advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সময়ক্ষেপণ নয় এক মিনিটও

ড. পলাশ বসু
২২ মার্চ ২০২০ ২১:২৪ | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২০ ২৩:১১
advertisement

করোনার এখন যে অবস্থা আর সেই সঙ্গে এখনো প্রবাসীদের দেশে আসতে থাকা- মিলিয়ে খুবই উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে জনমনে। কারণ সর্বশেষ দিন দশেক ধরে যারা দেশে এসেছে তারাই এখন আমাদের করোনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এদেরকে হোম কোয়ারেন্টিন আমরা ঠিকমতো করতে পারিনি। এটা বাস্তবে যে সম্ভবও নয়- সেটাই আমরা হয়ত ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনি।

অথবা, ইতালি ফেরতদেরকে ঘোষণা দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে নিতে যে ব্যর্থতার পরিচয় দিলাম আমরা তারপর থেকে সন্দেহভাজন (যাদের শরীরে তাপমাত্রা বেশি ছিল) ছাড়া আর কাউকে আমরা এ কোয়ারেন্টিন করতে পারিনি। এটা কেন হলো, কিভাবে হলো, রাষ্ট্রীয় এমন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ কি তা আমাদের কাছে রহস্যেঘেরা।

এই যে ভুলটা আমরা করলাম সেটা এখনো চলছে। এখনো প্রবাস থেকে দেশে আসছে মানুষ আর আমরা তাদেরকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠাচ্ছি। এটা রীতিমতো আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। কারণ হোম কোয়ারেন্টিনের ব্যর্থতা তো আমাদের কাছে জ্বলন্ত হয়ে আছে। তবুও আমরা তা করেই যাচ্ছি। কেন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন আমরা করতে পারছি না তা কারোরই বোধগম্য হচ্ছে না। যদি কোনো কারণে সেটা না করা যায় তাহলে আমরা কেন বিমানবন্দর লক করে দিচ্ছি না? সেটা তো অন্তত করা উচিত। তাহলেও আমরা অনেকটাই নিরাপদে থাকতে পারতাম। এখন করলেও যে ফল আসবে না সেটা হয়ত না। তবে আগে শুরু করতে পারলে এখন এই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়ে সময় কাটাতে হতো না।

যাই হোক, ভুলের মাশুল সামনে যত কম দেওয়া যায় সেদিকেই আমাদের এখন দৃষ্টি দিতে হবে। এখানেও শিথিলতা দেখালে পরে হয়ত তার মাশুল ব্যাপভাবে দিতে হবে। আমার খুব অবাক লাগছে করোনায় মৃত্যু নিয়ে আমরা নানামাত্রিক পরিসংখ্যান দিচ্ছি। বলছি যে, এতে বৃদ্ধ (৬০ এর উপরে বয়স) এবং শারীরিক জটিলতা যাদের আছে তারা মারা যায়। মৃত্যুহার ২% এর মতো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বৃদ্ধরা কারা? তারা আমাদেরই বাবা-মা, চাচা-চাচি, নিকটজনই তো, নাকি? তাদের কি বাঁচার অধিকার নেই? আর ২% এর পরিসংখ্যান ইতালির দিকে তাকান একদম পাল্টে যাবে। তারা এখন মৃত্যুর দিক থেকে চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের এখানে এমন হলে কী হতে পারে একবার ভাবুন তো?

এ কারণে আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরতে চাই। হয়ত এসব নিয়ে রাষ্ট্রীয় জায়গা থেকে কেউ না কেউ ভাবছেন। আমাদের জনমত তাদেরকে হয়ত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রানিত বা উৎসাহিত করতে পারে। তাই বলব-

১. হাসপাতালগুলোর (সরকারি/বেসরকারি) সকল আউটডোর সার্ভিস বন্ধ করুন আজ থেকেই। গণমাধ্যমসহ প্রশাসনের সর্বস্তর হতে মাইকিং করে এলাকায় এলাকায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেওয়া উচিত। না হলে চিকিৎসক, নার্স এবং সংশ্লিষ্ট সেবাকর্মীদের আউটডোর সার্ভিস প্রদানের কারণে তা তার পরিবার এবং হাসপাতালে আসা করোনা আক্রান্ত নন -এমন রোগীদের মধ্যে এ রোগের বিস্তার ঘটাতে থাকবে অতি দ্রুত। সাথে এটাও জানিয়ে দিতে হবে যে, হাসপাতালগুলোতে এখন শুধু ইমার্জেন্সি সার্ভিস চালু আছে। ফলে জরুরী/গুরুতর সেবার প্রয়োজন না হলে কেউ যেন হাসপাতালে না যান। গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার স্বার্থে সবাই যেন এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেন। শিশু, প্রেগন্যান্ট মহিলা এবং বৃদ্ধ মানুষদেরকে জরুরি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

২. হাসপাতালে এখন যেসব ভর্তি রোগী আছে তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসা লোকদের একদমই ঢুকতে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ আমরা জানি না এরা কে, কোথা থেকে, কিভাবে এসেছে। ফলে এরা করোনার বাহক হতে পারে এটা মাথায় রাখতে হবে। এদিকে রোগীদের আউটডোর সেবা বন্ধ করে দিলে ইনডোরে লোকবল বাড়ানো সম্ভবপর হবে। তাতে রোগীর এটেনডেন্ট ছাড়াই হাসপাতাল স্টাফদের মাধ্যমে রোগীদের সেবা প্রদান করা সম্ভবপর হবে। এতে করোনার সম্ভাব্য বিস্তার কমবে।

৩. আউটডোর বন্ধ করে দিয়ে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে ২৪ ঘণ্টার ভিত্তিতে ইনডোরে ডিউটি দিন। অর্থাৎ একবারে ঢুকে ২৪ ঘণ্টা পরে একটা গ্রুপ বের হয়ে যাবেন। সে সময়ে নতুন আর এক গ্রুপ এসে কাজে যুক্ত হবেন।

৪. ইমার্জেন্সিতে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবাইকে পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুয়েপমেন্ট দিন। তারপর সেখান থেকে সর্ট আউট করে সম্ভাব্য করোনা রোগীদেরকে (জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বিদেশফেরতের ইতিহাস, এমন ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ইতিহাস ইত্যাদি আছে) আলাদা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দিতে হবে। ওখানে যারা দায়িত্বে থাকবেন তাদেরকেতো প্রটেকটিভ ইকুয়েপমেন্ট দিতেই হবে।

৫. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর হল, ক্লাস রুম- এ সময়ে চিকিৎসক এবং সরাসরি চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত সকলের থাকার জন্য রেডি করা উচিত। খাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ এ সময়ে এদের পরিবারের সঙ্গে থাকাটা ঠিক হবে না- পরিবারের মঙ্গলের স্বার্থেই।

৬. সেই সঙ্গে কারো যদি সাধারণ কোনো পরামর্শের প্রয়োজন হয় তাহলে তাদের জন্য বিভাগ, জেলা বা থানা ওয়ারী হটলাইন চালু করা যেতে পারে। সেসব নাম্বার গণমাধ্যমের পাশাপাশি লোকাল প্রশাসনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান, মেম্বার, কাইন্সিলর, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, অন্য ধর্মের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে প্রদান করতে হবে। তারা তা প্রচার করবেন। আর স্বচ্চাসেবকবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও এসব নম্বর থাকবে। মানুষ যেন তার জরুরী প্রয়োজনে দ্রুত সেবা নিতে পারে।

৭. আগামী ২/৩ দিনের মধ্যেই গ্রাম, উপজেলা, জেলা, বিভাগওয়ারী প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী গড়ে তোলা উচিত।

৮. নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকান, ফার্মেসি বাদে শপিংমল, অন্য দোকানপাট সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

৯. এ সময়ে গরিব মানুষের যেন খাওয়ার কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

১০. সরকারির সঙ্গে বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/ কর্মচারিদের বেতন এ সময়ে প্রদান করে দিতে হবে।

পরিশেষে বলব, ৩/৪ দিনের ভেতরে এসব ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শেষ করতে হবে। আর সিদ্ধান্ত নেওয়া থাকলে দেরি না করে সেটাকে প্রয়োজনে রিভাইজ করে বাস্তবায়ন শুরু করা দরকার। আমাদের জন্য আগামী ১ থেকে দেড় মাস খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদেরকে এখন সর্বশক্তি দিয়ে কাজে নেমে পড়তে হবে। জাতীয়ভাবে ডা. আব্দুল্লাহ স্যারের নেতৃত্বে যে কমিটি তৈরি করা আছে প্রয়োজন মনে করলে সেখানে আরও বিশেষজ্ঞকে দ্রুত নিয়ে নিতে হবে। এর কারণ হচ্ছে- পরিকল্পনার সমন্বয়, তত্ত্বাবধান, প্রয়োগ যেন দ্রুততর হয় সেটা কঠোরভাবে দেখভাল করা।

আর কঠোরভাবে এসব করতে গেলে ১ মাসের জন্য ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা উচিত। দেরিতে হলেও হয়ত উপায়হীন হয়ে এটা আমাদের করতে হতে পারে। আমার মনে হয় আগেভাগেই সেটা করা দরকার। তাহলে হয়তো করোনার বিস্তার অনেকটাই কমানো সম্ভবপর হবে। তাতে মানুষের ভেতরে আতঙ্ক কমবে। চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিগনও অধিকতর আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাহলে সেবা দিতে পারবেন। করোনাকে অতি দ্রুত রুখে দিতে পারলে আমাদের জনজীবনও স্বাভাবিক হয়ে আসবে দ্রুত। অর্থনীতির চাকাও তাহলে সচল হয়ে উঠবে। সম্ভাব্য সব ক্ষতি কাটিয়ে আমরাও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। আর এ পরিস্থিতি যত লম্বা হতে থাকবে তা আমাদের জন্য অশনি সংকেতই বয়ে আনবে। তাই যা করার তা দ্রুত শুরু করতে হবে। সময়ক্ষেপন করা যাবে না এক মিনিটও।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

advertisement
Evall
advertisement