advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে যা করবেন

ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী
১৮ মার্চ ২০২০ ২২:০৩ | আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২০ ০৯:২১
advertisement

মহামারি আল্লাহর আযাব : হযরত আয়িশাহ (রা.)। ‘মহামারি পীড়িত গ্রাম বা শহরে প্রবেশ নিষেধ। পক্ষান্তরে কেউ যদি পূর্বে থেকে আক্রান্ত জায়গা থেকে থাকে তাহলে সেখান পলায়ন করা নিষিদ্ধ। মহামারি আক্রান্ত এলাকা থেকে পলায়ন জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন তুল্য অপরাধ। বুখারী ৩৪৭৩, ৫৭২৮।

ছোঁয়াচে রোগের সূচনা

আফ্রিকার মুর মুসলমানরা তারিক বিন জাহিদের সেনাপতিত্বে ৭১১ খৃষ্টাব্দে জিব্রালটার বিজয় করে ক্রমে ৭২০ খৃষ্টাব্দের  মধ্যে পুরো স্পেন ও পুর্তগালে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং করডোবায় রাজধানী স্থাপন করে। বর্তমানের বহুল প্রশংসিত করডোবা ক্যাথেড্রাল ৭০০ বৎসর (৮০০-১৫০০ খৃষ্টাব্দ) ধরে পরিচিত ছিল আকর্ষণীয় করডোবা মসজিদ রূপে, যা স্থাপন করেছিলেন মুসলিম মুর শাসকরা। পনের শতাব্দীতে মুসলিম শাসনের পতন হলে স্পেনিয়ার্ডরা করডোবা মসজিদের নতুন নামকরন করে করডোবা ক্যাথেড্রাল নামে। করডোবা ক্যাথেড্রালের স্পেনীয় নাম হচ্ছে, ‘ÔLa Megquita’, অর্থাৎ দ্য মস্ক-মসজিদ। 

মুসলমাদের দ্বন্দ্ব ও দ্বিধা-বিভক্তির কারণে ১৪৯২ সালে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। একই বছর পরিব্রাজক ক্রিস্পোফার কলম্বাস নতুন মহাদেশ আমেরিকা আবিষ্কার করে স্পেনে ফিরে আসেন। তিনি নতুন মহাদেশে দিয়ে আসেন ইউরোপের রোগ হাম, বসন্ত ও যৌন রোগ গনোরিয়া। সঙ্গে নিয়ে আসেন বিস্তর স্বর্ণখণ্ড ও যৌন ছোঁয়াচে রোগ সিফিলিস। সিফিলিস রোগের জীবানুর নাম ‘ট্রেপেনোমা প্যালিডিয়াম’। কলম্বাসের নাবিকদের অবাধ যৌন বিহার ও গণিকা পেশার মাধ্যমে সিফিলিস পুরো আন্দুলুসিয়া, পুর্তগাল ও ইটালিতে ছড়িয়ে পড়ে। ১৪৯৬ সালে ছড়িয়ে পড়ে ডেনমার্কে ও সুইজারল্যান্ডে। ফ্রান্সের সম্রাট অষ্টম চার্লস বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত বিরাট ভাড়াটে সেনাদল নিয়ে ১৪৯৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ইটালিতে প্রবেশ করেন, পথিমধ্যে ব্যাপক যৌন আমোদে অংশ নিয়ে নেপলস পৌঁছান পরের বছরের ১২ মে। প্যারিসে প্রত্যাবর্তন করেন জুলাই মাসে, সঙ্গে নিয়ে আসেন ‘রেঁনেশা জীবানু’, যা ফ্রান্সে পরিচিত লাভ করে ‘নেপোলিয়ান ব্যামো’ বা ফরাসি ব্যামো নামে, যার দ্রুত বিস্তার ঘটে জার্মানি ও উত্তর পূর্ব ইউরোপে।

ভাস্কো ডি গামা ১৪৯৭ সালের ৮ জুলাই বিরাট নৌবহর নিয়ে লিসবন ছাড়েন এবং ভারতের পশ্চিম উপকূলে কালিকটে তরী ভিড়ান পরের বছর ১৭ মে। তার নাবিকরা ভারতীয় নারীদের মধ্যে প্রসার ঘটায় ফিরিঙ্গি রোগ। নামে খ্যাত সিফিলিসের। এ রোগ ১৫১০ থেকে ১৫২০ সালের মধ্যে আফ্রিকা, মালায়ে দ্বীপপুঞ্জ, জাপান ও চীনে ছড়িয়ে পড়ে। চীনে সিফিলিসের পরিচিতি ছিল ‘চেনিক ঘা’ নামে।

১৯৪৬ সালে অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন বাজারজাত না হওয়া পর্যন্ত যৌনাচারে সংক্রমিত সিফিলিস রোগ সারা পৃথিবীকে ৬০০ বছর ধরে পর্যুদস্ত করে রেখেছিল। অনেকটা আজকের ছোঁয়াচে রোগ করোনাভাইরাস সংক্রমনের ধারায়।

১৯২৮ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরোটরিতে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, হাওয়ার্ড ফ্লোরী, আর্নেস্ট বরিস চেন ও নরমান হিটলীর সম্মিলিত গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন। যে কয়েকটি পাত্রে প্রথম পেনিসিলিন উৎপাদন করা হয়েছিল, তার একটি পাত্র বিজ্ঞানী নরমান হিটলী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে উপহার দেন ১৯৮০ সালে, যা বর্তমানে সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে রক্ষিত আছে।

পেনিসিলিন প্রথম ব্যবহৃত হয় লন্ডনের পুলিশ আলবার্ট আলেকজান্ডারের প্রদাহ নিবৃত্তির জন্য, সময়টি ছিল ১৯৪১ সালের ১২ ফ্রেব্রুয়ারি। পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি অ্যাবট, লীডারলী, ফাইজার, মার্ক ও স্কুইবের ভূমিকা স্মরণযোগ্য।

ভয়ানক ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাসের ইতিবৃত্ত

ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রাক্কালে ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্র কলেরা জীবানুর মাধ্যমে জীবানু যুদ্ধের বিস্তারের জন্য ব্যাপক গবেষণা করছিল ঢাকার মহাখালীতে সিয়োটা কলেরা ল্যাবরোটরিতে, যা বর্তমানে আইসিডিডিআরবি নামে বিশ্বখ্যাত।

এই শতাব্দীর প্রথম দশ থেকে সারস করোনাভাইরাস (SARS-CoV-2) সংক্রান্ত গবেষণা চলছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের উহানের গবেষণাগারে। জনশ্রুতি আছে, জীবাণু যুদ্ধে ভাইরাস ব্যবহারের উপযোগিতা পরীক্ষা ছিল মূল লক্ষ্য।

কথিত আছে, চীনের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হুবাইয়ের রাজধানী উহানে প্রাণী বাজার থেকে করোনাভাইরাস গত বছরের নভেম্বরে মানুষে সংক্রমিত হয়। সারস ভাইরাস ৩৮৪ বার পরিবর্তিত হয়ে করোনা নভেন রোগ কোবিড-১৯ কে রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এ রোগকে কোবিড-১৯ নামকরণ করেন গত ১১ ফেব্রুয়ারি। আর কোভিড-১৯ মহামারি হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয় গত ১১ মার্চ। 

কোবিড-১৯ অন্যান্য ভাইরাস থেকে অপেক্ষাকৃত বড় এবং ভয়ানক ছোঁয়াচে, মানুষ থেকে মানুষে অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ প্রবাসী নাগরিকদের দেশে প্রত্যাবর্তন, বিনোদন বা পরিজনের সঙেগ সময়যাপনের নিমিত্তে আগমন।

কোবিড-১৯-এর উপসর্গ হচ্ছে জ্বর, কফ-কাশি, হাঁচি, মাংসপেশীর বেদনা, গলাদাহ, যা ২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ফুসফুসের সমস্যা সৃষ্টি করে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে স্পনজী ফুসফুস শ্লেটের মতো শক্ত হয়ে যায়।

আজ বুধবার বিকেল পর্যন্ত এই ভাইরাসে মারা গেছেন অন্তত ৮ হাজার মানুষ। এই তালিকায় আজ যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশও। করোনাভাইরাসে দেশে আজ প্রথম একজন মারা গেছেন। নতুন করোনাভাইরাসে (কোভিড–১৯) বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা এখন ১৪ জন। করোনা আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি রোগী আছে চীন, কোরিয়া, ইরান, ইটালি, স্পেন ও ফ্রান্সে।

 বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সংখ্যা যে লাফিয়ে বেড়ে যাবে না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

১. বাংলাদেশে কোবিড-১৯-এর প্রবেশ দ্বার

ভারত সীমান্ত : ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের অধিক সীমান্ত রয়েছে। কয়েকশত পথে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা যায়। এর বাইরে রয়েছে প্রতিদিন কয়েকশত ভারতীয় ট্রাকের বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রানজিট ব্যবহার। বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় নিয়মিত কর্মে লিপ্ত। অনুমোদন বিহীন ভারতীয় নাগরিকের বাংলাদেশে অবস্থানের সঠিক তথ্য নেই। প্রতিদিন কয়েক হাজার ভারতীয় স্থল পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং প্রত্যাবর্তন করে। তাদের মাধ্যামে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা সমধিক। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিদিন কয়েক হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসা, বিনোদন ও হুন্ডি ব্যবসার নিমিত্তে ভারতে আসা যাওয়া করে। এ যাতায়াত বন্ধের জন্য সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারাগারে করোনা ছড়ানোর সম্ভাবনা : বাংলাদেশের সকল কারাগারের মিলিত বন্দী ধারণক্ষমতা ৪০ হাজারের চেয়ে কিছু বেশি। কিন্তু রাজনৈতিক হয়রানি, পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে কারাবন্দী আছে প্রায় ৯০ হাজার। কারাগারের জনাকীর্ণতা কোবিড-১৯-এর জন্য উন্মুক্ত দ্বার সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিকার হিসেবে সরকারের উচিত হবে, ফাঁসির আসামি, যাবজ্জীবন ও দশ বৎসরের অধিক দন্ডপ্রাপ্ত ছাড়া অন্য সকল দন্ডপ্রাপ্ত অভিযুক্তদের সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে মুক্তি দেওয়া এবং বুঝিয়ে বলা পরিবারের বাইরে যেন বেশি চলাফেরা না করেন।

আদালত প্রাঙ্গন : সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত কয়েক লাখ চিন্তিত ব্যক্তি ও উকিল মুহুরি ও অন্যান্য কর্মচারী আদালত প্রাঙ্গন থেকে শুরু করে এজলাস পর্যন্ত ভয়ানক ভিড় করে থাকেন। একে অপরের গায়ে প্রায় লেগে থাকেন। আদালতে এত মামলার মূল কারণ রাজনৈতিক হয়রানি।

বিশ্ব কোবিড-১৯-এর ছোঁয়াচে সংক্রমণকে বিবেচনায় নিয়ে উচিত হবে ৭০ ভাগ অভিযুক্তদের ২০৫ ধারায় কোর্টে উপস্থিতি থেকে রেহাই দেওয়া যতদিন না মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়। এ ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে সব মামলার শুনানি ও উপস্থিতির জন্য তিনমাস অন্তর তারিখ দেওয়া।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বাড়ানো প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অত্যন্ত জনাকীর্ণ এবং ক্যাম্পে  সাধারণ জীবনযাপনের পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা নেই। রোহিঙ্গারা যেন ক্যাম্পের বাইরে না আসে সেদিকে যেমন লক্ষ্য রাখতে হবে, একইভাবে স্থানীয় জনসাধারণের ক্যাম্পে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

মসজিদ, মন্দির, গির্জা প্যাগোডা খোলা থাকবে, তবে : উপাসনালয়ের প্রবেশ পথে ভক্তদের ৬-১০ ইঞ্চি দূর থেকে ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা নির্ণয় করা উপযুক্ত কাজ হবে। খুতবায় কোবিড-১৯ সম্পর্কে ভক্তদের তথ্য দিতে হবে, গুজব না ছড়িয়ে বা গুজবে কান না দিয়ে প্রতিবেশী প্রবাসীদ আত্মীয়-স্বজনকে ১৪ দিন আলাদা রাখার পরামর্শ দিতে হবে। একইভাবে বাড়ির সবাইকে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া ও কনুই পর্যন্ত ধুয়ে অজু করার পদ্ধতি অনুসরণ করতে সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। হাত মেলানো ও আলিঙ্গন পরিহার করতে হবে। না ছুঁয়ে সালাম দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে- হ্যান্ডসেক নয়, সালাম দিন।

বাস-ট্রেন স্টেশন, বন্দর, বাজার ও লঞ্চঘাট : বাস-ট্রেন স্টেশন, বন্দর, বাজার ও লঞ্চঘাটে যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিন হাতে ধরা ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে। বাড়িতে ফিরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া এবং আলিঙ্গন, হ্যান্ডসেকের পরিবর্তে হাত তুলে সালাম দেওয়ার অভ্যাস করার চেষ্টা নিন।

প্রবাসীদের প্রতি সদয় হোন : প্রবাসীরা বাংলাদেশের সমৃদ্ধির যোগানদার। প্রায় এক কোটি প্রবাসীর মধ্যে ২৫ লাখ চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্ট, আইটি পেশাজীবি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস করেন। এরা তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ বিদেশে রাখেন, দেশে পাঠান না। বাকি প্রায় ৭৫ লাখ সাধারণ শ্রমজীবি প্রবাসী বাংলাদেশীরা দশমাসে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন, পৃথিবীর প্রায় ১০০টি দেশে বাংলাদেশিরা কঠিন শ্রমদিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। প্রতি তিন-চার বছর পরপর তারা স্ত্রী-পুত্র পরিজন ও আত্মীয়দের দেখার জন্য দেশে ফিরেন ১০ থেকে ৪০ ঘণ্টা বিমান ভ্রমণ করে।

কোবিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধের নিমিত্তে বিমানবন্দরে পৌঁছার পর তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখা বিজ্ঞানসম্মত। তারা যদিও ‘নবাবজাদার অভ্যর্থনা’ প্রত্যাশা করে না, তবে সরকারের নৈতিক দায়িত্ব হবে যে, তাদের ১৪ দিন আহার বিশ্রামের জন্য পাঁচ স্টার অভ্যর্থনা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া। তারা সারা দিন আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফিরে যাচ্ছেন, তাদের আইসোলেশনের বৈজ্ঞানিক কারণ ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া, যাতে বাড়ির বাইরে ১৪ দিন ঘোড়াফেরা না করেন। জরিমানা করা অমানবিক কাজ।

সরকারি ব্যবস্থাপনা অনেকগুণ বাড়তে হবে : পৃথিবীর সব দেশ কঠিন সমস্যায় পড়েছে। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে দুর্বলতা হচ্ছে হাসপাতাল, ক্লিনিক নামক বিল্ডিং আছে, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত জনবল নেই সরকারি ভুল নীতিমালার কারণে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) এ রিভার্স পলিসারজ চেইন রিমত্র্যাকসন পরিচালনায় দক্ষ ৫০ জন ভাইরোলজিস্ট, এনটোমোলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট নেই।

সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ল্যাবরোটরিতে উন্নত মানের পিসিআর নেই। তারপরও বাংলাদেশে মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপর অদ্ভুত ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক ও বিবিধ ট্যাক্স প্রয়োগের নিয়ম প্রযোজ্য আছে। মেডিকেল শয্যার ওপর সর্বমোট ট্যাক্স হচ্ছে ৫৮%, গ্যাস এনালাইসির, ভেন্টিলেটর, থার্মোমিটার অক্সিজেন সিলিন্ডারের ওপর ধার্য সর্বমোট শুল্ক হচ্ছে ৩১%। তদোপরি বিভিন্ন কর্মকর্তাদের খুশি করার জন্য অন্যান্য উপরি ব্যয় তো আছে।

সকল মেডিকেল যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় রি এজেন্ট ও সামগ্রীর ওপর ০% ( জিরো ট্যাক্স) করা সরকারের আশু দায়িত্ব। সকল প্রবেশ পথে পর্যাপ্ত স্ক্যানার ছাড়াও কমপক্ষে ২০-৩০টা হাতে ধরা ইনফ্ররেড থার্মোমিটারের ব্যবস্থা থাকা উচিত। তিন শিফটে কাজ হওয়ার মতো স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবস্থা রাখতে হবে।

পত্রিকান্তরে খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভাণ্ডারে মাত্র ১ হাজার ৭৩২ কোবিড-১৯ রোগ জীবাণু পরীক্ষার কিট আছে। আইইডিসিআর কোবিড-১৯ শনাক্ত করার জন্য মাত্র ২৬৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করেছে, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। যেকোনো একটি উপসর্গ থাকলেই চিন্তিত রোগীর নমুনা পরীক্ষা প্রয়োজন। প্রস্তুতি থাকতে হবে মাসে কয়েক লাখ সম্ভাব্য রোগীর নমুনা পরীক্ষা। সম্প্রতি আর্ন্তজাতিক স্বাস্থ্য সাময়িকী দি ল্যানসেট প্রকাশিত হয়েছে ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে কোবিড-১৯ ভাইরাসের বিস্তৃতির তথ্য।

সরকারকে অনতিবিলম্বে আগামী এক মাসের মধ্যে এক লাখ চিকিৎসক ও দুই লাখ নার্স টেকনিশিয়ান প্যারামেডিক ও ফিজিওথেরাপিস্টকে কয়েকঘণ্টা করে  করোনা রোগের ধরণ, উপসর্গ বিস্তৃতি, রোগ নির্ণয় পদ্ধতি ও প্রতিরোধক ব্যবস্থা, ভালোকরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, আলিঙ্গন বা হেন্ডসেক না করে সালাম দেওয়ার অভ্যাস করা ও সম্ভাব্য রোগীকে দেখে ভয়ে পালিয়ে না যাওয়ার জন্য অনুপ্রানিত করতে হবে। শেখাতে হবে যে, রোগীকে পরীক্ষা না করে পালানো, রাসুলুল্লাহর মতে জিহাদের মাঠ থেকে পলায়নতুল্য চিকিৎসক ও নার্সদের ভালোকরে হাত না ধোয়া সম্পর্কে বৃটিশ মেডিকেল জার্নালে একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল কয়েক বছর আগে। 

দেশীয় বিজ্ঞানীদের সহায়তা করুন, সম্মান দিন : সরকারি সহযোগিতা পেলে গণস্বাস্থ্য এক মাসের মধ্যে কোবিড-১৯ নির্নয়ক গণস্বাস্থ্য র‌্যাপিড ডট ব্লট (G-Rapid Dot Blot) বাজারজাত করবে। ড. বিজন কুমার শীল ডিনি সিঙ্গাপুরে ২০০৩ সনে সারস ভাইরাস নির্নয়ক- রেপিড ডট রট উদ্ভাবন দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন, তিনি বর্তমানে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের গণস্বাস্থ্য  অধ্যাপক ও ফার্মাসিউটিকেলসের প্রধান বিজ্ঞানী। ড. বিজন কুমার শীল ও তার তিনজন সহকারী ড. নিহাদ আদনান, ড. ফিরোজ আহমদ ও ড. বায়জিদ, জমির উদ্দীন গণস্বাস্থ্য ল্যাবরোটরিতে অ্যান্টিবডিএসেজ (ইমমিউনোগ্লোবিন-এ, ইমমিউিগ্লোবিং- জি ও ইমিউনোগ্লোবিল-এম ইমমিউনোত্রসেজ) পদ্ধতি ব্যবহার করে কোবিড-১৯ ভাইরাস নির্নয়ক পদ্ধতি রেপিড ডট ব্লট  উদ্ভাবন করেছেন। সরকার দ্রুত বিভিন্ন করোনাভাইরাস অ্যান্টিবডি, নিউ ক্লোপ্রোটিন, স্পাইন গ্লাইকোপ্রোটিন, করোনাভাইরাস এনভেলাপ প্রোটিন প্রভৃতি ইংল্যান্ড থেকে সংগ্রহের অনুমতি দিলে বাজারজাত করনের জন্য পর্যাপ্ত রেপিড ডট ব্লট প্রস্তুত হবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে। প্রতিটির উৎপাদন খরচ হবে ২০০ টাকা, সরকার শুল্ক, বিভিন্ন প্রকার ট্যাক্স ও ভ্যাট মৌকুফ করে দিলে জনগণ মাত্র ৩০০ টাকায় পরীক্ষা করে কোবিড-১৯ সংক্রমন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে।

পিসিআর পদ্ধতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ভিজিট কন্ট্রোল রেপিড ডট ব্লট উদ্ভাবনের উদ্যোগ নিচ্ছে এবং গণস্বাস্থ্যের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

শেষকথা, সঠিক তথ্য দিন, গুজব ছড়াবেন না, বাংলাদেশের জনগণের ওপর আস্থা রাখুন। ডাক্তার স্বাস্থ্যকর্মীসহ সকলে সাবান দিয়ে বারে বারে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন, হ্যান্ডশেক নয়, সালাম দিন। ‘আল্লাহর আযাব’ থেকে নিশ্চয়ই সবাই মুক্তি পাবেন।

ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা

advertisement
Evall
advertisement