advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গুলির শব্দহীন, বারুদের গন্ধহীন যুদ্ধে আজ পৃথিবী

অঘোর মন্ডল
২৯ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২০ ২৩:৪২
advertisement

মুজিববর্ষে বিশ^জুড়ে শোকের সর্বগ্রাসী আবহ। সময়ের স্রোতধারায় সাঁতার কাটতে কাটতে পেছনে গেলে একটা বন্দর খুঁজে পাবেন। তার নাম ১৯২০। সেখানে আপনি নোঙর করলে এই আবহ অস্বাভাবিক মনে হবে না। ঠিক ১০০ বছর আগে পৃথিবীর ভয়ঙ্কর এক অসুখ হয়েছিল। যার নাম স্প্যানিশ ফ্লু, যা কেড়ে নিয়েছিল পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ। পৃথিবীর সেই অসুখের সময় জন্ম হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর। তার জন্মশতবার্ষিকীতে আবার অসুখ পৃথিবীর! কবে সুস্থ হবে পৃথিবী! মুজিববর্ষের শুরুতে বড় হয়ে উঠেছে সেই প্রশ্নটা। নভেল করোনা ভাইরাসের থাবায় ঘুমিয়ে পড়েছে গোটা বিশ^। কোথায় মানুষের স্বপ্ন! দুঃস্বপ্নঘেরা এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি আজ পৃথিবীসুদ্ধ মানুষ। বাস্তবের সাইডলাইন ধরে দুঃস্বপ্নগুলো দৌড়ে আসছে উসাইন বোল্টের গতিকে পেছনে ফেলে! করোনা ভাইরাসের দৌড়টা আপাতত মনে হচ্ছে অফুরান। তার ধাক্কায় জীবনের ট্র্যাক থেকে ছিটকে যাচ্ছে প্রতিদিন কত প্রাণ। এখন প্রতিদিন গোটা বিশে^র টেলিভিশনের খবর দেখলে মনে হবে- এ যেন দুঃস্বপ্নের এক মেগাসিরিয়াল! যেখানে জীবনটা নিরর্থক!

কিন্তু তার পরও বলতে হচ্ছে, জীবন জীবনের জন্য। মানুষ মানুষের জন্য। কিন্তু করোনাবিদীর্ণ সময়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা। গোটা বিশে^র একই চেহারা। প্রতিদিন দৃশ্যমান হচ্ছে কোথাও না কোথাও মৃত্যুর মিছিল। বাংলাদেশে করোনার থাবায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে এক, দুই, তিন করে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। মৃতের সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কেউ জানেন না। একুশ শতকের পৃথিবীর কি দীনতা ফুটে উঠছে এক করোনা ভাইরাসের আবির্ভাবে। কোথায় তার আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের গরিমা! বিশ^জুড়ে একটাই আওয়াজ- সুস্থ থাকুন। অন্যদের সুস্থ রাখুন। স্বেচ্ছা গৃহবন্দি হোন। আপনার-আমার বন্দিত্ব করোনা প্রতিরোধের বড় অস্ত্র। সংক্রমণ এড়াতে গৃহবন্দি থাকা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই সেরা অস্ত্র।

করোনার সামনে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-ভাষা-ধনী-গরিব-রাজা-বাদশা, খেটে খাওয়া দিনমজুর, মুদির দোকানি সবাই বড় অসহায়। এমনকি চিকিৎসকরাও! নিজেদের অসহায়ত্ব আর অক্ষমতার কথা বলছেন তারা অকপটে। অসহায় না হলে কোনো চিকিৎসক কী কর্মবিরতিতে যেতে পারেন এই মহামারীর সময়ে! কেন গেলেন? যারা মানুষের জীবন বাঁচানোর ব্রত নিয়ে এসেছেন এই পেশায়, তাদেরও জীবন আছে। পরিবার আছে। তারা বাঁচলে হয়তো বাঁচবে আরও শত শত প্রাণ। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রাথমিক পাঠ শেষ করে যারা কর্মজীবনে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, চিকিৎসাপাঠে এই সময়টাকে ইন্টার্নশিপ বলে। খুলনা মেডিক্যাল কলেজে সেই ইন্টার চিকিৎসকরা এই মহাকালের মহামারীর সময় ধর্মঘট করলেন পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) না থাকার কারণে। গেলেন কর্মবিরতিতে। করোনা হানা দিয়েছে বাংলাদেশে একটু দেরিতে। তা প্রতিরোধে আমরা কি প্রস্তুত ছিলাম? কিংবা এখনো কি প্রস্তুত! বুকে হাত দিয়ে বলা যাচ্ছে না প্রস্তুত। মাইক্রোফোনের সামনে মন্ত্রী-আমলারা যতই বলুন না কেন, ‘আমরা প্রস্তুত’। আমাদের প্রস্তুতির চেহারাটা বেরিয়ে পড়ল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের একটা বিবৃতিতে। যেখানে সাফ জানানো হয়েছে; করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের টেস্ট করার মতো কিটস তাদের নেই। নেই... নেই-এর তালিকাটা আরও বড়। সেখানে বলা হয়েছে পারসোনাল প্রোটেকটিভ কিটসও তাদের দিতে পারবে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ! আসলে এটাই আজকের বাস্তবতা। যেখানে চিকিৎসকরাও আক্রান্ত হয়েছেন করোনায়। তবে এটাকে শুধু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভাবলে ভুল হবে। মস্ত বড় ভুল। চীন থেকে যার শুরু সেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে আজ বিপর্যস্ত ইউরোপ থেকে আমেরিকা। অস্ট্রেলিয়া থেকে এশিয়া। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবী ভাইরাস পাল্টে দিয়েছে চেনা পৃথিবীর চেহারা। এই পৃথিবী দেখেছে দু-দুটো বিশ^যুদ্ধের ভয়াবহতা। দেখেছে গত কয়েকশ বছরে বারবার মহামারী। কিন্তু এ রকম কঠিন সময় কী আগে কখনো দেখেছে একটা-দুটো-তিনটা প্রজন্ম? উত্তরটা দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী। ‘২০২০ এই সালটা পৃথিবীর জন্য কঠিনতম সময়।’

হ্যাঁ, কঠিন সময়। শুধু কঠিন নয়। কঠিনতম সময়। অনিশ্চিত পৃথিবীতে মৃত্যুই যেন একমাত্র নিশ্চিত ব্যাপার। এমন একটা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পৃথিবীর মানুষ। আমরা সবাই জানি যেতে হবে। আজ হোক কাল হোক যেতে হবে। কিন্তু যেভাবে চলে যাচ্ছেন অনেকে চারপাশ খালি করে, সেটা মেনে নেওয়ার জন্য কেউ কি প্রস্তুত ছিলেন? না। কেউ ছিলেন না। সভ্যতার ওপর গড়ে ওঠা আজকের যে সমাজ। আগেরকার দিনে জীবনের একটা মৃত্যুর প্রস্তুতি থাকত। মানুষ গার্হস্থ্য ছেড়ে বানপ্রস্থে যেত। তার পর সন্ন্যাস। ওরা বনে চলে যেতেন। জানতেন এবার মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু সন্ন্যাস জীবন নয়। বানপ্রস্থও নয়। আপনাকে ঘরেই থাকতে বলা হচ্ছে। সেটা আপনার জীবনের জন্য। আপনার পরিবার-পরিজন-প্রতিবেশীকে মৃত্যু থেকে দূরে রাখতে। শুধু একটা কথা মনে রাখতে হবে; আপনি, আমি, আমরা সবাই জীবনের বড় মহাযুদ্ধে আছি এখন। আপনাকে পাশে চাই। তবে সেটা নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব রেখে।

মানুষের আর্থসামাজিক জীবনের উন্নতি ঘটাতে পৃথিবীতে কত বিপ্লব ঘটল। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে কত কথা হচ্ছে। কিন্তু করোনা ভাইরাস দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, মানবসভ্যতাও কী ভঙ্গুর ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে! ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ভারত কত অর্থ খরচ করছে মারণাস্ত্র তৈরিতে। ক্রয়ে। বিক্রয়ে। আধিপত্য বিস্তারে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের কথাও বলা হয়। কিন্তু যারা বলেন; আজ তাদের গলা কত শান্ত। কী অসহায়ত্বের স্বর। কারণ স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে গবেষণায় কী ব্যয় করেন তারা? কী বিপ্লব হলো সেখানে? আজ করোনা ভাইরাস শনাক্ত করার কিটস নেই। ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। সেখানে উন্নত-অনুন্নত বিশ^ আজ এক কাতারে দাঁড়িয়ে। আজ যেন ভাগ্যের হাতে বন্দি গোটা মানবসমাজ। ভাগ্য মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, স্বপ্নেও তার দিশা নেই।

একদিন যারা ভাগ্য উন্নয়নে পাড়ি জমিয়েছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। হয়তো তাদের অনেকের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু তারা এখন যেভাবে দেশে ফিরছেন; সেটা দুঃস্বপ্নেও হয়তো ভাবতে পারেননি কেউ। তবে হ্যাঁ, মানুষ মরবে এটাই জীবনের একমাত্র সত্য। তবে এভাবে মরতে কেউ চান না। হোক তিনি ইতালিয়ান, চাইনিজ, মার্কিনি, স্প্যানিশ বা বাংলাদেশি। যারা চলে গেছেন তারা ফিরে আসবেন না। কিন্তু দমকা হাওয়ার মতো ফিরে আসে স্মৃতি। ফিরে আসে চোখের জল। ফেরেন না আর মানুষটি। এই স্বজনহারা মানুষগুলোকে সান্ত¡না দেওয়ার কিছু নেই। তবে চিকিৎসকদের দিকে তাকিয়ে বারবার মনে পড়ে, ‘... তোমার হাতে রয়/ আমার হাতে ক্ষয়।’ আসলে মৃত্যু নিয়ে লেখার জন্য ল্যাপটপের কিবোর্ডে হাত রাখা নয়। কিন্তু চারদিকে মৃত্যু নিয়ে মানুষের মনে যে শঙ্কা, ভয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার সরব কিংবা নীরব উচ্চারণ, তাতে নিজের অজান্তে ক্রমাগত মনের মধ্যে ধূসরতা জমা হচ্ছে। টেলিভিশনের পর্দায় বিশ^জুড়ে এত মর্মস্পশী দৃশ্য, তাকে পাশে ঠেলে আপনি অন্য কিছু নিয়ে এগিয়ে যাবেন কীভাবে কিবোর্ডে হাত রেখে?

তবে ল্যাপটপে যা লেখা হচ্ছে, টিভি পর্দায় যা দেখানো হচ্ছে, সেটা করোনা ভাইরাসে বিপন্ন পৃথিবীর মর্মান্তকি ক্ষতি। টুকরো টুকরো বিষণœতা। বিষণœ মন ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ফিরে যায় ১০০ বছর আগের পৃথিবীতে। প্রথম বিশ^যুদ্ধোত্তর পৃথিবী। যুদ্ধের ক্ষত আর ধ্বংসাবশেষ তার বুকে। সেটা আরও ক্ষত-বিক্ষত হলো স্প্যানিশ ফ্লু নামের এক মহামারীতে, যা কেড়ে নিয়েছিল কোটি প্রাণ। সেই সময় এই বাংলায় জন্ম নিয়েছিলেন এক মানুষ। যার গোটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বাঙালি জাতির মুক্তি আর বিশ^ শান্তিতে। তার জন্মশতবর্ষে পৃথিবী আবার অশান্ত। বিপন্ন। এই বিপন্নতা কাটাতে, ভয়কে কাটাতে বঙ্গবন্ধুর কথাটাই বড় পাথেয়। ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।’ করোনা রুখতে নিজের ঘরেই দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আর অস্ত্রÑ সতর্কতা। সচেতনতা। সাবধানতা।

আজ শুধু বাংলাদেশ, বাঙালি নয়। বৈশি^ক এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবী। যে যুদ্ধে বারুদের গন্ধ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আকাশ-বাতাসে। তবে এক হয়ে লড়ছে পৃথিবী। প্রতিপক্ষ দুই শব্দের এক নামÑ করোনা ভাইরাস। গুলি-বোমা-পারমাণবিক অস্ত্র সবকিছু যেন অর্থহীন তার সামনে। নীরবে সে বড় করছে শুধু মৃত্যুর মিছিল। কেউ বলতে পারছেন না, কবে শেষ হবে এই যুদ্ধ। কোথায় শেষ হবে মৃত্যুর এই মিছিল। তবে শেষ একদিন হবেই। অপেক্ষা সেই দিনটার। তার আগে হয়তো ঝরে যাবে আরও কিছু অমূল্য প্রাণ।

অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

advertisement