advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গুটিকয়েক কর্মকর্তায় প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন

ইউসুফ আরেফিন
২৯ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২০ ১১:৪১
advertisement

মাস্ক না পরার দায়ে যশোরের মনিরামপুরে তিন বৃদ্ধকে কান ধরিয়ে ছবি তোলার ঘটনায় এসিল্যান্ড সাইয়েমা হাসানকে প্রত্যাহার করে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হবে বলে জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র।

এদিকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সাইয়েমার মতো গুটিকয়েক কর্মকর্তার জন্য পুরো প্রশাসনের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। সুতরাং তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এমন অপ্রত্যাশিত কাণ্ড বাড়তেই থাকবে।

জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহস্রাধিক কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে মনিরামপুরে যে ঘটনা ঘটেছে, আমি মনে করি সেটি বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা, যা ঘটেছে তা অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয়। এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

সাবেক সচিব আবু আলম ফেসবুকে লিখেছেন, দেখেন কী কঠিন ভাষা। মূর্খদের বাড়াবাড়ি বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গণকর্মচারীরা দারুণ ঝুঁকি নিয়ে এ ভয়াবহ সময়ে জনগণের সেবায় মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। যেসব ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে গেছে, সেগুলো দুঃখজনক। আমি লজ্জিত, ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ! উচ্চপর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন না দেওয়ায় অন্য দেশের অব্যবস্থাগুলো অনুসরণে উৎসাহী হয়েছেন মূর্খ কেউ কেউ, সবাই নয়। এ জন্য গাইডলাইন দরকার, যেন কেউ তার ইচ্ছেমতো আচরণ করতে না পারেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শফিক জামান লিখেছেন, সাইয়েমা হাসান কি ব্রিটিশ নাকি পাকিস্তানি নাগরিক? শাসক ও শোষকের মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা সবাই জনমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলছি। আমি ২৬ বছর আগে ১৯৯৪ সালে যখন প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করি, তখন আমাদের প্রশিক্ষণ কিংবা সিনিয়রদের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাজের দীক্ষা পেয়েছি। কিন্তু আজকাল মাঠ প্রশাসনের বেশ কিছু ঘটনা আমাকে বিস্মিত করেছে। গোটা জাতির কাছে আমাদের অপমানিত করছে।

প্রশাসনের এক কর্মকর্তা কীভাবে খেটে খাওয়া গরিব মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন? বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব যখন করোনার ভয়ঙ্কর ছোবলে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রশাসনের একজন নবীন কর্মকর্তা কীভাবে এমন একটি কা- করতে পারেন, তা আমি কোনোভাবেই মেলাতে পারছি না। সাইয়েমা গোটা প্রশাসন ক্যাডারকে জনগণের কাছে চরম অপমান করলেন। আমি এ জন্য চরম লজ্জিত।

যুগ্ম সচিব আরও লিখেছেন, আজকাল চাকরিতে ঢুকে একেকজন জমিদার বনে যান। জুনিয়রদের চালচলন, আচার ব্যবহার দেখলে নিজেকে অসহায় মনে হয়। কোনো একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে জুনিয়র কারও সঙ্গে নতুন পরিচয় হলে এমন ভাব দেখান যে, আমি যে সিনিয়র সেটি তিনি বুঝতেই পারছেন না। সমস্যাটা কোথায়? কদিন আগে গভীর রাতে এক সাংবাদিককে বাসা থেকে তুলে এনে সারা জাতির কাছে আমাদের মান-সম্মান মাটিতে নামানো হলো।

সেদিন দেখলাম এক ম্যাজিস্ট্রেট এয়ারপোর্টে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে হুঙ্কার-গর্জন করছেন। মনে হচ্ছিলÑ আমরা কি সবাই ওয়াইল্ড বিস্ট (বন্য জন্তু) হয়ে গেছি? এসব ঘটনা আজকাল প্রায়ই ঘটছে। যাই হোক, আমরা সবাই এ অবক্ষয়, অন্যায়-অনিয়ম হরহামেশাই দেখছি। সবচেয়ে কষ্ট লাগে, এসব নিয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ে না।

আর আফসোস করে লাভ কী! আর কয়টা দিনই বা চাকরি করব। তারাই তো একদিন দেশ চালাবেন।

প্রসঙ্গত, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে যশোরের মনিরামপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসানের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত গত শুক্রবার বিকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। সাড়ে ৫টার দিকে চিনাটোলা বাজারে অভিযানকালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে পড়েন দুই বৃদ্ধ। তাদের মধ্যে একজন বাইসাইকেল চালিয়ে আসছিলেন।

অন্যজন রাস্তার পাশে বসে কাঁচা তরকারি বিক্রি করছিলেন। তাদের মুখে মাস্ক ছিল না। এ সময় পুলিশ ওই দুই বৃদ্ধকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করেন। সাইয়েমা হাসান শাস্তি হিসেবে তাদের কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখেন। শুধু তাই নয়, নিজের মোবাইল ফোনে দুই বৃদ্ধের কান ধরা অবস্থার ছবিও তোলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে সাইয়েমা এক ভ্যানচালককেও একইভাবে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখেন এবং ছবি তোলেন।

শুক্রবার রাতেই সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এতে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন অমানবিক কাণ্ডে বিস্মিত সর্বস্তরের মানুষ। এমনকি প্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক অনেক কর্মকর্তাও তাদের বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসের মাধ্যমে। কেউ কেউ তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেছেন।

এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে গতকাল জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন আমাদের সময়কে বলেন, আমরা ওই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে বিভাগীয় কমিশনারের অফিসে সংযুক্ত করতে বলেছি। সেটি করাও হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে তিনজন সিনিয়র সিটিজেনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়েছে, মনিরামপুরের ইউএনও মিডিয়াকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়ি যাচ্ছেন দুঃখ প্রকাশ করতে। তাদের যদি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন হয়, সেটিও তিনি দেবেন। অভিযুক্ত এসিকে (ল্যান্ড) সেখানে নেওয়া হবে না, যেহেতু আমরা তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।

শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, আমরা খুবই দুঃখিত, যা ঘটেছে তাতে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে তার হয়ে ‘সরি’ বলা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। তাদের আচরণের জন্য বিব্রত হতে হয় আমাদের। এ ঘটনায় আমরা অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছি।

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বলেন, ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ছবিটি দেখেছি। এটি তিনি (এসি) করতেই পারেন না, কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আমাদের কাজ নয়। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য গতকাল ফোন করে দেখা গেছে, এসিল্যান্ড সাইয়েমা হাসানের ফোন বন্ধ। জানা গেছে, স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তবে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।

পরিবারের খাদ্য সংগ্রহে বাজারে গিয়েছিলেন তিন বৃদ্ধ, লজ্জায় পরিবারকেও জানাননি মনিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় গ্রামের নূর আলী গাজী (৭০) করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে এলাকায় প্রশাসনের মাইকিং ও পুলিশি টহল দেখে তিন দিন ভ্যান চালাতে বের হননি। কিন্তু সংসারের জন্য চাল-ডাল-তরকারি প্রয়োজন হওয়ায় তিন দিন পর গত শুক্রবার ভ্যান নিয়ে বের হন। কিছু টাকা রোজগারের পর কেনাকাটা করতে চিনাঢোলা বাজারে যান তিনি।

এর মধ্যেই এসিল্যান্ড সাইয়েমা হাসান তাকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখেন এবং যাচ্ছেতাই বাজে আচরণ করেন। ভীষণ লজ্জিত বৃদ্ধ নূর আলী বাড়ি ফিরে লজ্জায় কাউকে এ ঘটনা জানাননি। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ‘মেয়ে-জামাই আছে, প্রতিবেশী ও ছেলে-স্ত্রী আছে। তাদের কীভাবে এ লজ্জার কথা বলি? এ জন্য কাউকে বলিনি। মনে মনে আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি।

পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ লাউড়ি গ্রামে গিয়ে কথা হয় ওই এসির নির্দেশে কান ধরে দাঁড়ানো আরেক বৃদ্ধ বাবু মোড়ল (৬৭) ও আসমত উল্লাহর (৭৪) সঙ্গে। তারা জানান, এসি স্যার তাদের নাতির বয়সী। তিনি কোনো কিছু না জেনে সবার সামনে আমাদের কান ধরে দাঁড়াতে বাধ্য করেন। জীবনে আমরা কেউ এমন অপমানিত হইনি। তারা প্রশ্ন রাখেন- এ ঘটনা মেয়ের জামাই ও আত্মীয়স্বজন জানলে তাদের সামনে মুখ দেখানোর পরিস্থিতি থাকবে? জীবনের শেষপ্রান্তে এসে এমন পরিস্থিতিতে পড়ব, ভাবিনি। তবু আমরা অপরাধী, আল্লাহ আমাদের অপরাধ দেখেছেন। তিনি যেন বিচার করেন!

স্থানীয়রা জানান, বাবু মোড়ল প্রতিদিন বিকালে কিছু তরকারি নিয়ে হাটের ফুটপাতে বসে বিক্রি করেন। সামান্য এ আয়ের টাকায় চার মেয়ে ও এক ছেলেকে বড় করেছেন অত্যন্ত দরিদ্র এই বৃদ্ধ। অন্যদিকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ আসমত উল্লাহর আয়ে চলে তার সংসার। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে এক ছেলে-স্ত্রীকে নিয়ে দরিদ্র হলেও আত্মসম্মান নিয়ে ভালোই আছেন তিনি।

প্রবীণদের বাড়িতে গেলেন ইউএনও, ফোনে কথা বললেন প্রতিমন্ত্রী : এসির অমানবিক আচরণের শিকার তিন প্রবীণের বাড়িতে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আহসান উল্লাহ শরিফী। তিনি ওই তিন বৃদ্ধের পরিবারকে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

এ সময় মনিরামপুর থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. বায়োজিদ হোসেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও এলজিআরডিএ প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা সজিব কুশারী উপস্থিত ছিলেন।

পরে এলজিআরডিএ প্রতিমন্ত্রী স্বপন কুমার ভট্টাচার্য নিজেও মোবাইল ফোনে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার কোনো অন্যায়কারীর মুখ চিনে বিচার করে না, এটি এখন চিরন্তন সত্য। এসিল্যান্ডের কর্মকা-ের উপযুক্ত বিচারও করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন যশোর প্রতিনিধি উত্তম ঘোষ

advertisement
Evall
advertisement