advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘ভালো জিনিসের দাম একটু চড়াই হয়’

অদ্বৈত মারুত
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ২৩:৫১
advertisement

জনারণ্যে হারাতে হারাতে বন্ধুকে ফিরে পেয়ে তার হাতটি চেপে ধরল গীতা। চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস! বন্ধুকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, ‘হারানোর মধ্যে ব্যাপক একটা শিহরণ আছে, ভয়ও কম না!’ তন্ময় মাথা নাড়াল। উভয়ের মুখ মাস্কে ঢাকা। ‘ওরে বাপরে ধুলা,’ বলে গীতা মাস্কটা ঠিক করে নিল। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে এসেছে। এই প্রথম বাংলাদেশে আসা। ভিড়ের মধ্যে উভয়ই বারবার হারিয়ে যাচ্ছিল বলে বললাম, ‘হাতটা শক্ত

করে ধরে রাখো তন্ময়, নইলে খুঁজে পাবে না।’ ‘জি দাদা,’ বলে ওরা ভিড়ের ভেতর ডুব দিল, যেমন করে ডুব দেয় হাঁস!

ঢোকার মুখেই দেখা হলো, প্রখ্যাত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের

সঙ্গে। রিটন ভাই প্রবাসে থাকেন এখন। বইমেলা উপলক্ষে আসেন। ‘বিদেশে থাকলেও বুকের পুরো অস্তিত্বজুড়ে আমার বাংলাদেশ,’ বলে হাত ধরলেন। বললাম, আপনার একটা ছড়াবই ‘ছোট ছোট ছড়া’ তো শিশু চত্বরের ঝিঙেফুল স্টলে দেখলাম। নতুন আর কোনো বই কি এলো?

‘হ্যাঁ, বেড়ালের গল্প ঝিঙেফুলই প্রকাশ করেছে,’ বললেন।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে শিশু চত্বরের দিকে গেলাম। রিটন ভাই স্টলে ঢুকে বসে পড়লেন।

বইটি হাতে নিয়ে দেখলাম, এটি একটি গল্প বই। তাদের পরিবারের সদস্য কিটো অর্থাৎ কিটক্যাট নিয়ে গল্প। কথায় কথায় রিটন ভাই বললেন, ‘বেড়াল ভালোবাসতেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষরা। চার্চিল, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, আগাথা ক্রিস্টি, ওয়াল্ট ডিজনি, এমনকি রানি ক্লিওপেট্রারও প্রিয় বেড়াল ছিল। বেড়ালপ্রেমীর তালিকায় আছেন জুলেভার্ন। আছেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। আছেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।’

রিটনের সান্নিধ্যে থাকলে এই একটা ব্যাপার ঘটে। এত চমৎকার করে কথা বলেন যে, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি।

বলতে আবার শুরু করলেন, ‘ভাইবো না মিয়া, বেড়াল সবাই ভালোবাসে! বেড়ালবিদ্বেষীর তালিকাও ছোট না। এই ধরো, জগদ্বিখ্যাত মোৎসার্ট, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, দস্তয়ভস্কি, ব্রুনো, হুইটম্যান, সংগীতজ্ঞ জোহান্নাস ব্রামস তো তীর-ধনুক বাগিয়ে জানালায় বসে থাকতেন বেড়ালকে মারবেন বলে। হুইটম্যান বেড়াল দেখলেই হাতের কাছে যা পেতেন, ছুড়ে মারতেন। ব্রুনো ভয় পেতেন বেড়াল। বীর নেপোলিয়ন তো রীতিমতো আর্তচিৎকার করে হুলুস্থূল কাণ্ড বাধাতেন বেড়াল দেখলে! ওই মিয়া, তুমি কি বেড়াল ভালোবাসো?’ বলে আমাকে প্রশ্ন করলেন।

‘জি’ বলায় আনন্দ পেয়ে বললেন, ‘এই বেড়াল নিয়েই আমার একটা গল্পের বই আইলো ঝিঙেফুল থেকে। এই বইটা শিশুদের দারুণ আনন্দ দেবে।’ আমি আমার মেয়ের জন্য একখানা বই নিলে বললেন, ‘জয়িতা’ বানানটা আবার একটু কও তো মিয়া? বললাম। তিনি মেয়েকে আশীর্বাদ করে অটোগ্রাফ দিলেন। বিদায় নিয়ে শিশু চত্বরের স্টলগুলোর দিকে এগোতেই এক শিশু ওর মাকে বলছে, ‘আম্মু, ভূতপুরের ভম্বলটা ইকরিমিকরিতে পাওয়া যাবে। আমি ওটা নিতে চাই।’ মা বললেন, তুমি তো আশিক মুস্তাফার অনেকগুলো বই কিনলে বলে ওটাও কিনে দিলেন। কালান্তর স্টলের সামনে ভীষণ ভিড়। স্টলজুড়ে বইগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শিশু আর অভিভাবকরা চোখ ডুবে বইগুলো দেখছেন। ‘ইউরেকা’ বলে চশমা পরা এক ছেলে লাফিয়ে উঠল। ‘এই বইটা কিনে দাও না বাবা,’ বলে আবদার করল। ছেলেটার আম্মু ‘দেখি’ বলে হাতে নিলেন। এপিঠ-ওপিঠ দেখে ‘বাচ্চাদের বই পাওয়া যাবে নামমাত্র মূল্যে’ বলে বিক্রয়কর্মীকে অনুযোগ করলেন। তাকিয়ে আছি। শিশুটির অনড় অবস্থানের কাছে নতি স্বীকার করলেন মা। কিনে দিতে বাধ্য হলেন। চলে যাওয়ার পর দেখলাম, দাম সাধ্যের মধ্যেই। এক প্রকাশক এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘দেখলেন অবস্থা! কত বেপথে, কুপথে টাকা খরচ করে তারা, অথচ শিশুর জন্য একশ টাকা দিয়ে বই কিনে দিতে কত অনীহা তাদের!’

‘কথা কিন্তু সত্য ভাই,’ বলে আরেক প্রকাশক এগিয়ে এলেন। ‘ভালো জিনিস যে একটু চড়া দামে কিনতে হয়, ওনারা বই কিনতে এলেই তা ভুলে বসে থাকেন,’ বলে বিস্ময় প্রকাশ করতে লাগলেন। কয়েক পাঠক এগিয়ে এলেন, কয়েক লেখক এগিয়ে এলেন একই বিষয়ে কথা বলতে। পাঠকের অভিযোগ দাম বেশি, প্রকাশকের অভিযোগ সব কিছুর দাম বেশি বলে বইয়ের দাম বেশি আর লেখক বেচারা এসবের চাপে পড়ে মুখটা আলুর দম বানিয়ে হাঁ করে আছে!

সবগুলো স্টল, প্যাভিলিয়নের সামনে প্রচণ্ড ভিড়। বেশিরভাগ পাঠকের হাতে বই। একজনকে বলতে শোনা গেল, আজ ভিড় না হলে, বই বিক্রি ভালো না হলে আর কবে হবে! সত্যিই তো, একুশ ফেব্রুয়ারির এক বিস্ময়কর ক্ষমতা আছে। আমরা মাতৃভাষা ফিরে পেয়েছি এবং এরই হাত ধরে স্বাধীনতা পেয়েছি এই বাংলার।

advertisement
Evall
advertisement