advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনা যুদ্ধে বিশ্ব আরও মানবিক হোক

ফরিদুন্নাহার লাইলী
৩০ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২০ ০০:৩৪
advertisement

বিশ্ব আজ একই স্রোতে অবস্থিত। দৃষ্টিগুলো যেন একইরকম। অধীর আগ্রহের দৃষ্টি। অশ্রুসিক্ত হৃদয়ভাঙা দৃষ্টি। হারানোর বেদনাটা এরকমই। মানবকুল আজ আক্রান্ত করোনা ভাইরাসে। রক্ত সে তো রক্তই। সে কখনো কোনো জাতপাতের বাছবিচার করে না। তার রঙটা একইরকম। এই যে দেখুন না! মানবজাতি কতই না হাঙ্গামা, ঝুটঝামেলা, মারামারি, কাটাকাটি, জাতিগত ভেদাভেদ, ধর্মে ধর্মে দ্বন্দ্ব, মানুষে মানুষে খুনোখুনি, গালাগালিতে ব্যস্ত। কিন্তু কখনো কি মানুষ নামের মানবজাতিকে আলাদা করা গেছে? সবার সৃষ্টির উৎস তো একই। কেউ ডাকে আল্লাহ, কেউ ভগবান, কেউ ঈশ্বর, কেউ প্রভু, কেউ সৃষ্টিকর্তা, কেউ বা অবিনশ্বর। এই তো। কেউ কি কখনো সৃষ্টির স্রষ্টাকে অস্বীকার করেছে? অস্বীকার হয়েছে? হয়নি। কিন্তু এই মানুষই বিভিন্ন সময়ে স্বার্থের জন্য জাতিগত দ্বন্দ্ব, দেশে দেশে দ্বন্দ্ব, ধর্মে-ধর্মে দ্বন্দ্ব, সাদা-কালো দ্বন্দ্ব, ধনী-গরিব দ্বন্দ্ব, পেশাজীবী-অপেশাজীবী দ্বন্দ্ব। কতই না দ্বন্দ্ব! কতই না অস্ত্রের ঝনঝনানি? কিন্তু কোনো দ্বন্দ্ব কখনই মানুষের পরিচয়কে অস্বীকার করতে পারেনি। যখনই কোনো দুর্যোগ এসেছে, মহামারী হয়েছে, কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় এসেছে মানব সৃষ্টির সেরা জীবের ওপর তখনই সবাই এক হয়ে গেছে। এটাই তো ধর্ম। এটাই তো মনুষ্যত্বের পরিচয়। এটাই তো মানবজাতি। এর আবার ভেদাভেদ কিসের? এই যে দেখুন, চীনের উহান শহরে দেখা দিল করোনা ভাইরাস। সবাই ভেবেছিল ভাইরাসটির সংক্রমণ সেখানেই সীমিত থাকবে। কিন্তু সেই করোনা ভাইরাস গোটা মানবজাতির মধ্যে আজ বিস্তার ঘটেছে। সুদূর চীনের উহানে উৎপত্তি হওয়া করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্বকে আজ গ্রাস করেছে। মানবজাতিকে গ্রাস করেছে। মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করছে। এই ভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্বের প্রতিটি মানুষ চিন্তিত, উদ্বিগ্ন, ভাবান্বিত। কীভাবে এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করা যায়? কীভাবে এই ভাইরাসের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করা যায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে দেশে দেশে কোনো বিভ্রান্তি নেই, কোনো ঝগড়াঝাঁটি নেই, কোনো হিংসা-বিদ্বেষের বক্তব্য নেই। সবাই যেন এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। একটাই লক্ষ্যÑ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হবে। কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান, কে কোন জাতের তা মুখ্য বিষয় নয়? মুখ্য বিষয় মানুষের সেবা দিতে হবে। সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। গবেষণা চলছে। শুধুই বাঁচার আশা। কে কোথায় বসবাস করবে, কে কোথায় থাকবে সেটা যেন মাথায় নেই। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ, প্রতিটি মানুষ আজ অসহায় সময় পার করছে। কীভাবে এই রোগের চিকিৎসা দেওয়া যায়, রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানী, বড় বড় চিকিৎসক, সেবা কোম্পানির কর্তারা গবেষণায় ব্যস্ত। কেউ বা রোগী, চিকিৎসকের পোশাক-আশাক তৈরিতে ব্যস্ত। কেউ বা খাদ্যদ্রব্য দিচ্ছে, চিকিৎসা দিচ্ছে, ওষুধ দিচ্ছে, কেউ বা আল্লাহর কাছে দোয়া-দরুদে ব্যস্ত, কেউ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় ব্যস্ত বা গির্জায়, কেউ ভগবানের কাছে প্রার্থনায় ব্যস্ত, কেউ প্রভুর কাছে। দেখুন তো কত মিল। এটাই তো মানবজাতি। এটাই তো মানুষ। এই মানুষের কারণেই হয়তো সৃষ্টিকর্তা দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন। যেখানে নেই কোনো দ্বন্দ্ব, নেই কোনো হিংসা...।

সবাই আজ মানবজাতির সেবায় নিয়োজিত। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এক কাতারে মিলিত হয়ে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ব্যস্ত। সবাই সবার বিপদে বাড়িয়ে দিয়েছে হাত। সবাই সেবায় ব্যস্ত। বিশ্ব আজ মৃত্যুর মিছিল আর লাশের মিছিলে। কেউ বলছে না অমুক দেশের লাশ, তমুক দেশের লাশ। সবাই বলছে মানুষের মরদেহ। সবকিছুই আজ থমকে দাঁড়িয়েছে। মানবতা আজ বিশ্ববাসীকে জানাচ্ছে মানুষের গুরুত্ব। কৃত্রিমতা আজ কতই অসহায়। অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়েই বাঙালিরা পথচলা শুরু করেছিল ’৭১-এ। আর সেই শিক্ষা যে আজও আমাদের চেতনাকে উজ্জীবিত করে রেখেছে তা সুনিশ্চিত।

১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের বিশাল সমাবেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের কিছু অংশ দিয়ে শেষ করছি, “আমি বৈদেশিক নীতি সম্বন্ধে একটা কথা বলতে চাই। আমার দলের নীতি হলো সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে আমাদের শত্রুতা নয়। আমরা পাড়াপড়শির সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে চাই। আমরা কো-অ্যাকজিস্টেন্সে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বশান্তিতে বিশ্বাস করি। আমি বিশ্ব দুনিয়ার বড় বড় শক্তিকে অনুরোধ করব যে টাকা, যে অর্থ, যে সম্পদ আপনারা অস্ত্রের জন্য ব্যয় করেন এবং সেই টাকায় আর্মামেন্ট যাকে বলা হয় তা যদি আপনারা বন্ধ করে এই অর্থের দশ ভাগও বিশ্ব দুনিয়ার গরিব মানুষের জন্য ব্যয় করতেন এ দেশে, এ দুনিয়ায় গরিব মানুষ থাকত না। তাতে আপনাদের ইজ্জত বাড়ত। আমি আপনাদের কাছে আবেদন জানাব, অস্ত্র তৈরি করা বন্ধ করেন। মানুষ মারার কল তৈরি করা বন্ধ করেন এবং সেই অর্থ দিয়ে যেখানে কোটি কোটি মানুষ আজ না খাওয়াÑ যেখানে কোটি কোটি মানুষ আজ কাপড় পরে নাÑ যেখানে কোটি কোটি মানুষ আজ বাড়ি নেইÑ যেখানে কোটি কোটি মানুষ আজ অশিক্ষিতÑ তাদের জন্য ব্যয় করেন। আপনাদের সম্মান দুনিয়ায় বাড়বেÑ মানুষ আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। অস্ত্র দিয়ে জয় লাভ করতে পারলে আপনারা দুনিয়ায় অনেকদিন জয় লাভ করতে পারতেন। আজ অস্ত্রের দিন ফুরিয়ে গেছে। আজ ভালোবাসা, মহব্বত মানুষের খেদমতের দিন এসে গেছে। সেদিকে আপনারা নজর রাখবেন আমি অনুরোধ করব।”

করোনা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে দিন শেষে মানুষ একই। নদী, সাগর, আকাশ, বাতাস, চন্দ্র, সূর্য, আলো, অন্ধকারে অবস্থানরত দেশগুলোর নাম আলাদা হলেও সবার পরিচয় মানুষ। ক্ষমতার মোহে নয়, মানবতার মোহেই হোক মানবিক বিশ্বের পরিচয়। সচেতন হই, মানুষের পাশে দাঁড়াই, করোনা ভাইরাস থেকে আল্লাহপাক সবাইকে রক্ষা করুক এই কামনা।

ফরিদুন্নাহার লাইলী : কৃষি ও সমবায় সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

advertisement