advertisement
advertisement

স্বাধীনতা দিবসের ভিন্নতর চ্যালেঞ্জ

আবুল মোমেন
২৭ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০ ২৩:২৭
advertisement

মুজিববর্ষে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হওয়ার কথা ছিল অন্যতর আনন্দময় উৎসবের আঙ্গিকে। কিন্তু ভয়ঙ্কর ভাইরাস সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নিয়ে এলো কোভিড-১৯ ফ্লু রোগ। এই রোগের কবলে পড়ে চীন তার ঐতিহ্যবাহী নববর্ষের উৎসব পালন করতে পারেনি। আরও নানা দেশ ও সম্প্রদায় উৎসব উদযাপন থেকে বিরত থেকেছে। আমাদেরও সেই ধারায় উৎসবের পরিবর্তে ঘরে বসেই দিনযাপন করতে হচ্ছে।

তবে

আমাদের স্বাধীনতা এসেছে একদিকে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে এবং অন্যদিকে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুখোমুখি মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে বহু প্রাণের বিনিময়ে তাকে বিজয়ের গৌরবে সার্থক করতে হয়েছে। স্বাধীনতা আমাদের শিখিয়েছে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সাফল্য অর্জিত হয়। এর জন্য প্রয়োজনে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় এবং অকাতরে আত্মত্যাগেও এগিয়ে যেতে হয়। আজকে যে বাস্তবতার সম্মুখীন আমরা হয়েছি তাতে লড়াইটা চালাতে হবে এক ক্ষুদ্র অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে। একদিন বাঙালি জাতি মূর্তিমান আতঙ্কের মতো দৃশ্যমান পাঞ্জাবি দখলদারদের বিরুদ্ধে অস্ত্রহাতে মাঠে নেমেছিল। আর আজকে কোটি কোটি অদৃশ্য অণুজীবের বিরুদ্ধে নামতে হচ্ছে ভিন্নতর এক সংগ্রামে। তবে তখনকার মতো এখনো প্রয়োজন সাহস ও মনোবল এবং সংগ্রাম ও ত্যাগের মনোভাব। আশা করি বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে জনগণ যেমন উন্নয়নের পথে শরিক হয়েছে, তেমনি সংগ্রামের এই নতুন পথেও সম্মিলিতভাবে শামিল হবে।

সেবার মানুষের মনের গভীর আবেগ ও আন্তরিক সদিচ্ছাই ছিল তার মূল হাতিয়ার; তবে আজকের ভিন্ন এই সংগ্রামে প্রয়োজন হবে বিজ্ঞানচেতনা এবং সংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী মনের সক্রিয় ভূমিকা। আমরা জানি, বহুকাল ধরে এ দেশে বিজ্ঞানচর্চা ও এর পঠনপাঠন চললেও সংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী মানস এখনো তৈরি হয়নি। রোগ ও সংক্রমণের বিষয়ে আমাদের ধারণাগুলো অনেকটাই তামাদি হয়ে গেছে। ভাবনার জগতে বিজ্ঞানের শিক্ষা তেমনভাবে কাজ করে না। করোনা প্রাদুর্ভাবরোধে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থা এবং চিকিৎসকরা যেসব নির্দেশনা দিচ্ছেন, সেগুলো মানার ব্যাপারে শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও শৈথিল্য দেখা যাচ্ছে। অথচ এর ফল হতে পারে মারাত্মক।

বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে জাতির পক্ষ থেকে স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেছিলেন। তিনি ভাষণের শেষ বাক্যে একই সাথে স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা বলেছিলেন। ফলে আমাদের একটি দায় রয়েছে এই মুজিবশতবর্ষে সত্যিকারের স্বাধীন ও মুক্ত মানুষ তৈরির কাজ করা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাজনীতি ও সমাজনীতি এর সাথে সঙ্গতপূর্ণভাবে চলছে না। প্রকৃত মুক্ত মানুষ কেবল স্বাধীন দেশের নাগরিক হবে না তাঁর চিন্তার জগৎ ও কর্মজগৎ হবে যুক্তি ও মননের দ্বারা শাসিত; আবেগ বা অন্ধবিশ্বাসের স্থান এখানে থাকতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তন এবং করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে নিজেদের ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সংকটমুক্ত রাখতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা এবং সবার স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কিন্তু পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো এখনো সেই পথ থেকে দূরে রয়েছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশকেই বিজ্ঞানচেতনায় সমৃদ্ধ সমাজ গঠন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আর তখনই অন্যদের ওপর আমরা চাপ প্রয়োগ করতে পারব ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী গড়ার কাজে নেতৃত্ব দিতে পারব।

এবারের স্বাধীনতা দিবস দৃশ্যত জৌলুসহীন ও নিরানন্দে কাটলেও এর তাৎপর্য কম গভীর নয়। আমাদের সেই তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে। তা হলেই আমরা বুঝতে পারব এবার মুজিববর্ষে এই স্বাধীনতা দিবস কোন বিশেষ তাৎপর্য বয়ে এনেছে।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করে। সেই পথে অনেকদূর অগ্রগতিও হয়েছে। তবে পাশাপাশি উন্নয়নের পুরনো মডেল অনুসরণ করে সড়ক যোগাযোগ ও অন্যান্য বড় স্থাপনা নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু করোনা নতুন যে চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে, তাতে সড়ক যোগাযোগ বা বড় বড় স্থাপনার কোনোই গুরুত্ব থাকছে না; বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ডিজিটাল বা অনলাইন যোগাযোগ। এখন প্রয়োজন এই খাতকে আরও দক্ষ ও শক্তিশালী করা। এখানেও বিশুদ্ধ গণিত ও বিজ্ঞানের ধারণা জরুরি। কেবল মেঠো রাজনীতির কা-জ্ঞান দিয়ে এটি অর্জন করা সম্ভব হবে না। ফলে করোনা আক্রান্তকালের এই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের জাতির জন্য একটি মাত্র বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা হলোÑ বিজ্ঞানচেতনা, বিজ্ঞানচেতনা, বিজ্ঞানচেতনা। বিজ্ঞানমনষ্ক জাতিই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ভোগ করবে ও মুক্তির আস্বাদ লাভ করবে।

advertisement