advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মহাবিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজন জরুরি উদ্যোগ

ড. বদিউল আলম মজুমদার
৩০ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২০ ০০:৩৪
advertisement

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯-কে বিশ্বব্যাপী মহাদুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২৭ মার্চ পর্যন্ত সারাবিশ্বে এর সংক্রমণে ২৭ হাজার ৩৬০ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে। এরই মধ্যে বিশে^ ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৭২ জন এবং বাংলাদেশে ৪৮ জন ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন, যদিও এ সংখ্যার সঠিকতা নিয়ে অনেকের মনেই গুরুতর সন্দেহ রয়েছে (প্রথম আলো, ২৮ মার্চ ২০২০)। কারণ অনেক আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। এ ছাড়া অনেক সরকারই আক্রান্তের সংখ্যা গোপন করে বলে সন্দেহ রয়েছে। তবে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দিন দিন বাড়ছে, যদিও চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এর বিস্তার রোধ করা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

করোনা ভাইরাস নিয়ে সারা পৃথিবীতে এক মহা-আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ হলো, এটি একটি নতুন জাতের ভাইরাস বলে এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান এখনো সীমিত। এটি নতুন বলে সমাজে এর প্রতিরোধসম্পন্ন ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে অনপুস্থিত। এ ছাড়া ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। সর্বোপরি এর এখনো কোনো প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কৃত হয়নি, যদিও বিজ্ঞানীরা এতে সর্বশক্তি নিয়োজিত করছেন। আর আবিষ্কৃত হলেও তা বাজারে এসে সারা পৃথিবীর বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। উপরন্তু এটির বিস্তার ছড়ানো বন্ধ করতে অন্তত ৪৫-৭০ শতাংশ ব্যক্তিকে টিকা দিতে হবে, যাতে হয়তো কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। তাই করোনা ভাইরাসের সমস্যা অতি দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা করা যায় না।

করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের আরেকটি কারণ হলো, এটি যেভাবে সংক্রামিত হয়। এটি চোখ, মুখ ও নাক দিয়ে শরীরে ঢুকে সেলের মধ্যে সংযুক্ত হয়ে তাকে সংক্রামিত ও হাইজ্যাক করে ফেলে। এই হাইজ্যাক করা সেলই শরীরের রোগ প্রতিরোধক শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে এবং নতুন ভাইরাস তৈরি করে। সংক্রামিত সেল নিজের মৃত্যুর আগে লাখ লাখ ভাইরাস তৈরি করে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ জটিল হয়ে দাঁড়ায় যখন ভাইরাস ফুসফুস আক্রমণ করে তা অকার্যকর করে ফেলে। তখন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা প্রশমন করতে রোগীকে ভেন্টিলেটরে সংযুক্ত করতে হয়। তাই জটিলতার ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর ব্যবহার না করলে রোগীর মৃত্যু প্রায় অবধারিত।

করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের অন্য একটি কারণ হলো এর ভয়াবহতা সম্পর্কে ‘ডিনায়েল’ ও গণউদাসীনতা। যখন চীনের উহান প্রদেশে এর বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং রাস্তায় মৃত মানুষকে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তখনো আমরা ভেবেছি যে, এটি অনেক দূরান্তের চীনের সমস্যা এবং এটি আমাদের দেশে আসবে না। এর পর যখন অন্য দেশে, এমনকি আমাদের পাশের দেশে এর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, তখনো আমাদের মধ্যে ডিনায়েলের মানসিকতা কাজ করে। এ কারণেই ইতালির নেতারা এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের দেশে করোনা ভাইরাসের বিস্তার প্রতিহত করতে কোনোরূপ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বরং সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে বলে সমস্যাকে উড়িয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমান্বয়েই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ইম্পেরিয়াল কলেজের এক গবেষণায় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় যে, করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াবে ২.২ মিলিয়ন এবং যুক্তরাজ্যে পাঁচ লক্ষাধিক। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্র্কেলের মতে, ৭০ শতাংশ জার্মান এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এর ফলে পৃথিবীব্যাপী একটি অতুলনীয় মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।

অনেক দেশের তুলনায় আমরা বাংলাদেশে আরও বেশি ঝুঁকিতে আছি। এর একটি বড় কারণ হলো আমাদের গণবসতি। আরেকটি কারণ হলো করোনা ভাইরাস যেসব দেশে বিস্তার লাভ করেছে সেসব দেশ থেকে আমাদের প্রবাসীদের আগমন। অন্য একটি বড় কারণ হলো স্বাস্থ্য খাতে আমাদের দুর্বল অবকাঠামো (হাসপাতালের বেড, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ ইত্যাদি), যথেষ্টসংখ্যক পরীক্ষা কিট এবং স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রটেকটিভ গিয়ারের অভাব। এ কারণেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়া সত্ত্বেও, মূলত অবহেলার ফলেই সম্প্রতি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কানাডা ফেরত ২৪ বছর বয়স্ক ছাত্রীর অকালে প্রাণহানি ঘটেছে। এ ছাড়া গত কয়েক সপ্তাহে অগণিত প্রবাসী বিদেশ থেকে ফেরত এলেও, অতি নগণ্যসংখ্যকই কোয়ারেন্টিনে আছেন।

করোনা ভাইরাসের মহাপ্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী মানুষের জন্য জীবনের ঝুঁকিই সৃষ্টি করছে না, তাদের জীবিকার জন্যও চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মূল্য হারিয়েছে, যার ফলে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার কমে গেছে। এতে শুধু বিত্তশালীরাই নয়, সাধারণ মানুষও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ তাদের পেনশনের বড় অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়ে থাকে। মার্কিন শেয়ারবাজার ও বন্ড মার্কেটে বিদেশিদেরও ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে।

মার্কিন অর্থনীতির বড় অংশই সেবা খাত, যা করোনা ভাইরাসের দুর্যোগের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে এয়ারলাইন, হোটেল, রেস্টুরেন্টসহ অধিকাংশ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানেরই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দাই নয়, বরং মহামন্দা বা ডিপ্রেসন দেখা দিতে পারে। অসংখ্য মার্কিনি তাদের চাকরি হারাতে পারেন। আর এই মার্কিন মন্দার প্রভাব সারা পৃথিবীর অর্থনীতিতে পড়বে, কারণ অনেক দেশের উৎপাদিত পণ্যই সে দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। এর সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতো প্রভাব সৃষ্টি করবে অন্য বিত্তশালী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতিতে সৃষ্ট মন্দা। তাই সারা পৃথিবীর অর্থনীতি যে এক মহাদুর্যোগের মধ্যে নিপতিত হবে এতে কারোরই সন্দেহ থাকার কথা নয়।

এই মহাবিপর্যয়কে ঠেকাতে অনেক সমৃদ্ধ রাষ্ট্রই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু কিছু রাষ্ট্র করোনা ভাইরাস মোকাবিলার পরিস্থিতিকে যুদ্ধাবস্থার সঙ্গে তুলনা করে সে ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। করোনা ভাইরাসের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের সহায়তা করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্য অত্যন্ত ৩৩০ বিলিয়ন পাউন্ড পরিমাণের অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে। অন্যান্য দেশও পরিস্থিতিকে জরুরি মনে করে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে।

আমরা বাংলাদেশে মহাঝুঁকির মধ্যে রয়েছি, কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। করোনা ভাইরাসের কারণে আমাদের দেশে দল-মত নির্বিশেষে অসংখ্য ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটতে পারে। শুধু তাই নয়, আমাদের অর্থনীতিও মহাদুর্যোগের মধ্যে নিপতিত হতে পারে। ইতোমধ্যে আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পে কয়েক কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বহু তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে এবং অনেকে চাকরিচ্যুত হতে পারেন। ইতোমধ্যে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবা খাতে পাঁচ লাখ ব্যক্তির কর্মসংস্থান হ্রাস পেতে পারে বলে শোনা যায়। রেমিট্যান্স ছাড়া আমাদের সব অর্থনৈতিক সূচক ইতোমধ্যেই নিম্নগামী। আমাদের ব্যাংক ও আর্থিক খাত লাগামহীন লুটপাটের শিকার হয়েছে। সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি কর্মচ্যুত হয়ে দেশে ফেরত এলে দেশে করোনা ভাইরাস বিস্তারেরই শুধু সহায়তা করবে না, তা প্রবাসী আয়েও ধস সৃষ্টি করতে পারে। আর প্রবাসী আয়ে ধস নামলে এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কিছু বড় ব্যবসায়ী তাদের ঋণ পরিশোধে অপারগ হলে আমাদের ব্যাংক খাতে মহাবিপদ নেমে আসবে।

বর্তমানে অর্থনৈতিক খাতে আমাদের বিরাট সমস্যা রয়েছে। সমস্যা রয়েছে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও পেট্রোনেজ বিতরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অপচয়ের। এর সঙ্গে করোনা ভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্য খাতের এ সমস্যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য মহাবিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের জাতীয় বিপর্যয় সরকারের পক্ষে একা সমাধান করা সম্ভব হবে না, এ থেকে উত্তরণের জন্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে সবাইকে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে বলে আমরা মনে করি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে একতাবদ্ধ হয়ে অতীতে আমরা জীবন-মরণের সমস্যা সমাধান করেছি। এখনো সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে আমাদের পক্ষে তা আবারও করা সম্ভব হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

সম্ভাব্য মহাদুর্যোগ এড়াতে হলে সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এ লক্ষ্যে আমি সবাইকে গ্রামে গ্রামে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। আসুন আমরা ‘সবাই মিলে শপথ করি, করোনা ভাইরাসমুক্ত গ্রাম গড়ি।’ গ্রাম করোনা ভাইরাসমুক্ত করা গেলে সবাই নিরাপদ থাকবে, যার মধ্যে পাড়া-প্রতিবেশীর পাশাপাশি আমার নিজের স্বজনরাও অন্তর্ভুক্ত, কারণ প্রতিবেশীরা আক্রান্ত হলে আমার আপনজনদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আমি নিশ্চিত যে, সারাদেশের সচেতন মানুষরা এগিয়ে এলে আমরা গ্রামে গ্রামে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মতো দুর্গ গড়ে তুলতে পারব, যা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, দি হাঙ্গার প্রজেক্টের সঙ্গে জড়িত স্বেচ্ছাব্রতীরা আমাদের কর্ম এলাকার দেড় সহস্রাধিক গ্রামে এ কাজটি করার ইতোমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যাতে ‘সুজনÑসুশাসনের জন্য নাগরিকে’র সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করছেন। এ কাজে তারা তাদের নিজেদের একদিনের বেতন প্রদানেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজনÑসুশাসনের জন্য নাগরিক

advertisement