advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

স্বাধীনতার দিনে কোন কথাটি আজকে বলব

মোহীত উল আলম
২৬ মার্চ ২০২০ ১৩:১৩ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০ ১৩:১৬
অধ্যাপক ড. মোহীত উল আলম
advertisement

ইংরেজি সাল, ২০২০। বছরটা শুরু হতেই কৌতুকপ্রবণ লোকরা লিখতে শুরু করে দিয়েছিলেন বিশ বিশ নয়, কিন্তু বিশে বিষ। তালুব্য শ এবং মূর্ধণ্য শয়ের তফাৎ। প্রথম সংখ্যাটিতে বোঝায় নিছক নিরপেক্ষ ক্ষতিবিহীন একটা সংখ্যা, কিন্তু দ্বিতীয়টিতে বোঝায় প্রাণহরণের মাধ্যম। সে মাধ্যমটিই যেন হয়ে এসেছে কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস নামের বিষয়টি। পৃথিবীব্যাপী এ রকম বিষ ছড়িয়ে পড়তে মানব ইতিহাসে আর দেখা যায়নি।

মধ্যযুগে চতুর্দশ শতাব্দীতে প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথের ফলে মারা গিয়েছিল ২ কোটি লোক, কিন্তু সে মহামারির পরিব্যাপ্তি ছিল শুধু ইউরোপে। ১৯১৮ সালের মহামারি স্প্যানিশ ফ্লুতে ৫ কোটি লোক মারা গেলেও সেটিরও অধিকৃত অঞ্চল ছিল ইউরোপ এবং আমেরিকা। কিন্তু এই করোনাভাইরাসটি যেন গ্রিক মিথোলজির দানবগুলোর চেয়েও ভয়ংকর। আর কী জেট স্পিড তার। সমুদ্র মানে না, পর্বত মানে না।

চীনের উহান থেকে ভ্রমণ শুরু করে ইরানে একটা লাফ দিয়ে পৌঁছে গেল ইতালিতে, সেখান থেকে আটলান্টিক পার হয়ে চলে গেল আমেরিকায়, আবার অক্টোপাসের মতো একটা পা ঢুকিয়ে দিল এই আমাদের বাংলাদেশে। আর ঠিক তখনই পা’টা ঢুকল যখন আমরা আমাদের পরম আরাধ্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছিলাম ইতিহাসের একটি স্মরণীয় উৎসব হিসেবে। করোনা সেটি ভেস্তে দিল, এবার দিল ৪৯তম স্বাধীনতা দিবসটাকেও। এর মধ্যে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সব ধরনের সমাবেশ স্থগিত করেছে সরকার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব সমানে বন্ধ, তা হলে তো আর স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন হলো না।

কিন্তু বাইরের উদযাপন ছাড়াও তো স্বাধীনতা দিবসের মাহাত্ম্য অনুভব করার আরও উপায় আছে। পত্রপত্রিকাগুলো বা রেডিও-টিভি বা গৃহান্তরীণ জীবনযাপনের মধ্যেও তো স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা যায়, যদি না এর মধ্যে কোভিড-১৯ বাগড়া দেয়।

স্বাধীনতার মূল মন্ত্র হচ্ছে কোনো কিছুকে না মানা নয়, স্বাধীনতার মূল মন্ত্র হচ্ছে নিজের প্রতি কী দায়িত্ব এবং সমাজের জন্য নিজের কী দায়িত্ব সেগুলো উপলব্ধি করার স্বাধীন চিত্ততা। আবেগ এবং যুক্তির মধ্যে সমন্বয় আনার যে প্রশিক্ষণ সেটি রপ্ত করাই স্বাধীনতার মৌল অঙ্গীকার। ধর্মে-বলে সৃষ্টিকর্তা মানুষকে নানা পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেখেন মানুষ সে পরীক্ষায় পাস করতে পারছে কিনা। এই স্বাধীনতা দিবসে আমার মনে হয় আমাদেরও এই দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত যে, করোনাভাইরাসকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে এর বিরুদ্ধে আমাদের জয়ী হওয়ার রাস্তা বের করতে হবে।

করোনাভাইরাসের সূত্রে বাংলাদেশের যে জগৎটি সবচেয়ে বেশি ন্যাংটো হয়ে গেছে সেটি হচ্ছে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা। অথচ বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে এই অঞ্চলটিই হওয়া উচিত ছিল প্রাগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এখন যখন করোনার আক্রমণ এসেছে, তখন দেখা যাচ্ছে- জনৈক চিকিৎসকের ভিডিও বার্তা মতে- বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা হচ্ছে ঢাল নেই, তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মতো। ডাক্তার সাহেব খুব যৌক্তিকভাবে বললেন যে, করোনার মতো সুপার স্প্রেডার ভাইরাসের সঙ্গে উপযুক্ত বর্ম ছাড়া যুদ্ধে নামা হচ্ছে প্রতিপক্ষের সামনে ট্যাঙ্ক, রাইফেল ছাড়া সেনাবাহিনী পাঠানো।

আবার যারা চিকিৎসক সাহেবের সঙ্গে একমত নয় তারা কেউ কেউ ফেসবুকে বললেন, যখন চীন, ফ্রান্স আর আমেরিকার গবেষণাগারে তাদের ডাক্তাররা কোভিড-১৯-এর অ্যান্টিবডি সম্পন্ন ইনজেকশন আবিষ্কার করার দ্বারপ্রান্তে তখন আমাদের চিকিৎসকরা ল্যাবে হাত ধোয়ার ডিজ ইনফেকট্যান্ট আবিষ্কার করে আনন্দের ঢেঁকুর তুলছেন।

বস্তুত, গত ২২ মার্চ আমার মেসেঞ্জারে প্রাপ্ত একটি ভিডিওর মাধ্যমে জানলাম ফ্রান্স, আমেরিকা, চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশ করোনার প্রতিষেধক বের করে ফেলেছে। ফ্রান্সের চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে যে ওষুধ সেখানে ব্যবহার করা হতো, সেটি করোনা আক্রান্ত রোগীর দেহে ফুটিয়ে দিয়ে তারা সাফল্য ১০০% পেয়েছে। জাপান থেকে বারবার খবর আসছিল যে জাপানিজ ফ্লুর বিপক্ষে যে ওষুধ তারা ব্যবহার করে সেটি করোনার রোগীর ওপরও প্রয়োগ করে সফলতা পাওয়া গেছে।

আমেরিকা থেকে খবর এসেছে, আমেরিকান চিকিৎসকরা একটি প্রতিষেধক বের করতে পেরেছে, যেটি সহসা প্যাটেন্টেড হওয়ার ঘোষণা আসবে। আর চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে ভারতীয় চিকিৎসকরা দাবি করছেন, তাদের কাছে আসা বেশির ভাগ রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছে। আশা করা যায়, করোনাভাইরাস অতি শিগগিরই পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেবে, কিন্তু সব রাষ্ট্রকে শিখিয়ে যাবে মানবকল্যাণে কী কী করা উচিত এবং কী কী করা উচিত নয়।

আমেরিকা, রাশিয়া, চীন বা ভারত বা পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার অস্ত্র কী কাজে এলো আজকে যে করোনাভাইরাসের মতো, ট্রাম্পের ভাষায়, অদৃশ্য শত্রুকে তারা মোকাবিলা করতে পারল না! করোনাভাইরাস বিশ্বকে শিখিয়ে যাচ্ছে যে, মানুষের জীবন পদ্মপাতায় জলের চেয়েও ঠুনকো।
এখানে একটা কথা নিয়ে আসি, যে কথাটা হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষণটি যেন করোনাভাইরাস উপস্থিত করে দিল। সেটি হলো বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলার ঠিক আগে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’।

শ্রদ্ধেয় মনীষী সরদার ফজলুল করিম এই ভাষণের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, ‘স্বাধীনতার সংগ্রামের’ ঘোষণার চেয়েও ‘মুক্তির সংগ্রামের’ অর্থটি ব্যাপক। আসলে তো তাই। স্বাধীনতার প্রশ্নটি আমরা একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ফয়সালা করেছি, কিন্তু মুক্তির প্রশ্নটি প্রতিষ্ঠিত করতে স্বাধীনতার যুদ্ধের সমান কতটি যে যুদ্ধ করতে হবে করোনাভাইরাস যেন সেটিই শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রটি যদি একটি দুর্বল দিক হয়ে থাকে তবে করোনাভাইরাসের আরেকটি শিক্ষা হলো রাষ্ট্রীয় সমাজ চলে মেধাযুক্ত যুক্তি ও নিরেট অঙ্কের তথ্য দিয়ে; একটি রাষ্ট্রীয় সমাজ কখনো বাগাড়ম্বরের ঢোলে চলতে পারে না। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির চর্চায় বাগাড়ম্বরতা অসহ্য নয়, অশালীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাগাড়ম্বরতার একটি ভিত্তি হলো হাফ-ট্রুথ বা অর্ধসত্য বলা, বা বাকি অংশটা উহ্য রাখা। এই অর্ধসত্যনির্ভর বাগাড়ম্বরতা বা ইকুইভোকেশনের সবচেয়ে অপচয়িত ক্ষেত্রটি হচ্ছে এখন নির্বাচন কমিশন। কোন যুক্তিতে নির্বাচন কমিশন ২২ মার্চ তিন-তিনটা উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত করে নিল, এটি এখন সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর ঘটনা এবং জাতির স্বাস্থ্যবিধির আলোকে রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ একটি সিদ্ধান্ত।

পুরো বিশ্ব না বলি, পুরো জাতি যখন করোনার ভয়ে আতঙ্কিত এবং সরকারের সব পর্যায় থেকে গুরুত্ব সহকারে বারবার নাগরিকদের সচেতন ও সতর্ক থাকার কথা বলেছিল, বলেছিল সঙ্গ-নিরোধ পরিবেশে নিজেদের বন্দি করার জন্য, সে জায়গায় নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হলো এবং কেউ সামান্যতম উৎসাহ দেখিয়ে নির্বাচনের ফলাফলের খবরও জানতে চায়নি। তার পরও পরের দিন পত্রপত্রিকায় যখন বিজয়ী প্রার্থীদের বিজয়ের দুই আঙুল উঁচানো সংকেতসহ ছবি দেখল জনগণ, সঙ্গে কী দেখল? দেখল যে, উপস্থিতির হার ছিল ৫ শতাংশের একটু বেশি।

অর্ধসত্য হিসেবে দাবি করা হতে পারে, নির্বাচন নির্বাচনই, ৯৫ শতাংশের উপস্থিতির হার যেমন নির্বাচন, ৫ শতাংশের উপস্থিতির হারও তেমন নির্বাচন। কিন্তু যে অর্ধসত্যটি এখানে উহ্য রাখা হলো, সেটি হলো এই ৫ শতাংশ উপস্থিতি সহকারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করলে তাতে গণতন্ত্রের মূল শর্ত ‘জনমত’ প্রতিষ্ঠিত হয় না এবং এতে বিজয়ী পক্ষও খুশি হতে পারে না।

উপরন্তু করোনা আতঙ্কের দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে আরেকটি অর্ধসত্যকে চেপে দেওয়া হলো। কারণ করোনা অত্যন্ত স্পর্শনির্ভর ছোঁয়াচে রোগ। একটা উদাহরণ দিই : মিরপুরের টোলারবাগে যখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় করোনা মৃত্যুটি হলো, তার ঠিক দুদিন পরে ওই মৃত ব্যক্তির একজন সঙ্গীও করোনায় মারা যান। কেননা তিনি আর ওই মৃত ব্যক্তিটি একই সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তাই আমরা যতই হাত ধুই, জনসমাগম হওয়ার অর্থই হলো করোনাকে আমন্ত্রণ করে ডেকে আনা। নির্বাচন কমিশন এই ভয়ানক ঝুঁকিটা কীভাবে নিলেন! করোনার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো আক্রমণের ব্যাপারে তার মধ্যে কোনো বাছ-বিচার নেই। সে যেমন কানাডার প্রধানমন্ত্রীর বউকে আক্রমণ করতে পারে, পারে মার্কিনি সিনেটরকেও, তেমনি সে যে বাংলাদেশের নির্বাচনসংশ্লিষ্ট লোকদের খাতির করবে তার যুক্তি নেই।

এই জায়গায় যে কাজটি আমরা করিনি, সেটা হলো বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ‘মুক্তির সংগ্রাম’কে আমরা আমলে আনিনি। যদি আনতাম তাহলে আমরা জানতাম যে বাগাড়ম্বরসর্বস্ব একটা জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন করার অর্থ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বাগাড়ম্বর থেকে মুক্তি নেওয়ার জন্য যে যুক্তি, মেধা ও চিন্তনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, ঠিক সেগুলোকেই আমরা বিয়োগ করে ফেলেছি।

অর্ধসত্যের আরও সমস্যা হচ্ছে এটি ঠকামি বা আরেকটু কঠিন করে বললে, বিশ্বাসঘাতকতার দিকেও চলে যায়। বাগাড়ম্বরের অসারতার ওপর নিজের অজান্তে দুটি মন্তব্য শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই করছেন সাম্প্রতিক সময়ে। যখন ‘মুজিব শতবর্ষ উদযাপন’ নিয়ে বিরাট হৈ-হল্লা শুরু হলো, সেটি দেখে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত একটু মুচকি হেসেছিলেন এবং আস্তে করে বললেন যে, যাদের বঙ্গমাতা দিনের পর দিন রান্না করে খাইয়েছিলেন তারাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন।

আবার আরেকদিন বললেন, বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষের জন্মদিন নিয়ে এখন যখন এত উৎসাহ, তা হলে কেন ’৭৫ সালের সে জঘন্য ১৫ আগস্টের সকালে ৩২ নম্বরের বাড়িটাতে বঙ্গবন্ধুর লাশ (অন্যদের লাশসহ) ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থেকেছিল। বর্তমানের সময়ের সঙ্গে সমীকরণটা হলো, এখন যারা বাগাড়ম্বরের প্রত্যয়ে ৫ শতাংশ উপস্থিতির নির্বাচন করিয়ে আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগছেন, যখন করোনাভাইরাস রুদ্রতম রূপ নেবে, তারাই প্রথমে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলবেন।

বঙ্গবন্ধুর ‘মুক্তির সংগ্রাম’কে বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে বাগাড়ম্বর ও অর্ধসত্য পরিহার করে যুক্তি ও মেধার সংমিশ্রণে সঠিক আবেগকে সমন্বিত করে বাংলাদেশকে একটি আদর্শিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। জয় বাংলা।

অধ্যাপক ড. মোহীত উল আলম: ইংরেজি বিভাগ,
ডিন, কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদ
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

advertisement
Evall
advertisement