advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা

তোফায়েল আহমেদ
২৬ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০ ০৭:৪২
advertisement

আগামী বছর পালিত হবে মহান স্বাধীনতা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী। এ বছর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ তথা ‘মুজিববর্ষ’ দেশব্যাপী সগৌরবে পালিত হচ্ছে। এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে ‘করোনা ভাইরাস’-এর প্রাদুর্ভাব! ফলত, ‘মুজিববর্ষ’ ও ‘স্বাধীনতা দিবস’-এর বহু অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে।

‘করোনা ভাইরাস’ বিশ্বজুড়ে মহামারী আকার ধারণ করে মানবসভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এমনই এক ভয়াবহ বিপর্যয় আর নির্বিচার গণহত্যার কবলে আমরা পড়েছিলাম ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ। তখন দৃশ্যমান ঘাতকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাঙালি জাতি ছিল ঐক্যবদ্ধ; আজ দৃশ্যমান নয়, এমন নীরব এক ঘাতক ‘করোনা ভাইরাস’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গোটা মানবজাতি ঐক্যবদ্ধ। শত্রুকে পরাস্ত করতে ঐক্যের বিকল্প নেই।

একাত্তরের ২৫ মার্চ দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সাবেক বাঙালি সৈনিকদের সঙ্গে বৈঠকে কর্নেল ওসমানী সাহেব বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ডু ইউ থিংক দ্যাট টুমরো উইল বি এ ক্রুসিয়াল ডে?’ বঙ্গবন্ধু জবাবে বলেন, ‘নো, আই থিংক, ইট উইল বি টোয়েন্টি ফিফথ।’ তখন ওসমানী সাহেব পুনরায় প্রশ্ন করেন, ‘কাল তো ২৩ মার্চ। পাকিস্তান দিবস। সে উপলক্ষে ওরা কী কিছু করতে চাইবে না?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ওরা যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো কিছু করতে পারে। তার জন্য কোনো দিবসের প্রয়োজন হয় না।’ নিখুঁত হিসাব করেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ২৫ মার্চেই পাকিস্তানিরা ক্র্যাকডাউন করবে।

২৫ মার্চ রাতে মণি ভাই (শেখ ফজলুল হক মণি) ও আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিই। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন যাচ্ছি, তখন রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড। সেগুনবাগিচার একটি প্রেসে মণি ভাই লিফলেট ছাপতে দিয়েছিলেন। সেগুনবাগিচা থেকে হেঁটে মণি ভাইয়ের আরামবাগের বাসায় যাই। রাত ১২টায় জিরো আওয়ারে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পূর্বপরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী শুরু করে বাঙালি নিধনে গণহত্যা, যা অখ- পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবিকে সশস্ত্রপন্থায় নিশ্চিহ্ন করতেই এই গণহত্যা।

চারদিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ ছাপিয়ে আমার কানে তখন বাজছে বিদায় বেলায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, ‘তোমাদের যে দায়িত্ব আমি দিয়েছি, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করো। আমার জন্য ভেবো না। আমি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, আমার স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। ওরা অত্যাচার করবে, নির্যাতন করবে। কিন্তু আমার বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলার মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। যুদ্ধ শুরু হলে আমরা কোথায় যাব কী করব সে ব্যাপারে করণীয় নির্দেশ করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘প্রস্তুত থেকো’; ১৮ ফেব্রুয়ারি ঠিকানা মুখস্থ করিয়েছিলেন, ‘সানি ভিলা, ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।’ এখানেই তিনি আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।

একাত্তরের ২৬ মার্চ ছিল শুক্রবার। রাতে মণি ভাইয়ের বাসায় ছিলাম। সেখানেই শুনলাম বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সকালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগেই আমার উচিত ছিল শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা কয়েকটি শর্ত দিয়ে সে আমাকে ট্র্যাপে ফেলতে চেয়েছিল। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সে আক্রমণ করেছে, এই অপরাধ বিনা শাস্তিতে যেতে দেওয়া হবে না।’

২৭ মার্চ ২ ঘণ্টার জন্য কারফিউ প্রত্যাহৃত হলে, আমরা গুলিস্তান দিয়ে নবাবপুর রোড ধরে সদরঘাট গিয়ে কেরানীগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করি। পেছনে পড়ে থাকে ধ্বংস আর মৃত্যু উপত্যকাসম রক্তাক্ত ঢাকা নগরী। যাওয়ার সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দফায় দফায় প্রচারিত এমএ হান্নান সাহেবের ভাষণ শুনি, ‘কে বলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? তিনি আমাদের মধ্যেই আছেন।’ সকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে হান্নান সাহেব এবং অন্য নেতারা বিরামহীনভাবে ঘোষণা দিতে থাকেন, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে আমাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।’ কেরানীগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা বোরহানউদ্দিন গগনের, যিনি পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, বাড়িতে আশ্রয় নিই। কেরানীগঞ্জে দুই রাত থাকার পর ২৯ মার্চ আমি, মণি ভাই, জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান সাহেব এবং আমাদের বন্ধু ’৭০-এ নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ডা. আবু হেনাসহ, যিনি অসহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে কলকাতা গিয়েছিলেন এবং এসেছিলেন, সেই পথে- আমরা প্রথমে দোহার-নবাবগঞ্জ, পরে মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সারিয়াকান্দি, বগুড়া হয়ে বালুরঘাট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে ৪ এপ্রিল ‘সানি ভিলা’য় আশ্রয় গ্রহণ করি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এটিই ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট, সংক্ষেপে বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনীর আশ্রয়স্থল। উল্লেখ্য, সারা বাংলাদেশকে চারটি বৃহৎ অঞ্চলে বিভক্ত করে রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সংগঠিত ছিল মুজিব বাহিনী। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রধান সেনাপতি আতাউল গণী ওসমানীর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর (এফএফ) সঙ্গে একত্রে যুদ্ধ করে শত্রু বাহিনীকে মোকাবিলা করাই ছিল মূলত মুজিব বাহিনীর কাজ।

মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান শ্রদ্ধেয় নেতা শেখ ফজলুল হক মণি ভাইয়ের দায়িত্বে ছিল তৎকালীন চট্টগ্রাম ডিভিশন ও বৃহত্তর ঢাকা জেলা; রাজশাহী বিভাগ (পাবনা ও সিরাজগঞ্জ বাদে) ও উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান; আবদুর রাজ্জাকের দায়িত্বে ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ এক বিরাট অঞ্চলের আর আমার দায়িত্বে ছিল পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা।

মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং হতো দেরাদুনে। দেরাদুনে ট্রেনিং শেষে আমার সেক্টরের যারা তাদের প্লেনে করে ব্যারাকপুর ক্যাম্পে নিয়ে আসতাম। মুজিব বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে প্রবেশের আগে বুকে টেনে, কপালে চুম্বন করে বিদায় জানাতাম। মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে বক্তৃতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মুজিবকে উদ্দেশ করে আমরা বলতাম, ‘প্রিয় নেতা, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ জানি না! যতদিন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে হানাদার মুক্ত করতে না পারব, ততদিন আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’

অসহযোগ আন্দোলন আর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়ে গণহত্যার দিকে এগিয়ে যায় পাকিস্তান সামরিক জান্তা। গণহত্যা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, “যখন প্রথম গুলিটি বর্ষিত হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তান রেডিওর সরকারি তরঙ্গের কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে ক্ষীণস্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ওই কণ্ঠের বাণী মনে হলো আগেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।”

স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তিনি আরও লিখেছেন, “ঘোষণায় বলা হয়, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে’।”

প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছতে বঙ্গবন্ধুকে দীর্ঘ ২৪টি বছর ধাপে ধাপে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে, জেল-জুলুম-হুলিয়া, ফাঁসির মঞ্চ উপেক্ষা করে মৃত্যুঞ্জয়ী শক্তি নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়েছে। একদিনে হয়নি। বহু বছর ধরে, অগণিত মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণাকে শিরোধার্য করেছে।

স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তুতিপর্বের শুরুটা হয়েছিল মূলত ছয় দফা দেওয়ার মধ্য দিয়েই। ছয় দফাই ছিল স্বাধীনতার বীজমন্ত্র। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু সত্তরের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও সব রাজবন্দির মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি যেদিন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির জনককে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়, সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘সংখ্যা সাম্য নয়, জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব চাই, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার চাই আর সার্বভৌম পার্লামেন্ট চাই।’

গোলটেবিল বৈঠকের পর ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন। যখন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নেন, তখন বঙ্গবন্ধু উত্থাপিত দাবিগুলো মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২ অনুযায়ী ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ বা সংক্ষেপে এলএফও জারি করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এই এলএফওতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব মেনে নেওয়া হয়। ফলে জাতীয় পরিষদে ৩১৩টি আসনের মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাতে আমরা পেলাম ১৬৯টি।

কিন্তু ইয়াহিয়া খান ভবিষ্যতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও যাতে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে না পারেন, সে জন্য এলএফওতে বিতর্কিত ২৫ ও ২৭ নম্বর দুটি অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করেন। এলএফওতে সন্নিবেশিত দুটি ধারাই ছিল আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী দলকে ঠেকানোর অপপ্রয়াস। বস্তুত এলএফও ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য খুবই বিরক্তিকর এবং তিনি দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বলতেন, ‘নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি এলএফও টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলব।’

পাকিস্তান সামরিক চক্রের যে কোনো চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রতিটি জনসভাতেই বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘২২ বছরের পুরনো ক্ষমতাসীন চক্রের জানা উচিত তারা আগুন নিয়ে খেলছেন।’ সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আমাকে জাতীয় পরিষদে মনোনয়ন দেন। ভোলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ৭ ডিসেম্বরের পরিবর্তে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৭ জানুয়ারি। সারাদেশে নির্বাচনী সফরে বঙ্গবন্ধু আমাকে সফরসঙ্গী করেন।

নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিতে প্রতিটি সভায় তিনি বলতেন, ‘এ নির্বাচন বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফা ও ১১ দফার পক্ষে গণভোট। আপনাদের অধিকার আদায়ের জন্য আমি যদি আমার জীবনের যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে পারি। ফাঁসির মঞ্চে যেতে পারি। তবে কি আমি আপনাদের কাছে আমার ছয় দফার পক্ষে একটি ভোট চাইতে পারি না!’ মানুষ দুহাত তুলে তাকে সমর্থন জানাত।

বেতার ও টেলিভিশনে নির্বাচনী ভাষণে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচি, যে কর্মসূচি ১১ দফা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সে কর্মসূচি আঞ্চলিক অন্যায়-অবিচারের বাস্তব সমাধানের পথনির্দেশ করেছে। আগামী নির্বাচনে জাতীয় মৌলিক সমস্যাগুলো, বিশেষ করে ছয় দফার ভিত্তিতে আমরা গ্রহণ করেছি।’ এভাবেই বাংলাসহ সারাবিশ্বের কাছে সত্তরের নির্বাচনকে ছয় দফার রেফারেন্ডামে পরিণত করে নির্বাচনী অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।

একাত্তরের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠান। শপথ গ্রহণ করান স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। সেদিন বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘ছয় দফা ও ১১ দফা আজ আমার নয়, আমার দলেরও নয়। এ আজ বাংলার জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে বাংলার মানুষ তাকে জ্যান্ত কবর দেবে। এমনকি আমি যদি করি আমাকেও।’

সেদিন বক্তৃতায় আরও বলেছিলেন, ‘আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের কাছে দেনা হয়তো আবারও রক্তেই পরিশোধ করতে হবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে নস্যাৎ করার জন্য চক্রান্ত চলছে, এর বিরুদ্ধে আসন্ন সংগ্রামের জন্য সবাই প্রস্তুত থাকবেন।’ চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য বঙ্গবন্ধু সদা সচেতন ছিলেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান একাত্তরের ১১ জানুয়ারি ঢাকা এসে ১২ ও ১৩ জানুয়ারি দুদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দুই দফা আলোচনায় মিলিত হন।

একাত্তরের শহীদ দিবস ছিল সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এদিন মধ্যরাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই বাংলার স্বাধিকার, বাংলার ন্যায্য দাবিকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র চলছে। এখনো চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে। কিন্তু বাংলার সাত কোটি মানুষ আর বঞ্চিত হতে রাজি নয়। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেব। আর শহীদ নয়, এবার গাজী হয়ে ঘরে ফিরব। বাংলার ঘরে ঘরে আজ দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে হবে আমাদের সংগ্রাম। মানুষ জন্ম নেয় মৃত্যুর জন্য; আমি আপনাদের কাছে বলছি এই বাংলার মানুষ রক্ত দিয়ে আমাকে আগরতলা মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছে, আমিও আপনাদের জন্য নিজের রক্ত দিতে দ্বিধা করব না। বাংলার সম্পদ আর লুট হতে দিব না।’

২৮ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের আহ্বান জানান। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের নীলনকশা অনুযায়ী বাংলার মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে অবশেষে ১ মার্চ বেলা ১টা ৫ মিনিটে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত করেন।

জেনারেল ইয়াহিয়া খানের পূর্বপ্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বক্তব্যে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা নগরী। এদিন হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় ছয় দফাভিত্তিক শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নের কাজ চলছিল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় বিক্ষুব্ধ মানুষ হোটেল পূর্বাণীর সামনে সমবেত হয়ে সেøাগানে সেøাগানে চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে।

বঙ্গবন্ধু হোটেলের সামনে এসে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অধিবেশন বন্ধ করার ঘোষণায় সারাদেশের জনগণ ক্ষুব্ধ। আমি মর্মাহত। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আমি সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত এসেছি। সংগ্রাম করেই মুক্তি আনব। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন।’

বেলা ৩টায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে প্রতিবাদ সভা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পল্টন ময়দানের স্বতঃসস্ফূর্ত জনসভায় জনসমুদ্রের উদ্দেশে বলি, ‘আর ছয় দফা ও ১১ দফা নয়। এবার বাংলার মানুষ এক দফার সংগ্রাম শুরু করবে। আর এই এক দফা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আজ আমরাও শপথ নিলাম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ সুশৃঙ্খল সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’ প্রতিবাদ সভায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাই। সারা জাতিসহ গোটা বিশ্ব তখন জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়ে।

বঙ্গবন্ধু ছয় দফা না দিলে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা হতো না; এই মামলা না হলে ১১ দফার ভিত্তিতে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান হতো না; ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান না হলে ‘এক মাথা এক ভোট’-এর ভিত্তিতে সত্তরের নির্বাচন হতো না; আর সত্তরের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কিছুই হতো না, কিছুই সম্ভব ছিল না। অনেকেই সেদিন নির্বাচনের বিরোধিতা করে ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো’ বলে সেøাগান তুলেছিলেন, ‘ভোটের আগে ভাত চাই’। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল গগনচুম্বী। তিনি সর্বস্তরের জনসাধারণের কাছে আহ্বান রেখেছিলেন এই নির্বাচনকে রেফারেন্ডামে পরিণত করতে। বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সত্তরের নির্বাচনকে গণভোটে পরিণত করেছিল।

বাংলার মানুষের অধিকার বিসর্জন দিয়ে বঙ্গবন্ধু কখনই ভাবেননি তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। বিশ^খ্যাত ৭ মার্চের ঐতিহাসিক বক্তৃতায় সে কথা স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না; আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ একাত্তরের ১৭ মার্চ ৫২তম জন্মদিনে পরিষ্কার অক্ষরে বলেছিলেন, ‘আমার জীবন আমি জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছি।’ সত্যিকার অর্থেই বঙ্গবন্ধুর জীবন জনগণের জন্য উৎসর্গিত ছিল এবং জীবন দিয়েই তিনি তা প্রমাণ করেছেন। সব সময় লক্ষ করেছি, বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর অনমনীয় মনোভাব। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতেন। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়ার আগে গণহত্যা শুরুর প্রাক্কালে জীবনানন্দ দাশের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়...’।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর চার লক্ষাধিক মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর, বিশ^ জনমতের চাপে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যেদিন বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলার মাটিতে ইতিহাসের মহানায়কের বেশে প্রত্যাবর্তন করেন, সেদিন আমাদের স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করে।

তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

advertisement
Evall
advertisement