advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

২৫ মাস কারাভোগের পর ৬ মাসের জন্য মুক্ত
ফিরোজায় ফিরলেন খালেদা

সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত বিএনপির ওবায়দুল কাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২০ ২৩:৫৫
advertisement

বিশ্বব্যাপী এখন আলোচনার অন্যতম বিষয় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ। বাংলাদেশের সর্বত্রও গত কয়েকদিন ধরে প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল এটি। কিন্তু গতকাল প্রাণঘাতী এ মহামারীর বিষয়টি উজিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তি। দুর্নীতির দুই মামলায় ২৫ মাস সাজা ভোগের পর শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের মুক্তি পেয়ে গতকাল গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’য় ফিরেছেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪০১-এর উপধারা ১ অনুযায়ী বয়স বিবেচনায় মানবিক কারণে সরকারের নির্বাহী আদেশে দ- স্থগিতের পর গতকাল বুধবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল থেকে মুক্তি পান খালেদা জিয়া।
বিকাল সোয়া চারটার দিকে বিএসএমএমইউ থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর ভিড় আর সেøাগানের মধ্য দিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা হয় খালেদা জিয়ার গাড়িবহর। এ সময় হাজার হাজার নেতাকর্মীর ভিড় ঠেলে বহরের পথ করে দিতে নিরাপত্তাকর্মীদের দারুণ বেগ পোহাতে দেখা যায়। ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার সিলভার রঙের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসেন। পেছনের আসনে বসেন খালেদা জিয়া। তার পাশে বসেন শামীম ইস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতিমা। খালেদা জিয়ার পরনে ছিল গোলাপি শাড়ি ও স্কার্ফ; ম্ুেখ সার্জিক্যাল মাস্ক, চোখে চকলেট রঙের সানগ্লাস। অন্য একটি গাড়িতে চড়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বাসায় ফেরেন কারাবন্দি থাকাকালীন তার সঙ্গী গৃহকর্মী ফাতেমা বেগম। রওনা হওয়ার এক ঘণ্টা পর খালেদা জিয়াকে বহন করা গাড়িটি গুলশানের বাসায় প্রবেশ
করে।
বিকাল তিনটার দিকে কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদেশ পাওয়ার পর বিএসএমএমইউর কেবিন ব্লকের ছয়তলার ৬২১ ও ৬২২ নং কক্ষে পাহারারত কারারক্ষীদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এর পর আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্ত হন খালেদা জিয়া। বাসার সামনে পৌঁছার পর পরই করোনা সংক্রমণের শঙ্কায় দলীয় হাইকমান্ডের বারণ সত্ত্বেও বিএনপির শতশত নেতাকর্মী সড়কের দুপাশে দাঁড়িয়ে সেøাগান দিয়ে খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানান। সেজ বোন ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর ওপর ভর করে বিএনপিনেত্রী গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে বসে বাসায় প্রবেশ করেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপির দুই মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
গুলশানের বাসায় গাড়িটি পৌঁছার পর সেজ বোন সেলিনা ইসলাম, তার স্বামী রফিকুল ইসলাম, প্রয়াত সাঈদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন এস্কান্দার, তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান বিন্দুসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে পুষ্পস্তবক দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
এর পর লন্ডনে অবস্থানরত ছেলে তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান ও নাতনি জাইমা রহমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন খালেদা জিয়া। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বলে খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ একজন জানান। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। পরিবারের সদস্য এবং সিনিয়র কিছু নেতা ছাড়া কাউকে বাসায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আপাতত তিনি নিজ বাসায় থাকবেন।
এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির খবরে বিএনপি নেতাকর্মীরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, খালেদা জিয়া তার আপসহীন মনোভাব অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তাকে যে এতদিন অন্যায়ভাবে কারাগারে আটকে রেখেছিল সরকার, তা-ও প্রমাণিত হয়েছে।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যাপারে তার চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল। এর আগে, বেলা ১১টার দিকে খালেদা জিয়ার ফেরা উপলক্ষে ফিরোজার প্রস্তুতি দেখতে যান বিএনপি মহাসচিব।
গত মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, মানবিক দিক বিবেচনায় সরকার দুই শর্তে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শর্ত দুটি হচ্ছেÑ খালেদা জিয়া বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশ যেতে পারবেন না। এর পর বিএনপি নেত্রীর দ-ের কার্যকারিতা স্থগিত করে মুক্তির আদেশের নথি সেদিনই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করে গতকাল গণভবনে পাঠায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল নিজেও সকালে গণভবনে যান। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর নথি ফিরে যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় তখন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে কারাগারে পাঠায়। এর পর খালেদা জিয়ার মুক্তির লিখিত বার্তাসহ কারাগারের এক কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান। বিকাল তিনটার দিকে কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অর্ডার পাওয়ার পর কারারক্ষীদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
আনুষ্ঠানিক এই মুক্তির পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা এবং খালেদা জিয়ার পরিবারের কয়েকজন সদস্য তার কেবিনে যান। কেবিন ব্লকে খালেদার মুক্তির অনুষ্ঠানিকতা শেষে নতুন একটি হুইলচেয়ার নিয়ে যাওয়া হয় ছয়তলার ৬২১ নম্বর কক্ষে। সূত্র জানায়, মুক্তি দেওয়ার আগে খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর একটি কপি খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদেরও দেওয়া হয়। বিকাল চারটা ১৫ মিনিটে প্রিজন সেল থেকে খালেদা জিয়া হুইলচেয়ারে জনসম্মুখে এলে উপস্থিত নেতাকর্মীরা সেøাগান দিতে শুরু করেন।
করোনা সংক্রমণের শঙ্কায় জমায়েত না করার বিষয়ে বারবার দলীয় হুশিয়ারির পরও বিএনপি নেতাকর্মীরা হাসপাতালে ভিড় করলে পরিস্থিতি কিছুটা বেসামাল হয়ে পড়ে। পুলিশ ও বিএনপি মহাসচিবকে হ্যান্ডমাইকে বারবার নেতাকর্মীদের হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করার অনুরোধ জানালেও ভিড় এতটুকু কমেনি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির সিনিয়র নেতারাও। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, যারা চেয়ারপারসনকে দেখার অজুহাতে হাসপাতাল ও বাসার সামনে ভিড় করেছেন, তারা তার ভালো চান কি না, এ নিয়ে সন্দেহ আছে।
খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সামনে ও পেছনে অসংখ্য নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণে গাড়ি ধীরগতিতে চলতে হয়। কারওয়ানবাজারে এলে আশপাশের নেতাকর্মীরা বহরে যুক্ত হন। এ সময় নেতাকর্মীদের ভিড় সামলাতে পুলিশ মারমুখী হয়ে ওঠে। ফার্মগেট, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকাসহ কয়েকটি জায়গায় নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে মৃদু লাঠিচার্জ করে পুলিশ। বিজয় সরণি এসে গাড়িবহরে থাকা মোটরসাইকেলকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। রাস্তা ফাঁকা থাকলেও শাহবাগ থেকে গুলশানের বাসায় পৌঁছতে একঘণ্টা সময় লাগে।
এদিকে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম গতকাল সাংবাদিকদের জানান, যে দুটি শর্তে খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়েছেন, সেসব শর্ত ভঙ্গ করলে তার মুক্তির সিদ্ধান্তও বাতিল হয়ে যাবে।
খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ- স্থগিত করে মুক্তি দিয়েছেন। বিএনপির কাছে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিতের উদ্যোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন; উদারনৈতিক মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদ- নিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি আছেন খালেদা জিয়া। প্রথমে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও গত বছর ১ এপ্রিল থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে গুলশান-২ নম্বরে ৭৯ নং রোডের ১ নম্বর বাড়িতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’ আগেই ধোয়ামোছা করা হয়েছে। আনা হয় ফুলের টব। সকালে চালডাল, কাঁচাবাজারও আনা হয়। বেলা ৩টার দিকে শামীম ইস্কান্দার তার বাসা থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে আসেন। তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা ছিলেন তারাও সকালেই বাসায় আসেন। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে গত দুবছর এ রকম খালিই ছিল ফিরোজা।
কিছুদিন কোয়ারেন্টিনে থাকবেন বিএনপিনেত্রী : করোনা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এখন কিছুদিন কোয়ারেন্টিনে থাকবেন খালেদা জিয়া। রাতে ফিরোজায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলীয় প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর বিএনপি মহাসচিব এ কথা জানান। তিনি বলেন, আমরা শুধু ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। তিনি খুব অসুস্থ। চিকিৎসকেরা তাকে দেখছেন। তার চিকিৎসার ব্যাপারটা নিশ্চিত করার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে এবং কিছুদিন অন্তত ম্যাডামকে যেন কোয়ারেন্টিনে রাখা হয় অর্থাৎ অন্য কেউ যেন দেখা-সাক্ষাৎ না করে সেসব বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি।
তিনি বলেন, এ সময়ে আমরা রাজনৈতিক কোনো আলোচনা করিনি। স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ তারা তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, শুকরিয়া আদায় করেছেন যে, তিনি ফিরে এসেছেন বাসায়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আপনারা দেখেছেন যে, চেয়ারপারসন অত্যন্ত অসুস্থ। তার পরও তিনি দলের সব নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং সবাইকে ভালো থাকতে বলেছেন। তিনি নেতাকর্মীদের কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলেছেন এবং ভয়াবহ এ মহামারীতে আমরা সবাই যেন সচেতন থাকি, সে আহ্বান জানিয়েছেন। কদিন কোয়ারেন্টিনে থাকবেন খালেদা জিয়া? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটা চিকিৎসকেরা নির্ধারণ করবেন।

advertisement
Evall
advertisement