। শুরু থেকে শীর্ষে থাকা আ জ ম নাছির উদ্দীন দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমর্থন থাকলেও স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্যদের তীব্র বিরোধিতায় দ্বিতীয়বার দলীয় মনোনয়ন হারান। এ নিয়ে বন্দরনগরীর রাজনৈতিক আলোচনা এখন সরব।

গত শনিবার রাতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির সভায় চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নপত্র নেওয়া ১৯ জনের মধ্যে শেষ মুহূর্তে তিনজনের জোরালো অবস্থান ছিল। এর মধ্যে শীর্ষে ছিলেন বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এর পরের অবস্থানে ছিলেন যথাক্রমে খোরশেদ আলম সুজন ও রেজাউল করিম চৌধুরী। আ জ ম নাছির উদ্দীনের

মনোনয়নের ব্যাপারে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন একটা বিরোধিতা ছিল না। তবে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংসদ সদস্যরা ছিলেন তীব্র বিরোধী। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সংসদ সদস্য এমএ লতিফ, শামসুল হক চৌধুরীসহ কয়েকজন সংসদ সদস্য নানাভাবে নাছিরের বিরোধিতা করেন। ফলে অপর দুজনের মধ্যে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা মেয়রপ্রার্থী হিসেবে রেজাউল করিম চৌধুরীকে বেছে নিলে সবাই সে সিদ্ধান্ত মেনে নেন। সভাসূত্রে জানা যায়, শেষ মুহূর্তে আ জ ম নাছিরকে ঠেকাতে একপর্যায়ে চট্টগ্রামের সব নেতারই প্রার্থী বনে যান রেজাউল করিম চৌধুরী।

রেজাউল করিম চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, মেয়র পদে ১৯ জন দলীয় মনোনয়নপত্র নেন। তারা সবাই আমাদের দলের উপযুক্ত নেতা। আমরা সবাই একযোগে বলেছি, নেত্রীর সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নেব। তিনি আমাকে বেছে নিয়েছেন। আমি দীর্ঘদিন রাজনীতির সাথে জড়িত। নেত্রী আমাকে মূল্যায়ন করেছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা। এর আগে তিনি বিভিন্ন সময় যুবলীগের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রামের অবিভক্ত সাংগঠনিক জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক, সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে আসীন ছিলেন। একসময় তিনি নগর আওয়ামী লীগের বিভক্ত রাজনীতিতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নুরুল ইসলাম বিএসসি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে রেজাউল করিম চৌধুরী তার সঙ্গে সখ্য গড়েন। তবে শেষদিকে তিনি নগর আওয়ামী লীগের বিভক্ত পক্ষগুলো থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই রাজনীতি করেন। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী কিংবা আ জ ম নাছির উদ্দীনের মতো বিশাল কর্মীবাহিনী তাঁর নেই। তবে চকবাজার ও বহদ্দারহাটকেন্দ্রিক কিছু সক্রিয় অনুসারী ও দলীয় নেতাকর্মী তার রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে কিছু পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা আছে।

মেয়র পদে ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড কী হবে জানতে চাইলে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন নগরীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি করেছেন। যদি জনগণ আমাকে বিজয়ী করে, তবে আমিও চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করব। একজন মেয়র হিসেবে নগরীর যানজট নিরসন, স্বাস্থ্য-শিক্ষার উন্নয়ন, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার কাজ করার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নগরীর একটি প্রধান সমস্যা। এ সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দিয়েছেন। এটি বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে। আমি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সঙ্গে সমন্বয় করে এসব কাজ করব।

নিজেকে সব মানুষের মেয়র হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছার কথা জানিয়ে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আমার সঙ্গে কারও রাজনৈতিক বিরোধ নেই।

রেজাউল করিম চৌধুরীর অনুসারী বলে পরিচিত যুবলীগ নেতা মীর্জা কামরুল হাসান আলমাস বলেন, চট্টগ্রামে আওয়ামী রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষের সঙ্গেই রেজাউল করিম চৌধুরীর সুসম্পর্ক রয়েছে। পরিচ্ছন্ন ইমেজের সদা হাস্যোজ্জ্বল নেতা রেজাউল ভাই সব মানুষের মেয়র হবেন বলে আশা করি।

যে কারণে বাদ নাছির

গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম শহরকে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহসহ বেশকিছু সৃষ্টিশীল কাজে হাত দেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। সবুজে সাজবে চট্টগ্রামÑ এই সেøাগানে নগরীর বেশিরভাগ ওয়ার্ডের সবুজায়ন করেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে নগরীর সড়ক, ফুটপাত ও ভবনের ওপর থেকে বিলবোর্ড উচ্ছেদ করে প্রাচ্যের রানিখ্যাত চট্টগ্রামের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। নগরীতে ব্যাপকভাবে আলোকায়নের কাজও করেন।

একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, মূলত চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের রাজনীতির যে বিভাজন তা কমাতে পারেননি আ জ ম নাছির উদ্দীন। উল্টো নতুন করে অনেক শীর্ষ নেতার সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীদের সঙ্গে তাঁর পুরনো বিরোধ নিত্য নতুন মাত্রা পায়।

সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে আ জ ম নাছিরের সর্বশেষ বিরোধ তাঁর মনোনয়ন না পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কাজ করে বলে মনে করেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতারা। জানা যায়, গত শনিবার ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সরাসরি আ জ ম নাছিরের বিরোধিতা করেন। এ প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ বলেন, আ জ ম নাছির সর্বজনগ্রহণযোগ্য মেয়র হতে পারেননি। তাই নেত্রী অন্য কাউকে বেছে নিয়েছেন। আমার মনে হয় নেত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।

এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসাবাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সংসদ সদস্য এম এ লতিফ ও শামসুল হক চৌধুরীর সঙ্গেও বিরোধ তৈরি হয় আ জ ম নাছিরের। অথচ একসময় তিনজনই ছিলেন ঘনিষ্ঠ।

একাধিক নেতা বলেন, গত পাঁচ বছরে আ জ ম নাছির উদ্দীন সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজের মাধ্যমে নগরীর নালা নর্দমা তৈরি করে দ্রুত পানি সরে যাওয়ার কাজ করেছেন। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজটি তিনি করতে পারেননি। এর বাইরে নগরীর পোর্ট কানেকটিং রোড সংস্কারসহ কয়েকটি কাজে অহেতুক দেরি হয়।

এর বাইরেও কিছু বিতর্কিত নেতা আ জ ম নাছিরের বিরুদ্ধে ভিড়ে যাওয়াও দ্বিতীয়বার মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করেছে বলে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা মনে করেন। বিশেষ করে নগর ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডে নাম আসা লালখানবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরী হত্যার সঙ্গে জড়িতরা আ জ ম নাছিরের অনুসারী বলে প্রতিষ্ঠা পায়। তিনি এ বিষয়গুলোর সুরাহা করতে পারেননি।

তবে আ জ ম নাছির উদ্দীন এসব অভিযোগের জবাবে বলেন, মাঠে যখন রাজনীতি করি, তখন অনেকেই আমার অনেক কাজ অপছন্দ করবে। নানাভাবে সমালোচনার চেষ্টা করবে। কারও স্বার্থে আঘাত এলেই সমালোচনা করে। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বাস্তবায়ন করছে। কাজেই জলাবদ্ধতা নিরসনে সফলতা-ব্যর্থতার ভার আমার ওপর দেওয়া ঠিক নয়। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করেছেন। এর পর মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছেন। এবার দেননি। আমি নেত্রীর সব সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিয়েছি। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে নতুন মেয়রপ্রার্থী ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জয়ী করতে কাজ করা।

 

 

advertisement
Evall
advertisement