advertisement
advertisement

পৃথিবী আবার শান্ত হবে

রুমানা রাখি
৩১ মার্চ ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২০ ০০:৩৪
advertisement

‘আজ অশান্ত দিন/বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ/তবু পথ চাওয়া অবিরাম...’ নচিকেতার এই গান সঙ্গী করে বেঁচে আছি আমরা। বেঁচে আছি ঠিকই কিন্তু এ বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত ভয়ে কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের। একটু বেঁচে থাকার প্রত্যাশায় সবাই নিজেদের লুকিয়ে রেখেছি ঘরের মধ্যে। কিন্তু না লুকিয়েও বা উপায় কী? আমরা ঘরে না থাকলে আমাদের পরিবার ভালো থাকবে না, আমাদের চারপাশের প্রিয়জনরা ভালো থাকবেন না। তাই এই লুকিয়ে থাকা শুধু আমাদের জন্য নয়, আমাদের প্রিয়জনদের জন্যও।

যুক্তরাজ্যের রাজধানীতে শীতের প্রকোপ কমে গিয়ে এসেছে বসন্ত। এলাকার চেরিগাছগুলো ফুলে ফুলে ভরে গেছে। তবে রাজধানীর এ ঐতিয্যবাহী বসন্তের উৎসব, চেরি ফেস্টিভ্যালের আমেজ এ বছর একেবারেই ভিন্ন। মনে হয়, শূন্য বাগানে সাজিয়ে রেখেছে মালি। কিন্তু এর কোনো মালিক নেই।

গত ডিসেম্বরে যখন চীনে প্রথম করোনা ভাইরাসের সংবাদ চোখে পড়ে, তখনো মনে হয়নি কোনো অচেনা ভাইরাস পুরো পৃথিবী স্তব্ধ করে দেবে। ডিসেম্বরেও যেখানে করোনা ভাইরাস একটি দেশের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, আজকের দিনে এসে তা ১৯৯টির বেশি দেশ ছুঁয়ে গেছে। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার ২৯ জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশটিতে করোনা ভাইরাসে মৃত্যু হয় ১৭০ জনের। আর তখন চীনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৭১১। যখন এ প্রতিবেদনটি পড়ি, তখন মনে হয়েছিল হয়তো চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড হয়ে ভাইরাসটি বিলীন হয়ে যাবে। বড়জোর ২০০ মানুষ এই অজানা ভাইরাসে মারা যেতে পারে, এর বেশি নয়। আমি বিজ্ঞানী বা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নই বলে হয়তো এমন ধারণা করেছিলাম। ধারণা কিছুটা পাল্টে গেল মাত্র ১০ দিনের মাথায়। ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনে মৃত্যুর মাত্রা বেড়ে গেছে ২০ শতাংশ। কিন্তু তখনো ভাবনায় আসেনি এমন ভাইরাস সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে পুরো পৃথিবী গ্রাস করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

করোনা আজ পৃথিবীকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, প্রতি মিনিটে একজন করে মানুষ মারা যাচ্ছে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে। মাত্র এক মাস আগেও যেখানে ভাইরাসে মৃত্যু হাজার পার করেনি, সেখানে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে তা ৩৪ হাজার পার করে ফেলেছে। বিশ্বের সব দেশের করোনা ভাইরাস সম্পর্কে তথ্য আপডেট পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ডওমিটারস নামের একটি ওয়েবসাইটে। এই ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, লন্ডন সময় রাত ১টা ৪৩ মিনিটে বিশ্বে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লাখ ৩০ হাজারের ১৮৭, মৃত্যু ৩৪ হাজার ২, সুস্থ হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১৮, লাইফ সাপোর্টে আছে ২৬ হাজার ৭৭৩ ও বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে ৫ লাখ ৯০ হাজার ৯৩।

ওপরের তথ্যগুলো দেখলেই বোঝা যায়, মাত্র এক মাসে অজানা এক ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীকে ওলটপালট করে দিয়েছে। চীনে মৃত রোগীদের ওপর গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, ভাইরাসটিতে সব থেকে বেশি ঝুঁকিতে আছেন বয়স্করা। তাই হয়তো, তরুণরা অনেক নির্ভয়ে ছিলেন। কিন্তু ওয়ার্ল্ডওমিটারসের তথ্য মতে, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে এরই মধ্যে আনুমানিক ২২ শতাংশ ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে ৮ শতাংশ, ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে ৩.৬ শতাংশ, ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে ১.৩ শতাংশ, ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে দশমিক ৫ শতাংশ, ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে দশমিক ২ শতাংশ, ২০ বছরের ঊর্ধ্বে দশমিক ২ শতাংশ রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে পরিসংখ্যান বিভাগ শতভাগের পুরোপুরি ডেটা দিতে পারেনি। ওয়েবসাইটের ডেটার বাইরে গিয়ে যখন আমরা আন্তর্জাতিক পত্রিকাগুলোয় চোখ রাখি, তখন মনে হয় ভাইরাসটি কাউকে ছাড়বে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, কোনো মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গেলেও তার ফুসফুসের ৪০ শতাংশ নষ্ট হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

গত ২৪ মার্চ বিবিসির এক প্রতিবেদনে ২১ বছরের এক নারীর মৃত্যুর সংবাদ ছাপা হয়। সেখানে বলা হয়, কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াই করোনা ভাইরাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তাই আমরা যারা এতদিন জানতাম, বয়স্করা রোগটিতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন কিংবা যারা মারা যাচ্ছেনÑ ওই ধারণাটি পরিবর্তন হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, ভাইরাসটি এরই মধ্যে ৩৮০ বার তার ধরন পরিবর্তন করেছে। তাই পরিবর্তিত ধরনে কাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে, তা গবেষকরা বলতে পারছেন না।

গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাস যেভাবে বয়স্কদের কেড়ে নিচ্ছে, এতে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ। কারণ অভিভাবক ছাড়া দেশগুলো চালানো অনেক কঠিন হবে দেশরক্ষকদের। একই সঙ্গে যারা বেঁচে থাকবেন, তারা কর্মক্ষমতা হারাবেন।

এ তো গেল বর্তমান পরিস্থিতি। তবে করোনা নিয়ে যারা গবেষণা করছেন, তারা বলছেন আগামী জুন-জুলাইয়ের শেষে এসে ভাইরাসটির প্রকোপ কমতে পারে। তবে ওষুধ আবিষ্কার হতে সময় লাগবে আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত।

এগুলো তো আশার বাণী। তবে নিরাশার বাণীও দিচ্ছেন গবেষকরা। যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকরা বলেছেন, করোনা ভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে ২২ লাখ মানুষ প্রাণ হারাবে। যুক্তরাজ্যে ৫ লাখের বেশি প্রাণ হারাবে।

এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের কোনো ওষুধ বের হয়নি। তাই গবেষকরা যা বলেন, তা-ই আমাদের ভরসা। ভয় পেয়েও নিজেদের সুস্থ রাখার চেষ্টা। একেক গবেষক একেক কথা বললেও আশা আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে।

লেখা শুরু করেছিলাম নচিকেতার গানের অংশবিশেষ দিয়ে। ওই গানের শেষ লাইনগুলোই হোক আজকের লেখার শেষ লাইন। আমি আশাবাদী মানুষ। তাই আশায় বুক বাঁধি বারবার। নচিকেতার গানের মতেই বলতে চাইÑ ‘একদিন ঝড় থেমে যাবে/পৃথিবী আবার শান্ত হবে/বসতি আবার উঠবে/আকাশ আলোয় উঠবে ভরে/জীর্ণ মতবাদ সব ইতিহাস হবে-পৃথিবী আবার শান্ত হবে... পৃথিবী আবার শান্ত হবে।’

রুমানা রাখি : সাংবাদিক

advertisement