advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আমাদের সময়কে বিএসএফআইসির বিদায়ী চেয়ারম্যান

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০১:৩৮
আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০১:৩৮
advertisement

বছরের পর কর্মচারীদের বেতন অনিয়মিত, আখচাষিদের পাওনা পরিশোধ না করা, বিকল মেশিনারি, দুর্নীতি আর অনিয়ম, ঋণখেলাপির অপবাদ থাকলেও এ শিল্পকে দুই বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান অজিত কুমার পাল। চিনিশিল্পের বর্তমান সংকট ও উত্তরণের বিষয়ে আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ কাফি
আমাদের সময় : চিনিশিল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলুন।
অজিত কুমার পাল : চিনিশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ৫ কোটি মানুষ জড়িত। সরাসরি জড়িত ১৮ হাজার। দেশে বর্তমানে ১৫টি চিনিকল রয়েছে। এসব চিনিকলের অনেকগুলোই তৈরি হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। পুরনো মেশিন দিয়ে চাহিদামতো উৎপাদন হয় না। কোনোরকম ধুঁকে ধুঁকে জোড়াতালি দিয়ে চলছে। মেরামত করা সম্ভব হয় না অর্থ সংকটের কারণে। ব্যয় কমানোর জন্য শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। ফলে দক্ষ শ্রমিক মেলে না। এভাবেও ব্যয় বাড়ে। যিনি অবসরে যাচ্ছেন, তাকে রেখে দিতে হয়, আবার তাকে দিয়ে ওভারটাইম করাতে হয়। তার বেতন অনেক বেশি। শ্রমিক নিয়োগ করা গেলে ব্যয় কমে যাবে। এ কারণে একদিকে টাকাও বেশি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে দক্ষ শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু কিছু টেকনিক্যাল
পদ আছে, যেখানে শ্রমিক তৈরি করতে সময় লাগে। সারাবিশ্বের কারখানায় স্বয়ংক্রিয় মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে তো সেই ব্রিটিশ আমলের এনালগ সিস্টেম। মেশিনের এমন অবস্থা যে, একটা চলে তো আরেকটা চলে না।
আমাদের সময় : আখচাষিদের পাওনা পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে কেন?
অজিত কুমার পাল : চাষিরা সময়মতো টাকা পায় না। ছয় মাস নয় মাস পরে চাষিরা টাকা পায়। এর ফলে চাষিরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। কারণ তারা আখ চাষ না করে এ সময়ে অন্য তিন থেকে চারটি ফসল চাষ করতে পারে। সময়মতো প্রশাসনিক ম্যানেজমেন্ট না থাকায় চিনিকলগুলো ধ্বংসের পথে চলে গেছে।
আমাদের সময় : বেতন-ভাতা পরিশোধে উদ্যোগ কেমন?
অজিত কুমার পাল : কর্মচারীরা সময়মতো বেতন পায়নি। পাঁচ-ছয় মাসও বেতন বকেয়া থাকে। আমি এগুলো ঠিক করার চেষ্টা করেছি। একজন শ্রমিকের সংসার চলে এ বেতনের টাকায়, অথচ তার মাসের পর মাস বেতন বকেয়া। তাদের অন্য কোনো আয়ের উৎস নেই। তাদের আশার আলোই হচ্ছে এ চিনিকল। এ চিনিশিল্পকে ঘিরেই তাদের আশা-আকাক্সক্ষা। চিনিকলগুলো সঠিকভাবে না চলার কারণে চাষি ও কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা এসেছে। তারা মনোযোগ দিয়ে কাজ করে না, অভাবের কারণে তাদের অনেকেরই স্বভাব নষ্ট হয়েছে।
আমাদের সময় : লোকসান হচ্ছে কেন?
অজিত কুমার পাল : বিভিন্ন কারণে দুর্নীতি হয়েছে। সময়মতো আর্থিক ম্যানেজমেন্ট করতে না পারার কারণে চাষি নষ্ট হয়েছে, শ্রমিক নষ্ট হয়েছে, মেশিন নষ্ট হয়েছে, ক্রমাগত লোকসান আর লোকসান হয়েছে। এ লোকসানের বড় একটি কারণ হচ্ছে উৎপাদন খরচ ও বিক্রির মধ্যে বড় গ্যাপ। উৎপাদন খরচ ১০০ টাকা হলে বিক্রি করতে হয় ৫০ টাকায়।
স্বাস্থ্যসম্মত আখের রস দিয়ে একমাত্র বিএসএফআইসি চিনি উৎপাদন করে। এখানে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। জনগণের জন্য এ শিল্প সুশাসনের শিল্প, এ শিল্প সরকারের জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের শিল্প। অথচ এর যথাযথ ব্যবহার করা হয়নি।
আমাদের সময় : সংকট সমাধানে করণীয় কী?
অজিত কুমার পাল : প্রধানমন্ত্রী এই আখের ২৫ শতাংশ টাকা দেওয়ার জন্য অনুমোদন দিয়েছেন। সেই টাকাটাও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করছে না। তা হলে চাষি টাকা পাবেন কোত্থেকে?
অন্যদিকে চিনি বিক্রি হতো না। চিনি ইচ্ছা করলেই বিক্রি করতে পারি না। এ মুহূর্তে বাণিজ্য সচিব, শিল্প সচিব তারা দুজনেই চিনি বিক্রি না করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। সামনে রমজান মাস, চিনি মজুদ রাখতে হবে। সরকারের চিনি মজুদ না থাকলে বেসরকারি খাতে পেঁয়াজকাহিনী হতে পারে। যখন দাম বাড়বে তখন জবাবদিহিতা সবাইকে করতে হবে। বারবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোয় অর্থের জন্য গিয়েছি। বলেছি, শ্রমিকের বেতন দিতে হবে, চাষিদের পাওনা দিতে হবে। সরকারের কাছে তো পাওনা আছে। যেটা এ সংস্থার প্রাপ্য, সেটা তো দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আখের দাম ১৩৬ কোটি টাকা দিলেন। কিন্তু বলা হচ্ছে, সরকারের কাছে এ মুহূর্তে টাকা নেই। ইতিপূর্বে ব্যাংক থেকে যত ঋণ নেওয়া হয়েছে তার কোনো ঋণ শোধ করা যায়নি। যার কারণে ঋণখেলাপির সিল পড়েছে।
আমাদের সময় : ব্যাংক ঋণ পরিশোধে পরিকল্পনা কী?
অজিত কুমার পাল : সরকারি ৪ ব্যাংক প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা পায়। আমি এ আর্থিক দুর্দশার মধ্যেও প্রায় ৫ কোটি টাকা জনতা ব্যাংকে কিস্তির একটা ডাউনপেমেন্ট দিয়ে একটা রিসিডিউল করে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ পাস করিয়েছি। এ টাকা পেলে চাষির প্রাপ্য পরিশোধ করা যাবে।
আমাদের সময় : সমাধানের উপায় কী?
অজিত কুমার পাল : আমরা চেয়েছিলাম ৫০০ কোটি টাকা। সরকার দিয়েছে ১০০ কোটি টাকা। গত বছর চিনি উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৬৯ হাজার টন। এ বছর ১ লাখ টন উৎপাদন হবে। ইতোমধ্যে ৭০ হাজার টন উৎপাদন হয়ে গেছে। উৎপাদনের সক্ষমতা আছে ৩ লাখ টনের। আগের বারের চেয়ে উৎপাদন বেড়েছে, চাষিদের টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে, ব্যাংকঋণ শোধ করা হচ্ছে, শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। এতে তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা এখন কাজে মনোযোগ দিচ্ছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, এখানে দুর্নীতি, চুরি বন্ধ করার।
কর্মচারীদের কাজের ধারায় নিয়ে আসা, চাষিদের দরদি করার পাশাপাশি উৎসবমুখর পরিবেশে কাজের ধারা চালু করেছিলাম। আগে চিনি বিক্রি হতো না, এখন বাজার সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ এখন লাইন ধরে চিনি কিনছে। আমাদের চিনি পেলে অন্য চিনি নেয় না। মানুষের মধ্যে সচেতনতা এসে গেছেÑ বাংলাদেশ চিনি খাদ্য করপোরেশনের চিনি স্বাস্থ্যসম্মত।
আমাদের সময় : লাভজনক হতে হলে কী করতে হবে?
অজিত কুমার পাল : ১২ মাস চিনিকলের চাকা ঘুরলে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়া সম্ভব। এর জন্য দরকার পরিকল্পনামতো মাস্টারপ্ল্যান। আমি পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন প্রয়োজন দক্ষভাবে বাস্তবায়ন করা। গত ছয় মাসে এ শিল্পকে বুঝে ওঠার চেষ্টা করেছি। মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে, এখন এগোনোর পালা, এ সময়ে আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে যারা আসবেন, তারা কিছুটা হলেও সহজে কাজ করতে পারবেন। এখন অর্থায়ন প্রয়োজন। অর্থ পাওয়া গেলে দেশের আদি ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব। অর্থের জোগান পেতে বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। অথবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে হতে পারে।
অনেক দেশই বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের আকৃষ্ট করেছি। রাশিয়া, চীন, জার্মান, জাপান, থাইল্যান্ড, ভারত বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের বিনিয়োগ নিয়ে চিনির পাশাপাশি অন্য পণ্য তৈরি করে ১২ মাস এই চাকা ঘোরালে লোকসানের হাত থেকে লাভে আনা সম্ভব।
আশার দিক হচ্ছে- চিনিশিল্পকে ঘুরে দাঁড় করানোর জন্য সরকার ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই চিনিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সার কেনার টাকা নেই, কিন্তু বাকিতে সার দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বাকিতে ডিজেল দিচ্ছে। কিন্তু ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে গত বছর ও এ বছর ব্যাংকঋণ পাওয়া যায়নি। এর পরও নতুন যিনি আমার দায়িত্বে আসছেন, তিনি বর্তমান ধারাবাহিকতায় এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নেবেন বলে প্রত্যাশা করি। তার জন্য শুভকামনা রইল।
আমাদের সময় এ শিল্প সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মতামত, পরামর্শ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
অজিত কুমার পাল : আমাদের সময়কেও ধন্যবাদ।

advertisement
Evall
advertisement