advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ইতিহাসের ব্যতিক্রমী স্বাধীনতা দিবস
করোনা যুদ্ধেও জয়ী হবে বাঙালি

মুহম্মদ আকবর
২৭ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২০ ০০:২৭
advertisement

মার্চ ১৯৭১ ও মার্চ ২০২০। মাঝে ৪৯ বছরের ব্যবধান। তা সত্ত্বেও সেই মার্চের সঙ্গে আজকের এই মার্চের তাৎপর্যপূর্ণ একটি সাদৃশ্য রয়েছে। দুটি মার্চেই যুদ্ধের মুখোমুখি আমরা। একাত্তরের মার্চে শুরু হওয়া যুদ্ধ ছিল পাক হানাদার বাহিনীকে মোকাবিলা করার। আর এখন যুদ্ধ চলছে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায়। একাত্তরের সেই যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রÑ বাংলাদেশ। আর এখন যুদ্ধ চলছে স্বাধীন সেই দেশের ১৬ কোটি মানুষকে প্রাণঘাতী মহামারীর কবল থেকে রক্ষা করার। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় এসেছিল সবার ঐকমত্যে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। করোনাবিরোধী আজকের এই যুদ্ধেও জয় পেতে হলে ঐকমত্যের, সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। দুটি যুদ্ধের নীতিতে কিন্তু একটি বৈসাদৃশ্য রয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই দূরত্ব ঘুচিয়ে নেমে এসেছিল এক কাতারে। আর এখন যে যুদ্ধ চলছে, তাতে জয় পেতে হলে প্রিয় মানুষকেও প্রয়োজনে ঠেলে দিতে হবে দূরে, পরস্পরের সঙ্গে বজায় রাখতে হবে সামাজিক দূরত্ব। যুদ্ধ জয়ের এ নীতির কারণেই গতকাল দেশব্যাপী উদযাপিত হয়েছে ইতিহাসের ব্যতিক্রম এক স্বাধীনতা দিবস।
এবারই প্রথম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমাদের জাতীয় স্মৃতিসৌধে দেখা যায়নি ভালোবাসার ফুলের বন্যা; পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের চিরচেনা দৃশ্যপট। ছিল না কোনো আয়োজন, ছিল না জনসমাগম। স্বাধীনতার ৪৯তম বার্ষিকীতে এসে বিশেষ এ দিবসে এমন দৃশ্য প্রথমবারের মতো দেখল বাংলাদেশ। বিশিষ্টজনরা বলছেন, যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে হলেও করোনা যুদ্ধেও জয়ী হবে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ। এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে সেই বার্তাই উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হয়ে এগিয়ে আসতে হবে, মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বর্বর হানাদার সেনাবাহিনী এক নৃশংস গণহত্যায় মেতে উঠেছিল।
সে রাতে তাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করে শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে বাঙালির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর পর ৯ মাসের এক মরণপণ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে বিশ্ব মানচিত্রে।
দিনটি বাঙালির আবেগের, সাহসের, মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাওয়ার এক অফুরান অনুপ্রেরণার আধার। চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর থেকে প্রতিবছর দিবসটি সাড়ম্বরে উদযাপিত হলেও এবারই প্রথম দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে স্বাধীনতা দিবসের এবারের জাতীয় অনুষ্ঠানমালা বাতিল করা হয়। গতকালই শুরু হয় দেশব্যাপী ১০ দিনের ‘লকডাউন’। সরকারি নির্দেশনা মেনে মানুষজনও বের হননি ঘর থেকে। অন্যবছর সাভারে বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের পথ ধরে সারাদিন দেখা যেত মানুষের ঢল। হাতে ফুল নিয়ে নানা বয়সী মানুষ স্মরণ করতেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। উৎসব আয়োজনে মেতে উঠত সারাদেশ। অথচ করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে গতকাল স্মৃতিসৌধের ফটক ছিল তালাবদ্ধ। ছিল না রাষ্ট্রীয় আয়োজন। ছিল না মানুষের ঢল। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশ, জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ ও বঙ্গভবনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানও বাতিল করা হয়। তবে মানুষ বীর শহীদদের স্মরণ করেছেন নিজেদের মতো করে। নিজ নিজ পরিসরে নিজেদের মতো করে তারা দিবসটি উদযাপন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও মোবাইল ফোনে এসএমএসেও বিনিময় করেছেন স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।
অন্যান্য বছরের মতো এবারও বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি দূতাবাসগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাদের স্ব স্ব দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও সার্ক মহাসচিব ইসালা রুবান বিরাকুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
এবারের স্বাধীনতা দিবসে থমকে যাওয়া বাংলাদেশের প্রায় সব শ্রেণি পেশার মানুষের মূল বার্তা ছিল করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর। নিজেরা সতর্ক থেকে, আশপাশের মানুষগুলোকে সতর্ক করে ও সরকারের সহায়তা নিয়েই এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশের মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে করোনা মোকাবিলাকে যুদ্ধ আখ্যায়িত করে বলেন, বাঙালি বীরের জাতি। নানা দুর্যোগে-সংকটে বাঙালি জাতি সম্মিলিতভাবে সেগুলো মোকাবিলা করেছে। ১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয়ী হয়েছি। করোনা ভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আপনার দায়িত্ব ঘরে থাকা। আমরা সবার প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হব, ইনশাআল্লাহ। রাজনৈতিক দলগুলোর বিবৃতি, রাজনীতিকদের বক্তব্য ও বিশিষ্টজনের লেখনীতে উঠে এসেছে করোনা ভাইরাসের যুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রত্যয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্বাধীনতা দিবসের স্পিরিট নিয়ে দেশের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সংকট মোকাবিলা করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
ঘরে বসে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ঘরে বসে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অভিজ্ঞতা এই প্রথম। আশা করছি সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় করোনা ভাইরাসজনিত এ সংকট কেটে যাবে এবং আগামীতে সুন্দরভাবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করব।
বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, যে কোনো বিপর্যয় আমরা মোকাবিলা করতে পারি। সমবেতভাবে এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠব। তা হলেই আমাদের স্বাধীনতা অর্থপূর্ণ হবে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজরুল ইসলাম বলেন, একাত্তরেও আমাদের সক্ষমতা ছিল, তাই তো মাত্র ৯ মাসে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছিল। করোনা বিপর্যয় থেকেও হয়তো আমরা এক দেড় মাসের মধ্যে রেহাই পাব। এখন প্রয়োজন সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, একটু সাবধানে থাকা। করোনা প্রতিরোধে নিয়মাবলী মেনে চলা।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যেন আমরা দরিদ্রদের কথা ভুলে না যাই। যে কোনো বিপদ থেকে আমরা শিক্ষা নিই। এ বিপদ থেকে আমরা সাম্যের শিক্ষা পাচ্ছি। অর্থাৎ স্বার্থপরতার দিকে মনোযোগ না দিয়ে পরার্থপরতার দিকে মনোযোগ যেন দেই।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, সংকট আসে আবার সংকট চলেও যায়। একাত্তরে কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের বিজয় এসেছে। করোনা ভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ। এটি অস্ত্র দিয়ে নয়, সচেতন ও দায়িত্বশীলতার যুদ্ধ। এ যুদ্ধেও আমরা জয়ী হব। আমরা যদি সচেতন হই, দায়িত্বশীল হই তা হলে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে না।
তিনি বলেন, এবারের স্বাধীনতা দিবসে আমরা হয়তো বাইরে গিয়ে বর্ণাঢ্যভাবে উদযাপন করতে পারিনি কিন্তু স্বাধীনতা দিবসের প্রতি আমাদের আবেগ ও আন্তরিকতার অভাব নেই। আমরা হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে বাইরে আয়োজন করিনি। কিন্তু হৃদয় দিয়ে নিজ নিজ ঘরে উদযাপন করেছি।
বিদেশে দূতাবাসে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন
বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাস ও মিশনে যথাযোগ্য মর্যাদায় বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়। করোনা প্রতিরোধে ভারতজুড়ে লকডাউন থাকায় মুম্বাইয়ে উপ-হাইকমিশনের আলোচনাসভায় শুধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। দিবসটি উপলক্ষে চ্যান্সারি প্রাঙ্গণে উপ-হাইকমিশনার লুৎফর রহমান জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
সিঙ্গাপুরেও বাংলাদেশ হাইকমিশনে সংক্ষিপ্ত পরিসরে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হয়। হাইকমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান মিশন কর্মকর্তাবৃন্দ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপস্থিতিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির সূচনা করেন।
সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসে সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ। ভিয়েতনামের হ্যানয়ে রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ প্রত্যুষে জাতীয় সংগীতসহকারে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
ইরাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত আবু মাকসুদ মো. ফরহাদ জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসের অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। পরে দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়।

advertisement
Evaly
advertisement