advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কান ধরে ওঠবস : প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে যা ভাবছি

তামান্না সুলতানা
২৮ মার্চ ২০২০ ২২:৩২ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২০ ০১:৪১
advertisement

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে চোখ আটকে গেল। কানে ধরে ওঠবস করছেন দুজন বয়ষ্ক মানুষ। আর সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করছেন মেয়ের বয়সী এক নারী। হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকি কানেধরা পিতৃসমতুল্য মানুষগুলোর দিকে। ভাবতে থাকি, তারা কী এমন অপরাধ করেছেন যে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করিয়ে ছবি তুলে রাখতে হয়েছে?

নিজের এই প্রশ্নটার জবাব পেতে অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয়নি।  জানলাম, ঘটনাটি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার। আর সেই নারী সেখানকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসান। মাস্ক না পরার অপরাধে বাবার বয়সী মানুষকে কানে ধরে ওঠবস করিয়েছেন তিনি। দৃশ্যটা হয়তো তার কাছে এতটাই গর্বের মনে হয়েছে যে, সেই কানেধরা ছবিও তুলছেন। পুরো বিষয়টি শুধু আমাকে না, গোটা দেশের মানুষের অনুভূতিকে নাড়া দিয়েছে প্রচণ্ডভাবে। আর সে কারণেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে চলছে সমালোচনার ঝড়।

এখন মূল আলোচনায় আসি। দেশে কি এমন কোনো আদেশ জারি হয়েছে যে, ঘর থেকে বাইরে বের হলেই সবাইকে মাস্ক পরতে হবে? আমার জানামতে হয়নি। যেখানে এবিএম আব্দুল্লাহর মতো দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসকরা পর্যন্ত বারবার বলছেন, সবার মাস্ক পরার দরকার নেই। যারা সর্দি-কাশিতে ভুগছেন, কেবল তারাই মাস্ক পরবেন। তাহলে এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতার ফরমান কোথায় পেলেন? প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হয়ে ন্যূনতম মানবিকতাও কি তাকে স্পর্শ করল না?

ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠার পর সেই এসি ল্যান্ডকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কয়েকটি গণমাধ্যমের সংবাদে দেখলাম, তিনি বিষয়টিতে অনুতপ্ত। এটা শুধুই কথার কথা, নাকি সত্যিই সেই এসি ল্যান্ড অনুতপ্ত, তা তিনি নিজেই ভালো জানেন। তবে প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে এ লজ্জা আমাদের সবার।

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে প্রতিটি কর্মচারীর যেমন থাকবে উজ্জ্বল সাফল্যের গল্প, তেমনি সমান্তরালে থাকবে কিছু ব্যর্থতার গল্প। কিন্তু এ বিষয়টি ছাপিয়ে গেছে মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে। প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও কেন পিতৃসম মানুষদের ভালোবাসা দিয়ে না বুঝিয়ে কান ধরাতে বাধছে না, তা অবশ্যই ভাববার বিষয়। আছে কী কোনো মূল্যবোধজনিত ঘাটতি? হয়তো অবশ্যই।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত, বঙ্গবন্ধুর সেই কথাগুলো, ‘আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ওই গরিব কৃষক। আপনার মাইনে দেয় ওই গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ওই টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলেন, ইজ্জত করে কথা বলেন। ওরাই মালিক। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে।’

এই ঘটনা যেমন বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লঙ্ঘন করেছে, তেমনি বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। যেখানে সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর অমানুষিক বা লান্ঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না’, ৩৫(৫)। সেখানে এ ধরনের ব্যবহার অবশ্যই অমার্জনীয় ও শাস্তিযোগ্য। যদিও ইতিমধ্যে সাইয়েমা হাসানকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে ও তার শাস্তি সংক্রান্ত পরবর্তী বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

চারপাশে এখন শুধুই সমালোচনা। মনিরামপুরের এসি ল্যান্ডের এমন কাণ্ডের পর সমালোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের আশাবাদী হওয়ারও যথেষ্ট কারণ আছে। ঘটনাটি জানার পরই মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন মহোদয় দুঃখপ্রকাশ করেছেন। মনিরামপুর উপজেলার ইউএনও আহসান উল্লাহ শরিফী বিকেলেই ভুক্তভোগী প্রবীণদের বাড়ি গেছেন। তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তাদের বাড়িতে গিয়ে চাল দিয়ে এসেছেন।  পরবর্তীতেও আরও সাহায্য করাসহ বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কান ধরে ওঠবস করার সময় যে কষ্ট পেয়েছেন তারা, এসব তার প্রতিদান অবশ্যই না। তবে তা অবশ্যই ভুক্তভোগীদের মানসিক যন্ত্রণা কিছুটা হলেও লাঘব করেছে।

আরেক খবরে দেখলাম, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) হামিদুল হক এক গরিব অসহায় বৃদ্ধকে বুকে টেনে নিয়েছেন। আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কঠিন সময়ে আশান্বিত হওয়ার মতো এমন বহু উদাহরণ দেওয়া সম্ভব।

সরকারের  সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অংশীদার প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাও। উন্নয়নের প্রতিনিধিত্বশীল অংশের যারা প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা অধিকাংশই মানবিক ও ইতিবাচক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষেরা, যেখানে একজন সাইয়েমা হাসান অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ। এ দেশের প্রবীণ ও শ্রদ্ধাভাজন মানুষের সঙ্গে তিনি যে ব্যবহার করেছেন এ দায় তার। এ দীনতা শুধুই একজন ব্যক্তির। ক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে মানবতা আর মানবিক শিক্ষার সমন্বয়টা নিজেকেই করে নিতে হবে। এই সমন্বয়ের কাজটা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা পেশাগত প্রশিক্ষণ দ্বারা সম্ভব নয়, যদি সেই মানুষের সঠিক ও সফল  সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি না ঘটে।

সঠিক ও সফল সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকে পরিবার। তাই পরিবারের পক্ষেই সম্ভব নৈতিক অবক্ষয় রোধ করে একটি ত্রুটিমুক্ত মানবিক, মূল্যবোধসম্পন্ন সঠিক সামাজিকীকরণ, যার ইতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত হবে সমাজ, দেশ।

তামান্না সুলতানা : সহকারী অধ্যাপক, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)

advertisement
Evall
advertisement