advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে গড়ে ৫.৩ শতাংশ
বোঝার ওপর শাকের আঁটি

লুৎফর রহমান কাকন
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৯:১৫
প্রতীকী ছবি
advertisement

বাণিজ্যিক, শিল্প আবাসিক- সব পর্যায়ে ফের বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এ নিয়ে গত দশ বছরে সাতবার বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এ সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো সমস্যা সৃষ্টি করবে। কারণ এম্নিতেই গত কয়েক বছর ধরে নিত্যপণ্যের মুল্য ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস দশা। তদুপরি আবার সব খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় এর প্রত্যক্ষ প্রভাব ছাড়াও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে। যা সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে।

এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করে বলছেন, এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। পুরো বিদ্যুৎ খাতে যে অযৌক্তিক ব্যয় হচ্ছে, তা না কমিয়ে সরকার জনগণের ব্যয়ভার বাড়িয়ে দিয়েছে। এ দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে গড়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৬ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ১৩ পয়সা করা হয়েছে। আগামী মাস অর্থাৎ মার্চ থেকে এ দাম কার্যকর হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ বিইআরসি। এ সময় বিইআরসির চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল ছাড়াও কমিশনের অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

এবার পাইকারি, খুচরা উভয় ধরনের বিদ্যুতের দামের সঙ্গে সঞ্চালন মাশুল বৃদ্ধি করা হয়েছে। কমিশনের আদেশে বলা হয়েছে পাইকারি বিদ্যুতের দাম চার টাকা ৭৭ পয়সা থেকে ইউনিট প্রতি আট দশমিক চার ভাগ বাড়িয়ে পাঁচ টাকা ১৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ পাইকারি বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি মূল্য বাড়ছে ৪০ পয়সা। খুচরা বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি দাম বাড়ছে ৩৬ পয়সা। এতে গড়ে গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম ছয় টাকা ৭৭ পয়সা থেকে পাঁচ দশমিক তিন ভাগ বাড়িয়ে ৭ টাকা ১৩ পয়সা নির্ধারণ করেছে। বিদ্যুতের মূল্য হারের সঙ্গে সঞ্চালন ব্যয়ও বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন আদেশে ইউনিট প্রতি সঞ্চালন ব্যয় শূন্য দশমিক ০১৪৭ টাকা বেড়েছে। আগের তুলনায় পাঁচ দশমিক তিন ভাগ সঞ্চালনে ব্যয় বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও পিডিবির উচ্চমূল্যে তেল ক্রয় এবং বসে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার জন্যই এবার মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। দাম বৃদ্ধি সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে কমিশন বলছে, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হওয়াতে পুরাতন কেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে আর তা নবায়ন না করতে সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। যদিও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে নবায়ন করছে না।

বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেছেন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নাই। বিদ্যুৎ খাতে অযৌক্তিক ব্যয় না কমিয়ে সরকার জনগণের ব্যয়ভার বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ভোক্তা যে মানের বিদ্যুৎ পায়, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনরায় মূল্য নির্ধারণ হোক, সেটা আবাসিক বা শিল্প যে ক্ষেত্রেই হোক, এভাবে চেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু কমিশন সেসব বিষয় আমলে না নিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে আগরে ধারাবাহিকতায় গতানুগতিক ঐকিক ক্ষেত্রে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারিত হয়েছে। কোনো পর্যায়ের ভোক্তার জন্যই মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিকতা এ আদেশে প্রতিফলিত হয়নি।

এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বলছে এবার গ্রাহক শ্রেনী বিবেচনায় প্রান্তিক এবং নিন্ম বিত্ত শ্রেনীকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। একই ভাবে শিল্পের ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদেও ব্যয় যাতে খুব বেশি না বৃদ্ধি পায় সে দিকে নজর রাখা হয়েছে।

গৃহস্থালির খুচরা বিদ্যুতের মূল্যহার লাইফ লাইনে (০-৫০ ইউনিট) তিন টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে তিন টাকা ৫৭ পয়সা করা হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে (০-৭৫ ইউনিট) ৪ টাকা থেকে বেড়ে ৪ টাকা ১৯ পয়সা, দ্বিতীয় ধাপে (৭৬-২০০ ইউনিট) ৫ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৭২ পয়সা, তৃতীয় ধাপে (২০১-৩০০ ইউনিট) ৫ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ছয় টাকা, ৪র্থ ধাপে (৩০১-৪০০ ইউনিট) ৬ টাকা ০২ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৩৪ পয়সা, ৫ম ধাপে (৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট) ৯ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৯৪ পয়সা এবং ৬ষ্ঠ ধাপে ৬০০ ইউনিটের উর্দ্ধে ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা করা হয়েছে।

গৃহস্থালির পাশাপাশি দাম বেড়েছে কৃষি সেচ, শিল্প এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও। নতুন দাম অনুযায়ি কৃষিতে ইউনিট প্রতি ১৬ পয়সা দাম বেড়েছে। আগে কৃষি সেচে এক ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৪ টাকা এখন যা হলো চার টাকা ১৯ পয়সা। এর আগে সেচে দাম বাড়ানো না হলেও ২০১৭ সালে সব শেষ দাম বৃদ্ধির সময় তিন টাকা ৮২ পয়সা থেকে দাম বাড়িয়ে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

ক্ষুদ্র শিল্পর জন্য নতুন দাম হচ্ছে ফ্ল্যাট ৮ টাকা ৫৩ পয়সা, অফপিকে ৭ টাকা ৬৮ পয়সা এবং পীক আওয়াওে ১০ টাকা ২৪ পয়সা। নির্মাণে নতুন দাম ইউনিট প্রতি ১২ টাকা ধর্মীয়, শিক্ষা এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দাম হচ্ছে ৬টাকা ০২ পয়সা, রাস্তার বাতিতে ৭টাকা ৭০ পয়সা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ফ্ল্যাট রেইট ইউনিট প্রতি ১০ টাকা ৩০ পয়সা, অফপিকে ৯ টাকা ২৭ পয়সা এবং পীকে ১২ টাকা ৩৬ পয়সা।

ছাড়াও ইলেকট্রিক যানের ব্যটারি চার্জ দিতে পৃথক বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ফ্ল্যাট ৭ টাকা ৬৪ পয়সা, অফ পীক ৬ টাকা ৮৮ পয়সা, সুপার অফ পীক ৬ টাকা ১১ পয়সা এবং পীক ৯ টাকা ৫৫ পয়সা দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দাম বাড়ানোর জন্য কমিশন যেসকল বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে তার মধ্যে আমদানিকৃত কয়লা উপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ধার্য, ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ বৃদ্ধি, অবচয় ব্যয় বৃদ্ধি, তুলনামূলক কম মূল্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসমুহের অধিক পরিমাণ বিদ্যুৎ ক্রয় এবং এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সির অর্থায়নে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিল সেগুলোর সুদ পরিশোধ এবং প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম উপর ১০ পয়সা হারে ডিমান্ড চার্জ আরোপ করা। এইসব বিষয় বিবেচনা করে দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই দাম মার্চ মাস থেকে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী আদেশ না হওয়া পযন্ত এই আদেশ কাযকর থাকবে।

তিনি বলেন আমরা লাইফ লাইন গ্রহক ও নিন্মমধ্যবিত্ত গ্রাহকদের গুরুত্ব দিয়েছি। তাদের বিদ্যুতের দাম খুব একটা বাড়েনি। আমরা স্পষ্টভাবেই আদেশে বলেছি, এখন থেকে আর কোনো তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো যাবে না এবং গ্যাস নেটওয়ার্ক আছে এমন এলাকাগুলোতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা যাবে না। গতবছরের অক্টোবর মাসে পিডিবি ও বিতরণ কোম্পানিগুলো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। তাদের প্রস্তাবে ভিত্তিতে গত ২৮ নবেম্বর থেকে চারদিনব্যাপী গণশুনানী করে কমিশন। দাম বৃদ্ধির সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

advertisement
Evall
advertisement