advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সিন্ডিকেটের বিরাট শুঁড়

ড. কাজল রশীদ শাহীন
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০১:০৭
advertisement

শৈশবে বর্ণমালা শিক্ষার স্মৃতি মনে আছে নিশ্চয়। সেখানে পড়ানো হয়েছে, ‘অ-তে অজগর ঐ আসছে তেড়ে। আ-তে আমটি আমি খাব পেড়ে।’ ছোটবেলায় পড়ার সময়ই আমরা আরও জেনেছি, ‘ঐ-তে ঐরাবতের বিরাট শুঁড়।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘হে অতীত তুমি ভুবনে ভুবনে/কাজ করে যাও গোপনে গোপনে।’ আমরা অতীতকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে না পারলেও নেতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পেরেছি এবং সেটি অব্যাহতও করছি বটে। শুধু ঐরাবতের জায়গায় এখন পড়তে হবে, ‘সিন্ডিকেটের বিরাট শুঁড়।’ ভাগ্যিস, এই দশা রবীন্দ্রনাথকে দেখতে হয়নি। সিন্ডিকেটের এই শুঁড় কতটা বিরাট, তা ওপরতলার বাসিন্দারা বুঝতে অপারগ হলেও ওপরতলার বাইরে যে বৃহৎ সংখ্যক মানুষের বসবাসÑ তারা টের পাচ্ছেন হাড়ে হাড়ে। এই লেখায় সিন্ডিকেট নামক দৈত্যের কাছে আমপাবলিক কতটা অসহায় ও বন্দি হয়ে রয়েছে, সেটি যেমন তালাশের চেষ্টা করা হবেÑ তেমনি এই সিন্ডিকেট রোধ করা যাদের দায়িত্ব, তারা যে ফি বছর একই নাটক মঞ্চস্থ করে চলেছেন, এর পর্যবেক্ষণও হাজির করা হবে।

০১. সিন্ডিকেট কালচার বা সংস্কৃতি অনেক পুরনো। প্রথমে জানতে হবে সিন্ডিকেট কী এবং সিন্ডিকেট কীভাবে কাজ করে। আমরা জানি বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবীর সিন্ডিকেটের কথা। সিন্ডিকেট একত্র হয়ে ভালো কাজ করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে করেও বটে। সিন্ডিকেটের উদ্দেশ্যও ছিল তা-ই। তবে সেটি যে একদা... তা বোধ করি হলফ করেই বলা যায়। বর্তমানের সিন্ডিকেট খুব কমই ন্যায্য ও নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে প্রেসার গ্রুপের ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক কালে এ রকম নজির নেই বললেই চলে, বরং রয়েছে উল্টোটা। সিন্ডিকেট কতটা ভয়ঙ্কর, তা বোঝা যায় রমজান এলে। প্রতিবছর রমজানের একই চিত্র আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি এবং এক ধরনের মনোবেদনা নিয়ে উপভোগও করি বটে।

০২. প্রতিবছর রমজানের আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়, এবার ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে না। মিডিয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব বার্তা ও বয়ানকে সাধারণ মানুষ আমলে নেয় না মোটেই। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তারা দেখেছেন, রমজান এলেই বাণিজ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যেমন-তেমনি, আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের পক্ষ থেকে একই কথা বলা হলেও সুফল মেলেনি। উল্টো তাদের ভেতর এই প্রশ্ন বাসা বেঁধেছে যে, কে বা কারা বেশি শক্তিশালীÑ সরকার, না সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেট নামক দৈত্য কি এতটাই বড় যে, তাদের রোধ করা যায় না?

০৩. রমজান এলেই নিত্যপণ্যের বাজারে রীতিমতো আগুন লেগে যায়। চিনি-ছোলার ক্ষেত্রে যেমন এ কথা সত্যি, তেমনি মসলার বাজারÑ সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ে। এমনকি ওই আগুন থেকে রেহায় পায় না কলা-বেগুনও। সিন্ডিকেট ফি বছর কিছু জিনিসের দাম যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি একেক বছর কয়েকটি পণ্য টার্গেট করে তাদের কৌশল নির্ধারণ করে। এর ভেতরে তারা আবার একটি কিংবা দুটিকে মূল পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। তখন যে পণ্যের মূল্য সবেচেয় বেশি বাড়ে, সেটি থাকে সবার আলোচনায়। এই ফাঁকে তারা অন্যান্য পণ্য থেকেও মোটা অঙ্কের মুনাফা হাতিয়ে নেয়। এ যেন ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।’ এখানে রাজা যদিও নেই, তবুও রয়েছে উলুখাগড়াতুল্য আমাদের মতো আমজনতা।

০৪. লক্ষণীয়, সিন্ডিকেটের উদ্ভাবনী শক্তিও বেশ চমৎকার। প্রতিবছর নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা যদি আমরা দেখি, তা হলে তাদের ওই প্রতিভায় মুগ্ধ হওয়ার মতো যথেষ্ট খোরাক রয়েছে বৈকি। সিন্ডিকেট যেন বর্ণচোরা। কখন কোন বর্ণ নিয়ে তারা ফ্লাডলাইটের সামনে হাজির হবে, তা বলা মুশকিল। এক সময় দেখা যেত, রমজান শুরু হওয়ার কাছাকাছি সময় কিংবা শুরু হওয়ার পরই নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা যেত। এ নিয়ে যখন মনিটরিং শুরু হওয়ার পাশাপাশি নানামুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠত মন্ত্রণালয় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তখন সিন্ডিকেটও রঙ বদলে ফেলত। তারা তখন রমজানের আগেই দাম বাড়িয়ে দিত এবং কয়েক ধাপে তাদের মুনাফা নিশ্চিত করে নিত। এবারের রমজানেও যে ওই নাটকেরই মঞ্চায়ন হবে, তা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আমাদের সময়সহ প্রায় সব পত্রিকায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও অপতৎপরতার পূর্বাভাস হাজির হয়েছে।

০৫. সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী, এর জান্তব উদাহরণ মিলল পেঁয়াজের ক্ষেত্রে। পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যা যা ঘটেছে, সেটির যৌক্তিকতা যতটাÑ এর চেয়ে ঢের বেশি রয়েছে অযৌক্তিকতা। দেশীয় পেঁয়াজের ভর মৌসুমের সিন্ডিকেটের কারণে নিয়ন্ত্রণে আনা গেল না দাম। সারাদেশের কোথাও পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেল না। বাস্তবতা এখন এমনই যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে এখন কিছুই নেই তেমনভাবে। শুধু রয়েছে গালভরা বুলি, প্রতিশ্রুতি ফানুস আর আশ্বাসের রঙিন মুলা। সিন্ডিকেট রয়েছে সিন্ডিকেটের মতোই। সিন্ডিকেট গোপনে গোপনে শুধু নয়, প্রকাশ্যেই হাসিল করে চলেছে তাদের দূরভিসন্ধি।

০৬. প্রশ্ন হলো, নিত্যপণ্যের বাজারে যারা আগুন লাগায়, তারা কারা? তারা ব্যবসায়ী। কেউ কেউ এমন যুক্তি হাজির করেন, ব্যবসায়ীরা কি ব্যবসা করবেন না? আমরা মনে করি, ব্যবসায়ীরা অবশ্যই ব্যবসা করবেন। আর ব্যবসা করতে হলে তাদের মুনাফা অবশ্যই করতে হবে। এখন ওই মুনাফা কতটা করবে, সেটিই হলো প্রশ্ন এবং কতটা ন্যায্য। আমাদের এখানে ব্যবসায়ী সমাজের একটা বড় অংশ শুধু মুনাফা করেই ক্ষান্ত হয় না, তারা অধিক অধিকতর মুনাফার লোভে নীতি-নৈতিকতা ও ন্যায্যতা বিসর্জন দেয়। এরাই নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন দেয়। আর অধিক মুনাফার জন্য এই মন-মানসিকতার ব্যবসায়ীরা গড়ে তোলে সিন্ডিকেট। তারা তখন হয়ে ওঠে দানবতুল্য এবং তারাই নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সবকিছু। আর রাতারাতি অধিক মুনাফার লোভে হেন কাজ নেই তা করতে দ্বিধা করে।

০৭. সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হোক, তা কি রোধ করা যায় না? অবশ্যই যায়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও প্রশাসনের যে রকম দৃঢ়চেতা ভূমিকা পালন করা দরকার, তা তারা অজ্ঞাত কারণে করেন না। কেন তারা ব্যর্থ, এর পেছনে হয়তো যুক্তিও রয়েছে তাদের। অবশ্য যদি ব্যর্থতা স্বীকার না করেন, তা হলে এই প্রসঙ্গের অবতারণা অযৌক্তিক। জবাবদিহির অভাব ও দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে সিন্ডিকেটর দৌরাত্ম্য জগদ্দল পাথরের মতো সাধারণ মানুষের ওপর চেপে যে রয়েছে, তা দিবালোকের মতোই স্পষ্ট।

০৮. ওপেন মার্কেট আর ওপেন ইকোনমির কারণে কি সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে দেওয়া যাচ্ছে না? ব্যবসায়ীরা কোন পণ্যে কতটা মুনাফা করবেন, তাও নির্ধারণ করা সম্ভব নয়Ñ নাকি বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনায় সম্ভব নয়? বাস্তবতা হলো, এর কোনোটি যুক্তিগ্রাহ্য নয়। ওপেন মার্কেট আর ওপেন ইকোনমি তো এখন বিশ্ববাস্তবতা। তা হলে অন্যরা পারলে আমরা কেন নয়? এর কারণ একটাইÑ আমাদের রয়েছে সদিচ্ছার অভাব আর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে বড় রকমের শৈথিল্য ও অনাগ্রহ।

০৯. সিন্ডিকেটকে কেন একেবারে সমূলে উৎপাটন করা যায় না? এই প্রশ্নের উত্তর তালাশে হয়তো গবেষণা হতে পারে। তবে এ রকম কথা চাউর রয়েছে, সিন্ডিকেট-প্রশাসন আর মন্ত্রণালয় আসলে ত্রিভুজ। ফলে উৎপাটন নয়, উল্টো তারা জেঁকে বসেছে সাধারণ মানুষের ওপর। তা না হলে কেন সিন্ডিকেট ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না? কেন উন্মোচিত হয় না সিন্ডিকেট যারা করে, তাদের মুখোশ? তাদের অবস্থান তো খাতুনগঞ্জ থেকে মতিঝিলের মধ্যেই। নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন লাগল কতবার। কিন্তু সিন্ডিকেটে আগুন লাগল না একটিবারের জন্যও। তারা এতটাই ফায়ার প্রুফ যে, আগুন যারা লাগাবেনÑ তারা তাদের কেশরটিও ছুঁতে পারেন না।

১০. আমরা মনে করি, দেশে জনবান্ধব ব্যবসার সংস্কৃতি গড়ে ওঠা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের যেসব সংগঠন রয়েছে, বিশেষ করে নেতৃস্থানীয় সংগঠনগুলো তাদের এটি নিয়ে বিশেষভাবে ভাবার সময় এসেছে। ব্যবসাও যে জনকল্যাণের জন্য, তা তাদের প্রমাণ করতে হবে। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে তাদেরই। এ ক্ষেত্রে তারা প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারে। ব্যবসায়ীসমাজ ভালো করেই জানেÑ কারা সিন্ডিকেট করে, কী তাদের উদ্দেশ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ। রমজান তাদের কাছে এক মাসের ইবাদতের নিয়ামত নিয়ে হয় হাজির। অথচ ওই রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট কারসাজি করে অস্থিরতা ছড়ায়। রমজানের ইবাদত-বন্দেগির সঙ্গে যেসব খাদ্যপণ্য সম্পর্কিত, সেগুলোর দাম বাড়ানো হয়। এর চেয়ে গর্হিত অপরাধ আর কিছু কি হতে পারে?

সিন্ডিকেটের বিরাট শুঁড় একদিনে হয়নি। বিষবৃক্ষ যখন সামান্য একটি বীজ থেকে সময় পেরিয়ে মহীরুহ হয়ে দাঁড়ায়, তখন এর মূলোৎপাটন ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। সিন্ডিকেটের শুঁড় এখন বড় হতে হতে বিরাটকায় হয়ে উঠেছে। এই শুঁড় মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত, বিত্তহীনÑ সবাইকে পেঁচিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত করে তুলেছে। বাজারে গেলে তারা রীতিমতো অগ্নিদাহ টের পান। এ অচলাবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। মুজিববর্ষে সরকার সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার যদি কামিয়াব হয়, তা হলে সেটি হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শতবর্ষ উপলক্ষে দেওয়া অমূল্য এক অর্ঘ্য। শামসুর রাহমানের ‘হাতির শুঁড়’ কবিতার কয়টি পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি সিন্ডিকেটের বাস্তবতায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, ‘ঘুমের খাটে শঙ্খমালা ঘুমন্ত;/কৌটা-খোলা ভোমরা মরে জীবন্ত/ঐরাবতের খেয়াল খুশির ধান্ধায়/ভোরের ফকির মুকুট পরে সন্ধ্যায়/... সেই চালে ভাই মিত্র কি-বা শত্রুর/চলছে সবাইÑ মস্ত সহায় হাতির শুঁড়।’

সিন্ডিকেটের হাতির শুঁড় থেকে মুক্ত হোক বাংলাদেশ।

ড. কাজল রশীদ শাহীন : সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

advertisement
Evaly
advertisement