advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সীমান্তে নতুন নতুন রুট # অনেক বিনিয়োগকারী ধরাছোঁয়ার বাইরে
ছোট ইয়াবার বড় কারবার

আহমদুল হাসান আসিক
২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৯:১৫
advertisement

দেশব্যাপী চালানো বিশেষ অভিযানে আতঙ্ক থাকলেও বন্ধ করা যাচ্ছে না ইয়াবাকারবার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের মধ্যেও চলছে এ মরণনেশার পাচার, বিকিকিনি ও সেবন। মিয়ানমারে উৎপাদিত এ বড়ির বড় বড় চালান কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিনিয়ত আসছে বাংলাদেশে। এসব চালান আনা-নেওয়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে নতুন নতুন রুট। একটি রুট বন্ধ হলে, চালু করা হচ্ছে আরেকটি রুট। এভাবে দুর্গম সীমান্তে অন্তত ২০টি নতুন রুটে ইয়াবা আসছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এমনকি মিয়ানমার থেকে ভারত হয়ে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্ত দিয়েও ইয়াবা ঢুকছে বলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে তথ্য রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিয়ানমার থেকে সবচেয়ে বেশি ইয়াবার চালান আনছে রোহিঙ্গারা। পরে হাতবদল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। ২০১৮ সালের ৪ মে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরুর পর থেকে গত ২১ মাসে সারাদেশে ৪৮৯ মাদককারবারি নিহত হওয়ার পরও এ ইয়াবা বড়ির পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজার জেলাতেই ২০৮ মাদককারবারি নিহত হয়েছেন।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০১৯ সালে সারাদেশে ৩ কোটি ১০ লাখ ২ হাজার ৮২৯ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। ২০১৮ সালে ইয়াবা জব্দ করা হয় ৫ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৮ পিস। জাতিসংঘের মাদক

নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসি বলছে, যত মাদক বিক্রি হয়, ধরা পড়ে তার মাত্র ১০ শতাংশ। এ হিসাবে গত বছর দেশে ইয়াবা বিক্রি হয়েছে ৩১ কোটি পিস। যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৬শ কোটি টাকার মতো (প্রতি বড়ি ১৫০ টাকা)। আর ২০১৮ সালে বিক্রি হওয়া ইয়াবার বাজারমূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

২০১৮ সালের ৪ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইয়াবার বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। টানা অভিযানের মুখে দুই দফায় কক্সবাজারের ১২৩ ইয়াবাকারবারি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাদের মধ্যে ২৩ গডফাদার রয়েছেন। ২৩ জনের মধ্যে কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির চার ভাই ও দুই আত্মীয়সহ ৬ জন রয়েছেন। অন্য ৫০ জনের মধ্যে ৯ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। বাকি ৪০ গডফাদার এখনো আত্মসমর্পণ করেননি। তারা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ৪ মে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ২১ মাসে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ২২১ মাদককারবারি। র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১৩২ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ৫০ জন। নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছেন ৮৬ জন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্দুকযুদ্ধে যারা নিহত হয়েছেন তাদের অধিকাংশই মাঠপর্যায়ের মাদককারবারি। পেছনে বড় বড় বিনিয়োগকারী রয়েছেন। অনেক হুন্ডির কারবারিরাও মাদকের পেছনে বিনিয়োগ করেন। আন্তঃদেশীয় মাদককারবারিদের মধ্যে অর্থের লেনদেনও হয়ে থাকে হুন্ডির মাধ্যমে। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ বড় কারবারি, বিনিয়োগকারী এবং হুন্ডি ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন। এ কারণে মাদক নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ের মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান আমাদের সময়কে বলেন, মাদকের সঙ্গে অনেক স্টেকহোল্ডার জড়িত। প্রত্যেকটি স্টেকহোল্ডার চিহ্নিত করা না গেলে এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়। অভিযান চলছে, মাদকের অনেক বাহক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে। এভাবে এটা বন্ধ করা যাবে না। যারা মাদক ব্যবহার করছে তাদের কাউন্সেলিং করতে হবে। যদি এটা করা না হয় তবে চাহিদা কমবে না। চাহিদা না কমলে মাদক আসবেই। তিনি আরও বলেন, মাদকের সঙ্গে বিনিয়োগকারী, আশ্রয়দাতা, শক্তিশালী গ্রুপ এবং রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। এ বিষয়গুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বড় কারবারি, বিনিয়োগকারী এবং হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে সেই প্রক্রিয়াটিও খুবই ধীরগতিতে চলছে। তাদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করা হবে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। কক্সবাজারের ২০ ইয়াবাকারবারির বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার এক মাদককারবারি পরিবারের ৪ সদস্যের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে।

এদিকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, ২০১৯ সালে সংস্থাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সর্বোচ্চ মামলা করেছে। ২০১৯ সালে সংস্থাটি ১৭ হাজার ৩০৫টি মামলা করে। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৭৯৩টি। ২০১০ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ১৯।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে এখন মাদক এলেই ধরা পড়ছে। তাই মাদক জব্দ হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে। এখন মাদক অনেক কম আসছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মুখে মাদকব্যবসায়ীরা রুট পরিবর্তন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকব্যবসায়ীরা বিভিন্ন রুট পরিবর্তন করছে এটা হচ্ছে বাস্তবতা। এ কারণে আমাদের তৎপরতাও সেভাবেই পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছি।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক আমাদের সময়কে বলেন, মাদকের চাহিদা কমেনি। চাহিদা যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ মাদক আসবেই। আগে চাহিদা কমাতে হবে। সমাজে যারা মাদকসেবী আছে তাদের সুস্থ করতে হবে, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে প্রচার চালাতে হবে। মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে পারলে চাহিদা কমে যাবে। চাহিদা কমলে জোগানও কমবে। যদি চাহিদা থাকে, তবে মাদকব্যবসায়ীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মাদক নিয়ে আসবে। এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ইয়াবার টাকায় বাড়ি-গাড়ি করেছেন অনেক মাদককারবারি। এসব মাদককারবারিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। মাদকের টাকায় সম্পদ গড়ে তুলেছেন এমন প্রমাণ পেলেই মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করা হবে। এ প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

নতুন রুটে আসছে মাদক, ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সমন্বিত অভিযানে একের পর এক মাদককারবারি নিহত হওয়ায় ব্যবসায় ধস নেমেছে। বিশেষ করে সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে পুরনো রুটে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়েছে। নাফ নদী দিয়েও ইয়াবার চালান কম আসছে। তবে কারবারিরা অন্তত ২০টি নতুন রুট দিয়ে ইয়াবা নিয়ে আসছে।

নতুন এসব রুট হচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম পথ। অধিকাংশ চালানে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। গত জানুয়ারি মাসে ইয়াবা পাচারের সময় পৃথক ঘটনায় বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিন রোহিঙ্গা নিহত হন। এর মধ্যে ৬ জানুয়ারি ২ জন, ১৮ জানুয়ারি ১ জন ও ৩১ জানুয়ারি ১ জন রোহিঙ্গা নিহত হন।

বিজিবির কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের অবজারভেশন হচ্ছে- ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশিদের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের হাতে চলে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা অনেক বেশি ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। ওই পাড় থেকে (মিয়ামানমার) তারাই ইয়াবা আনছে। ক্যাম্পের ভেতরে অভিযান চালাতে গেলে মুহূর্তের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। আরও একটি বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গা ইয়াবাকারবারিরা অনেকটা ভাসমান।

ইয়াবার রুট পরিবর্তন হচ্ছে উল্লেখ করে বিজিবির এই কর্মকর্তা বলেন, তারা নতুন নতুন রুটে ইয়াবা আনছে। এমনকি ভারতের ভেতর দিয়ে সিলেটের জকিগঞ্জ, কুমিল্লার সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া দিয়েও ইয়াবা নিয়ে আসছে। আবার নৌপথেও ইয়াবা আসছে।

র‌্যাব ৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের হিসাবে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে মাদক উদ্ধার বেড়েছে। তবে ২০১৯ সালে সেটি কমেছে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এমন চালানও ধরা পড়েছে, যেখানে ২৮ লাখ পর্যন্ত ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ চালান যেটি ধরা পড়েছে, তার পরিমাণ হচ্ছে ৮ লাখ ১০ হাজার পিস। এটি টেকনাফ থেকে ধরা হয়।

রোহিঙ্গারা ইয়াবাকারবারে জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের কর্মসংস্থান নেই। তা ছাড়া মিয়ানমারে তাদের যাতায়াত আছে, তারা রাস্তাঘাট চেনে। তারাই অধিকাংশ সময় বাহক হিসেবে কাজ করে।

 

advertisement
Evall
advertisement