advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এই তবে ‘হোম কোয়ারেন্টিন’!

ডা. পলাশ বসু
১৯ মার্চ ২০২০ ২১:৫৫ | আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২০ ২১:৫৫
advertisement

আপাত সুস্থ মানুষ যদি ছোঁয়াচে রোগ প্রাদুর্ভাব এলাকা থেকে আসে, তাদের থেকে যেন এ রোগ অন্য কোনো মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য এসব মানুষকে একটা নির্দিষ্ট সময় অবধি নিজের ঘরেই অবস্থান করতে বলা হয়। এ সময়ে সে বাইরে বের হবে না। কারও সঙ্গে মিশবে না। তার থালা, প্লেট, গ্লাস আলাদা করে দিতে হবে। তার রুমে না গিয়ে দরজার সামনে এ সময়ে খাবার পৌঁছে দিতে হয়। এসব থালা, প্লেট, গ্লাস সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হয়।

যদি বাসায় আলাদা কক্ষ না থাকে তাহলে তার থেকে কমপক্ষে ৩ ফুট দূরে থাকতে হবে। বাথরুম ব্যবহারের পরে এ ব্যক্তি সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবেন। তারপর পানির ট্যাপ সাবান দিয়ে আবার পরিষ্কার করবেন। এসব একদমই বুলেট পয়েন্ট আকারে কিছু কথা বললাম। এর বাইরেও আরও বিষয় আছে। যাই হোক, কথাগুলো যত সহজে বললাম তা মেনে চলাটা কিন্তু তত সহজ নয়।

কারণ আমার প্রিয়জন বিদেশ থেকে এসেছে এতদিন পরে। তাকে এভাবে পরিবারের আর সবার থেকে আলাদা করে রাখতে কি মন সায় দেবে? আবার তিনি যদি হন সংসারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, তাহলে তো তার কথাই সব। তাকে আলাদা করে রাখার এত হিম্মত তখন কার থাকে বলুন? অথচ নিজের পরিবারের নিরাপত্তার জন্যই কিন্তু এদের খুশি মনে এটা মেনে নেওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, বাস্তবে তা সম্ভব নয়।

আর তাই অবাক হয়ে দেখলাম হোম কোয়ারেন্টিনের এ নিয়ম কোথাও কেউ মানেনি। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের মানানোও সম্ভব হয়নি। এদিকে গত ৮ দিনে প্রায় লাখের ওপরে বিদেশ থেকে মানুষ দেশে এসেছে। এরা কেউ করোনা আক্রান্ত ছিলেন না-এটা হলফ করে বলা যাবে কি? বরং করোনা প্রাদুর্ভাব এলাকা থেকে এসেছে মানেই এরা কেউ না কেউ জীবানু বহন করে এনেছেন-ই; এটাই ধরে নিতে হবে। এটা বোঝার পরেও আমরা তাদেরকে কেন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে নিলাম না তা সত্যিই এক বিরাট প্রশ্ন।

আমরা তো চীনে করোনা আউটব্রেক হওয়ার পরে প্রায় আড়াই মাস সময় পেয়েছি। এতদিন আমরা বেশ ভালোই ছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে এভাবে বিদেশ ফেরতদেরকে আমরা ‘প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন’ ছাড়া কেন ‘হোম কোয়ারেন্টিনে’ পাঠালাম, তা আমার বোধগম্য হয়নি আজও। এখন তো মনে হচ্ছে তারই বাজে ফলাফল দেখতে পাচ্ছি আমরা।

কারণ তারা একদম ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিয়ে করছেন। সামাজিক সব কাজে অংশ নিচ্ছেন। বাজারে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। মোটর সাইকেলে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাচ্ছেন। আত্মীয়স্বজন আসছেন তাকে দেখতে। তিনিও যাচ্ছেন আত্মীয়ের বাসায়। ফলে দেখা যাচ্ছে এসব বিদেশী ফেরত কেউই হোম কোয়ারেন্টিনের নিয়ম মানছেন না। আর সেটা না মানায় দেখছি বিভিন্ন জায়গায় জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু এতে কি ভাইরাসের বিস্তার বন্ধ হবে? কারণ এ কয়দিনে তারা যা করার তা করে ফেলেছেন। অর্থাৎ পরিবার, বন্ধুবান্ধব, এলাকার মানুষ, আত্মীয়স্বজন এদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন আর ভাইরাসকে ‘ভাইরাল’ করে দিয়েছেন। বাস্তবেও কোনো খবর বা গুজবের ভাইরাল হওয়ার কথাটিও ভাইরাসের এহেন দ্রুত বিস্তারের ক্ষমতা থেকেই এসেছে।

যাই হোক, এই যে হোম কোয়ারেন্টিন না মানার এহেন অপরাধের শাস্তির জন্য জরিমানার মতো এত কম শাস্তি হওয়া বোধহয় ঠিক না। আইনেও তো জেল এবং জরিমানার কথা বলা আছে। ফলে হোম কোয়ারেন্টিনের সুযোগ দিয়ে যে ভুল আমরা করেছি, সেটা থেকে কিছুটা বের হতে হলেও এদেরকে কঠোর নজরদারিতে নিতে হবে একদম সময় নষ্ট না করেই। তাই আমি নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ আমাদের সকলের মঙ্গলের জন্য দিতে চাই। ইমারজেন্সি, লকডাইন বা শাটডাউন করলে এসব করাই লাগবে। বরং তার আগেই শুরু করলে ভালো হয়। কারণ এখন প্রতিটি মুহূর্ত খুবই মূল্যবান। ইতালি শিথিলতা দেখিয়ে এখন বিরাট বিপদে আছে। আমাদের অবস্থা যেন তেমন না হয় সেটাই আমরা চাই। তাই বলব :

★ এ রকম হোম কোয়ারেন্টিনের নিয়ম না মানা (এটা ক্রাইম) ব্যক্তির জন্য জরিমানা নয়। বরং লাল দালানের কিছু রুম খালি করে তাদের আলাদা করে সেখানে ভরে দিন। অল্পদিনের সাজাপ্রাপ্ত বা সাজা খাটার আর অল্প দিন বাকি আছে, এমন বন্দীদেরকে  মুক্তি দিয়ে সেসব রুমে এদেরকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হোক। শুনতে খারাপ লাগলেও এখন জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত যদি নিতে হয় তা নিতে হবে। কারণ এর ব্যত্যয় হলেই মুশকিল।

★যেসব কোচিং সেন্টার এখনো তাদের কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে তাদেরকেও জেলে ঢুকানো হোক। এদের শাস্তি খুবই কঠিন হওয়া দরকার। দয়া করে এটা দেখে কেউ আবার মানবাধিকারের ফ্ল্যাগ তুলে ধইরেন না।

★ যে অভিভাবক তার সন্তানের স্কুল বন্ধের জন্য এত উতালা ছিলেন, তিনি আবার ঠিকই তার সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাচ্ছেন। এই হিপোক্রেসির পানিশমেন্ট কী হওয়া উচিত আমার মাথায় আসছে না (এদের কথা ভাবলে আমার স্বাভাবিক জ্ঞান বুদ্ধি রাগের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে)। তবে আমি চাই এ ব্যাপারে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিক।

★যারা অহেতুক বাইরে ঘুরছে, শপিংয়ে যাচ্ছে তাদেরকে ধরে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে রাখুন। পরে হেঁটে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করুন। এদের ফোন নম্বর নিন। ট্রাকিং করুন। না মানলে সোজা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন। এটাই ওদের শাস্তি।

★যারা এখনো এন্তেজামসহ বিয়ে করছেন তাদের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে অন্তত মরার আগে যেন বিয়ে নামক ব্যাপক প্রয়োজনীয় কাজটি সেরে রাখতে পারে। না হলে নিশ্চিত স্বর্গ/বেহেস্ত প্রাপ্তি হয়তো মিস হয়ে যেতে পারে। এদের এমন মহামারির সময়ে বিয়ে করার এহেন বালখিল্যতার শখ দীর্ঘসময়ের জন্য মিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় না? কমিউনিটি সেন্টারগুলো অন্তত ১ মাসের জন্য বন্ধ করে দিন।
★ জামাকাপড়ের দোকান, শপিংমল, ফুড কোর্ট, ফাস্ট ফুডের দোকানও অন্তত মাসখানেকের জন্য বন্ধ রাখা যেতে পারে।
★ এদিকে নির্বাচন কমিশন ঢাকা আর চট্টগ্রামে নির্বাচন করেই ছাড়বে বলে ঘোষণা দিচ্ছে। এদের মাথায় ঠিক কি চিন্তা ঘোরে আমি জানি না। অনেকে বলেন এদের নাকি মাথা মোটা। সেটা না হয় তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম। তাই বলে প্রার্থীদেরও কি মাথা মোটা?
তারা সবাই মিলে নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দিতে পারেন না? তখন দেখি, নির্বাচন কমিশন কার জন্য ভোটের আয়োজন করে! সেটা কি প্রার্থীরা করবেন? নাকি ‘গণসংযোগের’ নামে ‘করোনা সংযোগ’ করেই যাবেন? আপনাদের জনপ্রতিনিধি হওয়ার এতটাই খায়েশ? কী মওকা আছে এখানে বলেন তো?

পরামর্শ : প্রয়োজনে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ, হোম কোয়ারেন্টিনকে নিশ্চিতকরণ এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে মিলিটারি, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সব বাহিনীকে একত্রে নামানো যেতে পারে। জাতীয় হটলাইন নম্বর আরও বেশি সংখ্যায় চালু করা যেতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি কিভাবে হাসপাতালে যাবে, তার সুব্যবস্থাও করা দরকার। চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় প্রটেকটিভ ইকুয়েপমেন্ট দিয়ে তারপরে কাজে নামান। না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে। অনলাইনে সকল থানা, জেলা হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স এবং লোকবলদেরকে প্রয়োজনীয় ট্রেনিং দিন। আউটডোর সার্ভিস এখনই বন্ধ করে দিন। শুধুমাত্র ইমার্জেন্সি সর্ভিস চালু রাখুন। এ ক্ষেত্রে গর্ভবতী মা, বৃদ্ধ ও শিশুদেরকে আগ্রাধিকার দিন।

সর্বশেষে আশার খবর : সর্বশেষ বলব গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র যে সহজলভ্য এবং অতি দ্রুত (১৫ মিনিটেই) করোনা টেস্টের কিট আবিস্কারের দাবি করেছে, তা আজকের  মধ্যেই পরীক্ষা করে দেখে মানসম্মত হলে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন শুরু করা উচিত। অবশ্য আইইডিসিআর বলেছে, তারা এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখছে। যেহেতু এ টেস্টটি সহজেই করা যাচ্ছে ফলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তড়িৎ। একদমই দেরি নয়। কারণ এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে দিয়েছে। বলেছে, ‘টেস্ট’ ‘টেস্ট’ ও ‘টেস্ট’ এর কথা। সেক্ষেত্রে গণস্বাস্থ্যের উদ্ভাবিত এ কিট হতে পারে সারা বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ। তাহলে ১ মাসের মধ্যেই ‘করোনা পরিস্থিতি’ এর সিগনিফিকেন্ট উন্নতি সম্ভবপর হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

পরিশেষে বলব, আসুন এই একটা যুগান্তকারী আবিষ্কারের সফলতার গল্প যেন সত্যি সত্যি আমরা নতুন দিনের সূর্যকে নতুন বারতা নিয়ে হাজির করতে পারি-সেই শুভকামনায় সিক্ত হতে চাই। আসুন সে লক্ষ্য নিয়ে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ি।

ডা. পলাশ বসু : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ

advertisement
Evall
advertisement