advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আতঙ্ক নয়, বাঁচি আনন্দে

নুসরাত জাহান
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৮:২৯ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৮:৩৭
advertisement

মহাসমারোহে দেশ বরণ করে নিলো এবারের ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসকে। পঞ্জিকার রদবদল ও নতুন হিসাব-নিকাশের কারণে এবারই প্রথমবারের মতো দেশে ভালোবাসা ও ফাগুন এলো হাতে হাত ধরে, যদিও এতে উৎসবের আনন্দ তো ম্লান হয়ইনি, বরং একই সময়ে বাঙালির গর্বের ভাষার মাসে মাসব্যাপী চলমান ঐতিহ্যবাহী বইমেলার যুগলবন্দী এ উৎসবকে দিয়েছে এক অনন্য রূপ। চারদিকে উৎসবের এ সমারোহ এখনো বিরাজমান; রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো চলছে ঋতুরাজকে বরণ করে নেওয়ার বিভিন্ন আয়োজন।

এভাবেই বছর জুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ধর্মীয় উৎসবে মেতে থাকে উৎসব প্রিয় বাঙালি জাতি। কিন্তু সুখের অপর পিঠেই যেমন থাকে দুঃখ, প্রকৃতির অংশ হিসেবে আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। আনন্দ যেমন আছে, দৈনন্দিন জীবনে তেমনি আছে মানুষের নানা ধরনের সমস্যা- সেটা ব্যক্তিগত থেকে আর্থ-সামাজিকসহ আরও বহুবিধ। আছে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, যার বেশিরভাগই প্রাণঘাতী; আছে মনুষ্যসৃষ্ট থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক নানা ধরনের দুর্যোগ যা আচমকাই কেড়ে নিয়ে যায় অনেক নিরপরাধ প্রাণ।

আর তাই আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে দৈনন্দিন এ দুঃখ-জরা-ব্যাধি ভুলে থাকার চেষ্টার মধ্যেও মনের গহীনে অবচেতনে থেকে যায় অনিশ্চিত আতঙ্ক। আতঙ্ক ঘর থেকে বের হয়ে আবারও সুস্থভাবে ঘরে ফিরে আসতে না পারার, আতঙ্ক ঘরের মধ্যেই নানা ধরনের দুর্ঘটনার কবলে পড়ার, আতঙ্ক ঝড়-তুফান-বজ্রপাত, ভূমিকম্পের; আতঙ্ক মশা থেকে শুরু করে পশু-পাখি-বাদুড়সহ নানা প্রাণী এমনকি সামুদ্রিক মাছ থেকেও ছড়িয়ে পড়া নাম না জানা, চিকিৎসা না থাকা বিভিন্ন রোগের!

প্রকৃতিও যেন বিরূপ এখন। কারণ, একসময়কার নাতিশীতোষ্ণ এ দেশটিতে শীত মানেই এখন অসহনীয় শৈত্যপ্রবাহ, গরম মানেই দাবদাহ, বর্ষা মানেই দফায় দফায় ঘূর্ণিঝড় আর বজ্রপাতের আতঙ্ক যা এতটাই তীব্র যে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা ছাড়া যার কোনো উপায় নেই। শুধু আমাদের দেশ কেন, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের অবস্থাই এখন সংকটাপন্ন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ চিরহরিৎ বন আমাজনসহ অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের মাইলের পর মাইল এলাকা পুড়ে যাচ্ছে প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে, বিভিন্ন দেশে দেখা দিচ্ছে অসময়ের অস্বাভাবিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তুষারপাত; অ্যান্টার্টিকায় গলতে শুরু করেছে বরফ। বিপদগ্রস্ত পৃথিবীর মানুষ, বিপন্ন প্রাণিকূল। আর এর বিরুদ্ধে লড়তে, বিশ্বকে সচেতন করতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে ১৬ বছরের মেয়েকে! কারণ বিশ্বের অনেক বড় নেতাই জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বাস করেন না, তাদের কাছে এর সম্পূর্ণটাই ‘ধাপ্পাবাজি’! চোখের সামনে এ দুর্যোগ দেখার পরও এ অবস্থান থেকে তাদের এক চুলও নড়ানো যাচ্ছে না। ফি বছর অনুষ্ঠিত হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবায়ু সম্মেলন হয়ে যাচ্ছে ‘লোক দেখানো’ বাগাড়ম্বর মাত্র!

প্রকৃতির পরিবর্তন নিয়ে যেমন দুঃশ্চিন্তা নেই বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের, তেমনি যথাযথ উদ্যোগ নেই বিভিন্ন রোগ ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই তা রোধে কার্যকর উদ্যোগের। যার অতি সাম্প্রতিকতম উদাহরণ করোনার (কোভিড-১৯) মতো প্রাণঘাতী রোগের আক্রমণ! কারণ ভয়াবহ এ রোগটি নিয়ে বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের আগাম সতর্কতা সত্ত্বেও, এমনকি তা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ প্রকাশের পরও নিজেদের ‘ইমেজ’ রক্ষায় রোগটির উৎপত্তিস্থল চীন এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানাতে যে শুধু বিলম্ব করেছে, তা নয়, বরং তারা নেয়নি প্রাথমিক সর্তকতামূলক ব্যবস্থাও যার মাশুল এখন দিতে হচ্ছে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের মানুষকে। ব্যতিক্রম নই আমরাও; কারণ আগাম সতর্কতার পরও ডেঙ্গু ঠেকাতে আমাদের দেশে ছিল না কোনো উদ্যোগ, যার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া আমরা লক্ষ করেছি গত বছর। তাই কোনোরকমে শৈত্যপ্রবাহের ধকল কাটিয়ে উঠে দেশবাসী হাসিমুখে বসন্তকে বরণ করে নিলেও মনের গহীনে আতঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিয়ে; আতঙ্ক আগত গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ, ঘূর্ণিঝড় নিয়ে এবং আবারও কিছুদিন পর থেকে শুরু হতে যাওয়া ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার আক্রমণ নিয়ে!

বিশ্ব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে করোনাভাইরাস নিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের যে উদ্যোগ, তা অবশ্যই নাগরিক মনে কিছুটা হলেও ভরসা দিচ্ছে। তারপরও কিছু নৌ ও স্থলবন্দরে পর্যাপ্ত পরীক্ষণ যন্ত্র ও উপকরণের অভাব, দেশের বাইরে থেকে আসা সব ব্যক্তিকে সমানভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করার মতো বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতির কথা শোনা যাচ্ছে। এর সব হয়তো সত্য নয়; কিছু গুজব যে ছড়াচ্ছে, তাও শোনা যাচ্ছে। আমরা আশা করব, এগুলো যেন গুজবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর শুধু বন্দরগুলোতে তৎপরতা বাড়ালেই হবে না, একইসঙ্গে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়েও। কারণ এরই মধ্যে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত ও নেপালে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আর বলা বাহুল্য যে ভারতের সঙ্গে আমাদের সীমান্ত সব সময়ই খুব অরক্ষিত, যা আরও স্পর্শকাতর রূপ নিয়েছে বর্তমান রোহিঙ্গা ইস্যুতে। অতএব, অবৈধ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা না হলে শুধু বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরে গৃহীত নিরাপত্তা তৎপরতা তেমন একটা কাজে দেবে না। কারণ, বিশ্বে নতুন নতুন ভাইরাসজনিত রোগের প্রার্দুভাব বেড়ে চললেও এবং তা দিনকে দিন মহামারি আকার ধারণ করলেও আমাদের দেশে এ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, এর চিকিৎসা থেকে শুরু করে গবেষণা এমনকি গবেষণাগারের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এর সব ক্ষেত্রেই আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে উন্নত বিশ্বের ওপর। কিন্তু এসব রোগের ব্যাপক বিস্তার ওইসব দেশের গবেষণাগার ও গবেষকসহ এ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের এত ব্যস্ত রাখে যেকোনো রোগ সম্পর্কে জানতে দেশগুলোতে জীবাণুর নমুনা পাঠানো থেকে শুরু করে তার ফলাফল পাওয়া পর্যন্ত আমাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় যা নিঃসন্দেহে আক্রান্ত দেশ ও রোগীর জন্য ভয়াবহ বিপদের বিষয়।

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার তীব্রতার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ জারি করা হয়েছে যার ফলে এখন আমরা উন্নত বিশ্ব থেকে দ্রুততার সঙ্গেই অনেক সাহায্য পাচ্ছি। কিন্তু সবসময় যে পরিস্থিতি একইরকম নয়, তার তীক্ত অভিজ্ঞতা আমরা গত কয়েক বছর বিশেষত গত বছরেই পেয়েছি ডেঙ্গু আর চিকনগুনিয়া পরিস্থিতি মোকাবেলার ক্ষেত্রে। আগাম সাবধানবাণী সত্ত্বেও উপযুক্ত সময়ে যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার নেতিবাচক ফল দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

বছর ঘুরে আবারও চলে আসছে মশাবাহিত ভয়াবহ এ রোগের সময়। আর বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানীর মতে, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি বিশেষত জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনসহ মানুষের জীবনযাপনের ধরনেরও পরিবর্তনের কারণে দিনকে দিন বিশ্ব এ ধরনের ভাইরাসজনিত রোগের কবলে আরও বেশি পড়তে যাচ্ছে। অতএব, করোনাভাইরাস নিয়ে সরকারের যে লক্ষণীয় তৎপরতা, তা যেন সব ক্ষেত্রেই বজায় থাকে; বিশেষত শুধুমাত্র আগাম সতর্কতার অভাব আর সংশ্লিষ্টদের ‘গা-ছাড়া ভাব’-এর কারণে যেভাবে ডেঙ্গু-চিকগুনিয়ার মতো রোগে গত কয়েক বছর নিষ্পাপ, তাজা সব প্রাণ বিনাদোষে আর জীবনটা শুরুর আগেই ঝড়ে গেল, এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার কঠোর ও যথোপযুক্ত উদ্যোগ নেবে বলেই সাধারণ নাগরিক আশা করে।

এক রোগের প্রার্দুভাব শেষ হতে না হতেই আরেক রোগ এসে হানা দেয়ার দুঃশ্চিন্তা; ‘যাক বাবা, এবারের মতো বেঁচে গেলাম’ বলে কোনোরকম হাঁফ ছেড়ে বাঁচা আর সামনে কী হয়- এ দুঃশ্চিন্তায় দম বন্ধ করে প্রতিটা দিন অবিতাহিত করা- এ জুয়া খেলায় জীবনের সব আনন্দ যেন নষ্ট হয়ে না যায়।

আমরা রোগ-শোক, ঝড়-বন্যা, শৈত্যপ্রবাহ-দাবদাহে ভুগে, জমে, পুড়ে মরতে চাই না। ষড়ঋতুর এ দেশে আমরা ১২ মাসজুড়েই উৎসব-আনন্দ করে, প্রকৃতিকে-জীবনকে উপভোগ করে কাটিয়ে দিতে চাই। রোগ-শোক-প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নিয়তি যেন আমাদের এ আনন্দে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়; শক্ত হাতে এসব বিপদকে রুখে দেবার, দমন এমনকি নির্মূলের শক্তি যেন আমরা অর্জন করি- এ সদিচ্ছা যেন আমাদের মধ্যে তৈরি হয়। প্রতিটি মায়ের সন্তান যেন থাকে সব বিপদের ঊর্ধ্বে; ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য যেন আমরা রোগ-শোক-দুর্যোগে বিপর্যস্ত নয় বরং নিরাপদ একটা পৃথিবী রেখে যেতে পারি, এটাই হোক সবার মূলমন্ত্র।

লেখক : নুসরাত জাহান : কলামিস্ট, লেখক ও গবেষক।

advertisement
Evall
advertisement