advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

দেশেও কি শুরু হয়ে গেল করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন?

রিজুয়ানা রিন্তী
২৩ মার্চ ২০২০ ১০:০০ | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২০ ১৯:২৩
ছবি : আমাদের সময়
advertisement

বৈশ্বিক মহামারির দাপট কিছুতেই কমছে না। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগ কোভিড-১৯ আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। জনমিতিবিদ রবার্ট টমাস ম্যালথাসের সূত্র ধরে বাংলাদেশেও সংক্রমিতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৩। এরমধ্যে মারা গেছেন তিনজন। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়ে গেল কি না তা যাচাই করে দেখছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

মিরপুরের টোলারবাগে যে রোগী করোনা আক্রান্ত জানানোর পর মারা গেলেন তিনি কোনো প্রবাসী বা বিদেশির সংস্পর্শে আসেননি। তা হলে তার ক্ষেত্রে সোর্স অব ইনফেকশন কী? সেক্ষেত্রে কি বলা যাবে দেশে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে?

এ প্রশ্নের উত্তরে আইইডিসিআর পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, ‌‘আমরা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলার জন্য আরেকটু সময় নিচ্ছি। আমরা বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছি। যেমন- যে রোগীর কথা বলছেন (টোলারবাগে মৃত রোগী) তার ক্ষেত্রে আমরা তাদের পাশে বিদেশ থেকে এসেছেন এমন দুই ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছি। আমরা তাদের নমুনা সংগ্রহ করেছি। আমরা দেখতে চাই তাদের সংক্রমণ ছিল কিনা, ওই ব্যক্তির করোনা সংক্রমণ এদের কাছ থেকে এসেছে কিনা। তাদের একজনের ক্ষেত্রে আমরা সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করছি। আমরা এক্সটেনসিভভাবে তাদের তথ্য সংগ্রহ করছি। অন্যজনেরও করছি।’

‘প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই আমরা চাই যে সোর্স অব ইনফেকশন কন্টাক্ট আইডেন্টিফাই করতে। কারণ, কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের বিষয়টা হচ্ছে যখন সোর্স অব ইনফেকশন আইডেন্টিফাই করতে পারছি না। সোর্স অব ইনফেকশনটা আইডেন্টিফাই করতে পারলে পরবর্তী সংক্রমণটা প্রতিরোধ করা যাবে। সেজন্য আমরা ১৪ দিন পেছনে গিয়ে তাদের সমস্ত তথ্য নিচ্ছি। এখনো আমাদের সব তথ্য সংগ্রহ শেষ হয়নি। আমরা তথ্য যখন পেয়ে যাবো তখন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে কি-না জানা যাবে।’

কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের বিষয়টা অস্বীকার করা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন আমাদের জন্য একটা পরবর্তী লেভেল, যতক্ষণ না আমরা নিশ্চিত না হবো ততক্ষণ আমরা এটা বলবো না। কারণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে আমাদের রিপোর্টটা দিতে হবে। তথ্য প্রমাণ ছাড়া তাদের রিপোর্ট দিতে পারবো না।’

মিরপুরে মারা যাওয়া ব্যক্তির ছেলে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে দাবি করেন, তার বাবা বিদেশ ফেরত কারও সংস্পর্শে যাননি। তবে তিনি মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন।

তিনি আরও লিখেন, ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে যে আমার ভগ্নিপতি বিদেশ থেকে আমাদের বাসায় এসেছে, যেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমার দুই ভগ্নিপতি, বড় বোন এবং তার স্বামী চিটাগংয়ের দুটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক। অন্য ভগ্নিপতি জাপানে থাকে। সে গত এক বছরের মধ্যে আসেনি।’

এর পরই খবর পাওয়া যায় টোলারবাগের আরেক বাসিন্দা রোববার সন্ধ্যায় মারা গেছেন। সকালে আইইডিসিআর তার নমুনা সংগ্রহ করে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে জানানো হয় তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত।

জানা গেছে, টোলারবাগের যে ব্যক্তি শনিবার রাতে মারা গেছেন, তার সঙ্গে রোববার মারা যাওয়া ব্যক্তির ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারা পাশাপাশি ভবনে থাকতেন এবং একই মসজিদে নামাজ পড়তেন।

টোলারবাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রথম ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া মিরপুরের ডেল্টা হাসপাতালের চিকিৎসক রোববার রাতে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট নিয়ে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি হন। তাকে কুয়েত মৈত্রীর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডেল্টা হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, টোলারবাগ থেকে আসা রোগীকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিয়েছিলেন ওই চিকিৎসক। শনিবার প্রথম তিনি শ্বাসকষ্টের কথা জানান। আইইডিসিআর তার নমুনা সংগ্রহ করেছে। রোববার বিকেল থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করলে তাকে কুয়েত মৈত্রীর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের এক আশ্চর্য তথ্য বের হয়ে আসে চীনা সরকারের একটি গোপন নথিতেও। ওই নথি উদ্ধৃত করে হংকংয়ের সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলছে, চীনে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল নীরব বাহক। তাদের শরীরে করোনায় আক্রান্তের লক্ষণ ছিল না কিংবা অনেক দেরিতে প্রকাশ পেয়েছিল। নীরব বাহকদের সংখ্যা প্রতি তিনজনে একজন হতে পারে।

এই খবর প্রকাশের পর ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে যে দেশগুলো বিভিন্ন কৌশল নিয়ে কাজ করছে, তারা আরও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে গেল। এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৭০৬ জন মানুষ এবং ১৪ হাজার ৭০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানাচ্ছে পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ওয়ার্ল্ডোমিটার’।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীনে গত ফেব্রুয়ারিতে ৪৩ হাজার জনের মধ্যে কতজন নীরব বাহক ছিলেন এবং তাদের কতজনের মধ্যে পরে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু যাদের শরীরে কোভিড-১৯ রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে, তাদের পরীক্ষা করেছে। এই দেশগুলোতে করোনার সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক প্রতিবেদন বলছে, ইতালিতে লক্ষণ প্রকাশ পায়নি, এমন রোগীর সংখ্যা মোট আক্রান্তের ৪৪ শতাংশ।

চীনা বিশেষজ্ঞদের এক যৌথ গবেষণা বলছে- চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও হংকংয়ে নিউমোনিয়ার যে কেসগুলো এসেছিল ২৩ জানুয়ারি উহান লকডাউন হওয়ার আগে, এই কেসগুলোই ছিল সংক্রমণের উৎস। এর হার ছিল ৭৯ শতাংশ। এই রোগীদের লক্ষণ খুব মৃদু ছিল কিংবা কারও কারও কোনো লক্ষণই ছিল না।

এদিকে, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘরের বাইরে বের হলে সবাইকে অবশ্যই মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। সাধারণ মানুষকে চলাচল সীমিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আগে বলতাম, সবার মাস্ক পরার দরকার নেই। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে বাইরে গেলে সবার অবশ্যই মাস্ক পরা প্রয়োজন।’

খুব জরুরি না হলে ঘরের বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন নেই জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, একান্ত যেতেই হলে চলাফেরায় যেন ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা হয়।

রিজুয়ানা রিন্তী : সাংবাদিক

 

advertisement
Evall
advertisement