advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনায় বন্ধ পরিবহন
চালক শ্রমিকের দিন কাটছে উৎকণ্ঠায়

তাওহীদুল ইসলাম
৩০ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২০ ০৯:০০
advertisement

পরিবহন খাতের লাখ লাখ চালক ও শ্রমিক এখন কর্মহীন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১০ দিন গণপরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে সরকারের নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বন্দর, গার্মেন্টস ইত্যাদি বন্ধ থাকায় অধিকাংশ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান চলছে না। তাই পণ্যবাহী যানের চালক-শ্রমিকদের অনেকেই এখন বেকার; কর্মহীনতার কারণে তারা পড়েছেন দারুণ অর্থ সংকটে। অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হলে না খেয়ে থাকতে হবে, এমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে তাদের দিন।

পরিবহন মালিকদের সংগঠন সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানিয়েছেন, শ্রমিকদের রোজ খোরাকি বাবদ ৩শ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। বেতনভুক্ত চালকরা মাসের নির্ধারিত বেতন পাবেন। তিনি বলেন, যারা বেতনভুক্ত নয়, তাদেরও খোরাকি দেওয়া হচ্ছে। এ তো গেল মালিকপক্ষের তরফে দেওয়া তথ্য। কিন্তু শ্রমিকদের সংগঠন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলছেন, ৩শ টাকা খোরাকি দেওয়া হচ্ছে, সত্যি।

তবে গুটিকয় শ্রমিককে, যারা রাত-দিন বাসে থাকছেন পাহারা দিতে, শুধু তাদেরই এ টাকা দেওয়া হচ্ছে। সেই ৩শ টাকার মধ্যে দুই আড়াইশ টাকা আবার চলে যাচ্ছে ওই শ্রমিকের তিন বেলার খাবারে। তার পরিবার কী খাবে? এর পর ওসমান আলী যোগ করেন, প্রতিটি বাসে চালক, সুপারভাইজার, হেলপারসহ সর্বনিম্ন তিনজন শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু পাহারার কাজে রাখা হয়েছে একজনকে। বাকি দুজনকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দুজন তো কিছুই পাচ্ছেন না। তারা কী খাবেন?

ওসমান আলী জানান, পরিবহন শ্রমিকদের জন্য রেশন চালু করার দাবি জানিয়ে গত শনিবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে শ্রমিক ফেডারশন। তিনি জানতে পেরেছেন, জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মাধ্যমে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে শ্রমিকদের। কিন্তু আরও সাহায্য প্রয়োজন। না হলে শ্রমিকরা করোনা থেকে বাঁচলেও খাবারের অভাবে মরে যাবে।

মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতের দাবি, যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকলে একদিনে পরিবহন খাতে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। ১০ দিনের গণছুটিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে। খোরাকি বাবদ যে টাকা দেওয়া হচ্ছে তা মালিকদের পকেট থেকে দেওয়া হচ্ছে।

গতকাল মহাখালী টার্মিনালে দেখা গেছে, অন্তত হাজারখানেক বাস পার্কিং করে রাখা হয়েছে। প্রতিটি বাসে পাহারায় আছেন একজন করে শ্রমিক। এনা পরিবহনের এক শ্রমিক জানান, তিনি বাসে থাকছেন, হোটেল থেকে খাবার এনে বাসেই খাচ্ছেন। টার্মিনাল থেকে কোথাও বের হচ্ছেন না। তাদের রোজ ৩শ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কথা বলার সময় সেখানে উপস্থিত হন এনা পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক আতিকুল আলম। তিনি জানান, শ্রমিকদের খোরাকির টাকা দিতে এসেছেন। রোজ এসে টাকা দিয়ে যাচ্ছেন।

টার্মিনালের ভেতরে অলস সময় কাটাতে দেখা যায় চালক-শ্রমিকদের। সেখানে কথা হয় ঢাকা-নেত্রকোনা রুটের শাহজালাল পরিবহনের চালক নাসির উদ্দিন এবং আশিক পরিবহনের চালক রেজাউল করিমের সঙ্গে। তারা জানান, বাস চললে তারা দিনে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করেন। কিন্তু করোনার কারণে বাস বন্ধ থাকায় ১০ দিনের জন্য সাকুল্যে দুই হাজার টাকা মালিকের কাছ থেকে

পাবেন খোরাকি বাবদ। অর্থাৎ দিনে ২শ টাকা। এ টাকায় তো একজনেরই খাবার খরচ হয় না। পরিবারের বিষয় তো পরে। সংসার চলছে অল্প জমানো যে টাকা আছে, তা দিয়ে। করোনার কারণে ‘লকডাউন’ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তা হলে তাদের জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়বে। মালিক যে পকেট থেকে টাকা দিচ্ছেন, তা তারা বোঝেন। কিন্তু চালক-শ্রমিকরাই তো গাড়ি চালান, তারাই তো শ্রমে-ঘামে মালিককে ধনী করেছেন। এখন যদি মালিক তাদের না দেখেন, তা হলে তারা কোথায় যাবেন? প্রশ্ন রাখেন তারা।

ঢাকা-টাঙ্গাইল-ধনবাড়ি-মধুপুর রুটের বিনিময় পরিবহনের বাসে চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করেন নুরুন্নবী। গাড়ি চললে বেতন, খোরাকি আর ‘এদিক-সেদিক’ করে দিনে প্রায় ৬শ টাকা আয় হয়। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তার আয়ও বন্ধ। মহাখালী টার্মিনালে পার্কিং করে রাখা বাসে রাত-দিন পাহারা দিয়ে দিনে ৩শ টাকা পাচ্ছেন খোরাকি বাবদ। তিন বেলার খাবার আর হাত খরচেই এ টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে। সংসারে কোনো টাকাই দিতে পারছেন না। এভাবে আর কদিন চললে তার পরিবারকে উপোস করতে হবে।

গতকাল রবিবার বিকালে মহাখালী টার্মিনালের একটি বাসে বসে এসব কথা জানান নুরুন্নবী। তার পাশেই তখন ছিলেন ঢাকা-জামালপুর-মাদারগঞ্জ রুটের রাজিব পরিবহনের হেলপার জসিম। তিনি জানান, টার্মিনালের হোটেলে দুবেলা ভাত খেতে দুশ টাকা খরচ হয়ে যায়। এর পর আছে চা-নাশতার খরচ। এসব খরচ মেটানোর পর হাতে কিছুই থাকে না।

একদিকে সংসারের দায়ভার নিয়ে চিন্তা, অন্যদিকে চৈত্রের গরমে দিন-রাত বাসে বসে বসে পাহারা দেওয়া, পাছে কিছু খোয়া গেলে তার দায়ভারও নিতে হবে, সে নিয়ে আরেক চিন্তা। এসব চিন্তাতেই কাটছে দিন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। সমস্যার পর সমস্যা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে, সুরাহা নেই। নেই বিকল্পপথ জানা।

advertisement
Evall
advertisement