advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনা যুদ্ধে ঘরে থাকাই আপনাদের দায়িত্ব

জাতির উদ্দেশে ভাষণ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২০ ২৩:১৬
advertisement

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধকে যুদ্ধ আখ্যায়িত করে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দুর্যোগের সময়ই মনুষ্যত্বের পরীক্ষা হয়। এখনই সময় পরস্পরকে সহায়তা করার; মানবতা প্রদর্শনের। বাঙালি বীরের জাতি। নানা দুর্যোগে-সংকটে বাঙালি জাতি সম্মিলিতভাবে সেগুলো মোকাবিলা করেছে। ১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয়ী হয়েছি। করোনা ভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আপনার দায়িত্ব ঘরে থাকা। আমরা সবার প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হব,

ইনশাআল্লাহ। প্রাণঘাতী এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে করোনা প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার ও স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে ভিড় এড়িয়ে ঘরে থাকার আহ্বান জানান। এ ছাড়া, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে জরুরি সহায়তা ঘোষণা এবং নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা জানান।

তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মানুষকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই বিশ্ববাসী এ দুর্যোগ থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পাবে। এ সংকটময় সময়ে আমাদের সহনশীল ও সংবেদনশীল হতে হবে। আমি সবার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু এ সময়ে আমাদের ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। এ ভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উপদেশ আমাদের মেনে চলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজারে কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরের সঙ্গে সরবরাহ চেইন অটুট রয়েছে। কেউ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। অযৌক্তিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করবেন না। জনগণের দুর্ভোগ বাড়াবেন না। সর্বত্র বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেউ গুজব ছড়াবেন না। গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি আপনারা এক ধরনের আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। যাদের আত্মীয়স্বজন বিদেশে রয়েছেন, তারাও তাদের নিকটজনদের জন্য উদ্বিগ্ন রয়েছেন। আজ সমগ্র বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে। তবে যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের সরকার প্রস্তুত রয়েছে। আমরা জনগণের সরকার। সব সময়ই আমরা জনগণের পাশে আছি। আমি নিজে সর্বক্ষণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।

নিম্ন-আয়ের মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নিম্ন-আয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে ফেরা কর্মসূচির’ আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। একইভাবে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছি। এ তহবিলের অর্থ দিয়ে কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে। রপ্তানি আয় আদায়ের সময়সীমা ২ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। একইভাবে আমদানি ব্যয় মেটানোর সময়সীমা ৪ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। মোবাইলে ব্যাংকিংয়ে আর্থিক লেনদেনের সীমা বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস বিল পরিশোধের সময়সীমা সারচার্জ বা জরিমানা ছাড়া জুন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এনজিওগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের যতদূর সম্ভব ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত দেশ থেকে ফিরেছেন, সেসব প্রবাসী ভাইবোনদের কাছে অনুরোধ- আপনাদের হোম কোয়ারেন্টিনের যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলুন। মাত্র ১৪ দিন আলাদা থাকুন। আপনার পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী, এলাকাবাসী ও সর্বোপরি দেশের মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এসব নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন। এ সময় স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, করমর্দন বা কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন। অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাবেন না। মুসলমান ভাইয়েরা ঘরেই নামাজ আদায় করুন এবং অন্যান্য ধর্মের ভাইবোনদেরও ঘরে বসে প্রার্থনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এ ব্যাপারে বিভ্রান্ত হবেন না। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত ১৩ হাজার পরীক্ষা কিট মজুদ ছিল। আরও ৩০ হাজার কিট শিগগিরই আসছে। ঢাকায় ৮টি পরীক্ষার যন্ত্র রয়েছে। অন্য ৭ বিভাগে পরীক্ষাগার স্থাপনের কাজ চলছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ ৫০০ চিকিৎসকের তালিকা তৈরি করেছে, যারা জনগণকে সেবা দেবেন।

শেখ হাসিনা বলেন, জানুয়ারি থেকেই সংক্রমণ প্রতিরোধে আমরা ব্যাপক কর্মসূচি ও প্রস্তুতি নিয়েছি। এটি প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ ও দিকনির্দেশনা প্রদানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় কমিটি করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও কমিটি হয়েছে। ঢাকায় ৬টি হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আরও ৩টি হাসপাতাল প্রস্তুত হচ্ছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় পৃথক শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকায় ১০ হাজার ৫০টিসহ সারাদেশে ১৪ হাজার ৫৬৫টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সারাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জন্য ২৯০টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এতে ১৬ হাজার ৭৪১ জনকে সেবা দেওয়া যাবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৯ মার্চ থেকে বিদেশ ফেরত সব যাত্রীর সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বিমানবন্দর থেকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ঢাকার আশকোনা হাজী ক্যাম্প এবং টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান কোয়ারেন্টিন সেন্টার হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশ থেকে যারা আসছেন, তাদের তালিকা ঠিকানাসহ জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন তাদের হোম কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করছে।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ রোগের প্রাদুর্ভাব রোধে আঞ্চলিকভাবে সম্মিলিত প্রয়াস গ্রহণের জন্য আমি সার্কভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই। সার্কভুক্ত দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলো প্রস্তাবিত সুপারিশমালা বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করছে। আমরা একটি যৌথ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে বাংলাদেশ ১৫ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে এবারের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ভিন্নভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জনসমাগম হয় এমন ধরনের সব অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনসহ সব জেলায় শিশু সমাবেশ ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই কারণে আমরা মুজিববর্ষের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জনসমাগম না করে টেলিভিশনের মাধ্যমে সম্প্রচার করেছি।

advertisement
Evall
advertisement