advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আমরা নিরস্ত্র হচ্ছি, পৃথিবী জেগে উঠছে

আজাদুর রহমান
৩১ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২০ ০০:৩৪
advertisement

আমাদের সবার ভেতরেই একটা চোরা টেনশন কাজ করছে, আমরা ঠিক কী কারণে টেনশন করছি, সেটা পরিষ্কার করে ধরতে না পারলেও এটা বুঝতে পারছি যে, করোনার কারণেই এই টেনশন। মুখে বলছি না, কিন্তু মনের অজান্তেই করোনায় আক্রান্ত হলে নিজেদের জীবনে কী পরিমাণ দুর্দশা নেমে আসবে সেই দৃশ্যে চলে যাচ্ছি, ফলে অবচেতন মনেই আমরা প্রেসার ফিল করছি। সমকালে সবাই মৃত্যু থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ কেউ মৃত্যু থেকে বাঁচতে বিদেশ থেকে পর্যন্ত পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে, অথচ এদিকে মৃত্যু যেন আমাদের দুয়ারে এসে দাঁড়িয়ে গেছে।

হঠাৎ করেই আমরা এখন গৃহবন্দি, সামলে নিতে কষ্ট হচ্ছে, তার ওপর বিশ্বের নানা দিক থেকে মৃত্যুর সংবাদ আমাদের মনোজগতে ক্রমেই এক ত্রাস তৈরি করে চলেছে অবিরত। সংসারের প্রত্যেক সদস্যের ধৈর্য ও মেজাজ যেন টং আর টানটান হয়ে আছে। সবার কপালে আজ বিষণœতার ছাপ, বুকে মৃত্যুভয়। কী হয়, কী হয়Ñ কখন না জানি বাঁধ ভেঙে বানের পানির মতো জেলায় জেলায় ঢুকে পড়ে করোনার রাহুগ্রাস। টিভি খুললেই স্নায়ুচাপ বাড়ছে, সবখানে শুধু করোনা আর করোনা, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে ইতালি, স্পেন, চায়না ও আমেরিকা। গোটা ইউরোপ যেন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে নীরব এক যমপুরী, আজ এক হাজার তো কাল দুই হাজার, পরের দিন তিন হাজার, লাফ দিয়ে দিয়ে চায়নাকে হার মানাচ্ছে মৃত্যুর মিছিল, আর থরথর করে কেঁপে উঠছে বিশ্ববাসীর অন্তরাত্মা। মৃত্যুভয় এমনভাবে দশদিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে যে, কে-কোথায়-কীভাবে-কতজন ঘাতে অথবা অপঘাতে মারা পড়ল, সেসবে মানুষের আর মন নেই, শোক নেই, এমনকি এই কদিনে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা গেলেন তার সংখ্যা কম করে হলেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতদের চেয়ে ১০ গুণÑ তাতে কী! করোনায় তো মরেনি! যখন বন্দুকের নলটা নিজের দিকেও তাক করা থাকে, তখন কে তাকায় অন্যের দিকে! ভেবেছিলাম, ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল, অঢেল আর লম্বা সময়ে মন মতন ঘুমিয়ে নেব, কিন্তু ঘুম হয় না। হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, মোবাইল অন করে করোনা আপডেট দেখি ২৪ হাজার থেকে মৃত মানুষের সংখ্যা সাড়ে ২৫ হাজার হয়ে যায়। অস্থির হয়ে উঠি, সেই অস্থিরতা মাড়িয়ে ভেসে ওঠে ট্রেনভর্তি মানুষ, পা দিয়ে ঠেসে ঠেসে বস্তায় ঘাস প্যাকিং করলে যেমন ট্যাপা মাছের মতো হয়ে ফুলে ওঠে, তেমনি ট্রেনের পেট ভর্তি করে ঢাকা শহর থেকে মানুষজন হৈ হৈ করে গ্রামে ফিরছে, তাদের চোখে দুঃখ নেই, ভয় নেই, তাদের চোখ চিকচিক করছে বাড়ি ফেরার আনন্দে, আমার ভ্রু কুঁচকে যায়, দৃশ্য বদল করতে চাই, দেখি হাজারে হাজারে মানুষ নদীতে ভাসছে, বাড়ি ফিরছে তারা, ফেরিতে জায়গা না পেয়ে পাটাতনের বাইরে বাদুড়ের মতো ঝুলে ঝুলে পড়েছে তারা। ঘুম হয় না, ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠি। সকালে টিভিতে সংবাদ দেখি, একজন মারা গেছে, পাঁচজন নতুন আক্রান্ত, মন খারাপ নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকি, বেশ কিছু কাক, দু-তিনটা অলস বিড়াল আর হরেক পাখির গুঞ্জন। শালিক, চড়–ই, দোয়েল... তারা আজ নির্ভয়, চঞ্চল। ঘিঞ্জি ফ্ল্যাট থেকে সব পাখি আমি দেখতে পাই না। কিন্তু ওদের কলরব আমার কানে ভেসে আসছে, আমি বুঝতে পারছি যে, কম করে হলেও গোটাত্রিশেক পাখি এসেছে আমাদের এই গলিতে। সামনের দালানের পায়ের কাছে ছোট্ট বাগানে দুটো হলুদ প্রজাপতি এসে তিড়িং-বিড়িং করে নাচছে। এই হলুদ প্রজাপতি দুটোকে আমি চিনি, বাল্যকালে ঠিক এদের সঙ্গে সঙ্গেই আমি খেলেছি, ধরেছি। পাখিদের স্বর আমি নিরীক্ষণ করলামÑ স্বরের মধ্যে আগের মতো ভয় নেই। পাখি, প্রজাপতি সবার মধ্যেই একটা সরলতা দোলা দিচ্ছে যেন। গাছে বৃষ্টি পড়লে যেমন সজীব আর প্রাণবন্ত হয়ে পড়ে এবং সহজেই তাদের স্বস্তি এবং আনন্দটা টের পাওয়া যায়, তেমন সরলভাবে একটা স্বস্তি যেন তাদের চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। সন্দেহ হলো, আচ্ছা চারদিকের নীরবতার কারণে এ রকম লাগছে না তো! কিন্তু না, এত পাখি একসঙ্গে আগে কখনো আমি দেখিনি। যেন বহুকাল বাদে ওরা নিজেদের ভূমি ফিরে পেয়েছে আবার। হলুদ প্রজাপতির দিকে তাকিয়ে ভাবি, যেসব খালে-বিলে নতুন পোনা এসেছে, সেগুলো হয়তো আজকাল অথবা পরশু জালে আটকা পড়তে পারত, আগাছা বলে যে উদ্ভিদকে কৃষক গতকাল কেটে ফেলতেন, সে হয়তো আজ বিচি ছেড়ে দিয়েছে মাটিতে, যে বক আজ ভয়ে ভয়ে পা ফেলছে, কাল সে হয়তো আরও নির্ভয় হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাতাসে ক্রমেই কার্বন ডাই-অক্সাইড কমতে থাকবে, পৃথিবীর তাবত জীব প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে থাকবে বিশুদ্ধ বাতাসে। একটা সবুজ পৃথিবীর কল্পনা মাথায় নিয়ে বসে থাকি। ভাবি, আমরা কি মৃত্যু থেকে পালিয়ে যেতে পারব! ব্রিটেনের বায়োলজিক্যাল মিউজিয়ামে একবার ডাইনোসরের বেশ কিছু ফসিল দেখেছিলাম, সঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক কিছু প্রাণীর মাথার খুলি এবং অন্য সব হাড়-পাঁজরের ফসিল দেখতে পেয়েছিলাম। বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সহজেই বলে দেওয়া যায়, একসময় ডাইনোসর পৃথিবীতে ছিল এবং তারা বহাল তবিয়তে এ পৃথিবীতে বিচরণ করে গেছে! এখন আর তারা নেই। তার মানে হলোÑ পৃথিবীর আবহাওয়া হঠাৎ করে অথবা ধীরে ধীরে বদলে যেতে যেতে এমন একটা পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, তাদের পক্ষে আর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি, ফলে তারা দলে দলে মারা পড়েছিল। আমরা এসবের খবর বা নাম-নিশানা কিছুই হয়তো পেতাম না, যদি না কিছু ডাইনোসর পাথরচাপা কিংবা লাভার মধ্যে পড়ে গিয়ে মারা না যেত। প্রকৃতির কাছে বিষয়টা খুব সাদামাটা একটা ব্যাপার। এই হলো প্রকৃতির খেলাÑ একটা ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স। প্রকৃতি নিজেই এই ব্যালান্স করে। মানুষবিনাসী করোনার গ্রাস প্রকৃতির ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স নয় তো! আজ এই সাবলীল প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, সত্যি তো প্রকৃতির ওপর যাচ্ছেতাই অত্যাচার করেছি আমরা, নির্যাতন করেছি, চাবুক চালিয়েছি। আর এই যে পাখি প্রজাপতি পশু যারা এতদিন আমাদের ভয়ে ছিল, তারা আজ আনন্দিত, উদ্বেলিত। এতদিন আমরা যেন তাদের বাচ্চাদের, তাদের মাতা-পিতাদের, প্রতিবেশীদের হত্যা করেছি। বিরাট এক খুনি গোষ্ঠী যেন তাদের ছিঁড়ে-খুঁড়ে খেয়েছে এতকাল। একটা পাখি বা একটা ছাগল তাদের চোখ দিয়ে আমাদের ঠিক কী রূপে দেখে! তারা হয়তো দেখেÑ এরা আমাদের আত্মীয়স্বজনকে খুন করেছে, পিতা-মাতাকে খুন করেছে, এদের দেখলে সরে যাও, পালিয়ে যাও, উড়ে যাও। আর করোনা! সে তো এককোষী এক অনুজীব মাত্র, উপযুক্ত পোষকদেহ পেলে সেখানে সে তার জীবনচক্র সমাধা করে, এই যা। এতেই আমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। এতেই আমরা তাকে প্রাণপণে ঘৃণা করছি, সব ঠিক আছে, জীবন বাঁচাতে অবশ্যই আমরা এর বিরুদ্ধে সব রকম প্রতিরোধ গড়ে তুলব। কিন্তু এটাও তো ভাবা উচিত, এতদিন সারা দুনিয়ার সব জীব তাদের চোখ দিয়ে আমাদের কীভাবে দেখেছে! তাদের চোখে আমরা কিন্তু করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর! আমরা পরিকল্পনা করে হত্যা করেছি, খেতে খেতে উল্লাস করেছি, করোনা ভাইরাস কিন্তু উল্লাস করছে না! আমরা পশু হত্যা করছি, খাবার ফেলে দিচ্ছি, কিন্তু তাদের বিন্দুমাত্র সরি বলছি না, দুঃখিত হচ্ছি না। একবারও জীবজগতের দিকে তাকিয়ে বলছি না, ভাই সরি।

আজ গৃহবন্দি হয়ে চারপাশের পাকপাখালির আনন্দ গুঞ্জন দেখে মনে হচ্ছে, বিশাল এই জীবজগতের ভেতর আমি যেন শঙ্কিত, কুণ্ঠিত, লজ্জিত এক ক্ষুদ্র সদস্যমাত্র। মনে হচ্ছে অন্য প্রাণীর চোখ হয়ে, গাছেদের চোখ হয়ে নিজেকে দেখি। আমরা কত নির্মম! কতটা দখলদার! পৃথিবীতে যদি কাউকে সত্যিকার অর্থেই উত্তম জীব বলতে হয়, তবে সেটা হলো গাছ। অঙ্কুরিত হয়ে প্রথম দুটি পাতা যেদিন সে এই পৃথিবীতে মেলে দিয়েছিল, সেদিন থেকেই সে অক্সিজেনের উদ্বোধন করেছিল, আর আমাদের পচা ক্লেদ বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে তুলে নিয়েছিল। সে আমাদের সৌন্দর্য এবং সুবাস দিয়েছে, ফুল এবং অন্ন-আহার দিয়েছে, দোলনা থেকে খাটিয়া পর্যন্ত সে শুধু আমাদের দিয়েই গেছে, নিজের শরীরটাকেও জ্বালিয়ে দিয়ে যায় সে আমাদের জন্য।

এ কথাগুলো যখন লিখছি টেলিভিশনের প্রতিবেদনে তখন কক্সবাজারের জনশূন্য সৈকত দেখানো হচ্ছে, মানুষের থাবা উঠে যাওয়ার পর ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিন চলে এসেছে সৈকতের অগভীর জলে। ফিনকি দিয়ে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে তাদের শরীর থেকে। করোনার আগ্রাসনে সারাদেশ বিপদগ্রস্ত, সদাশয় সরকার চেষ্টা করছে, সাধারণ সচেতন মানুষ যার যার জায়গা থেকে চেষ্টা করছে। ভ্যাকসিন নেই, প্রতিষেধক নেই করোনা থেকে বাঁচতে, সবাইকে বাঁচাতে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকাই আপাতত উত্তম প্রতিষেধক। ...ডলফিনদের জলকেলি দেখতে দেখতে করোনার খবর চলে আসে, মন খারাপের আগেই চ্যানেল পাল্টাই, উঠে যাই, বারান্দায় বসি, ঝলমলে প্রকৃতি দেখি-ভাবি, কোয়ারেন্টিনের পর আমরা একটু হলেও অন্যরকম সবুজ এক পৃথিবী পাব।

আজাদুর রহমান : সাহিত্যিক ও গবেষক

advertisement