advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে

মো. জহির উদ্দিন
৩১ মার্চ ২০২০ ১৩:২৭ | আপডেট: ৩ এপ্রিল ২০২০ ০৮:২২
ছবি : গেটি ইমেজেস
advertisement

গত এক শতকে ভয়াবহ বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিপথ হারিয়ে অনেকাংশে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে গত কয়েক দশক থেকে বরফের পাহাড় দ্রবীভূত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের বরফ পর্বতটি প্রতি বছর প্রায় ২৬০ গিগাটন বরফ হারিয়েছে, ২০১১/১২ সালে সর্বোচ্চ ৪৮৮ গিগাটন ক্ষতি হয়েছিল। ২০১৯ সালে এটি হারিয়েছে প্রায় ৪৮৮ গিগাটন।

সম্প্রতি দেখা গেছে, এন্টার্কটিকা মহাদেশের কিছু কিছু জায়গায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি এবং রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কিছুটা ওপরে। স্বাভাবিকভাবেই এন্টার্কটিকা মহাদেশের বরফ গলতে শুরু করেছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কয়েক ইঞ্চি বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী পড়বে হুমকির মুখে, ডুবে যাবে কয়েক মিলিয়ন একর ভূমি এবং পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ হতে পারে বাস্তুহারা।

অন্যদিকে, প্লাস্টিক এবং পলিথিন এর  অযাচিত ব্যবহারের মাত্রা দিনের পর দিন বেড়েই চলছে। সাগর এবং মহাসাগর যেন এক একটা প্লাস্টিকের এবং পলিথিনের ভাগাড়। এর ফলে ব্যঘাত ঘটছে জলজ প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন। পাশাপাশি বিলুপ্তির পথে অনেক জলজ প্রজাতি। প্লাস্টিক ও পলিথিন দীর্ঘকাল মাটিতে অবস্থান করার কারণে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে অনেকাংশে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি জলবায়ুর উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে; যার ফলে হচ্ছে অতিবৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টি।

গত কয়েক দশকের তুলনায় বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ এবং অসময়ে দূর্যোগ হানা দিতেছে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে; যার ফলে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন হুমকির মুখে পড়ছে এবং দেখা দিয়েছে প্রাণীদের খাবারের তীব্র সংকট অথবা প্রাণীদের খাবারের অধিকাংশই দূষিত।

অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং অনেকগুলো বিলুপ্তির পথে। বৈশ্বিক উষ্ণতার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বায়ুদূষণ, বাতাসে সীসার পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ এবং বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনভাবে এর ক্ষতির স্বীকার হচ্ছেন। এই বায়ুদূষণ মানুষের ফুসফুসের ক্ষতির পাশাপাশি প্রকৃতির ফুসফুসকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্ব মোড়লদের আনবিক, পারমাণবিক, হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষামূলক তান্ডবে পৃথিবীর হৃদপিণ্ড কাঁপছে মুহুর্মুহু, প্রকৃতির স্নায়ুতন্ত্র প্রায় বিকল অবস্থায় উপনীত হয়েছে। বিশ্ব মোড়লেরা যেন পৃথিবীর প্রাণরস চুষে নিয়ে গিয়েছিল এবং প্রকৃতি যেন তার স্বাভাবিক পথ খুজে ফিরছিল বহুকাল থেকে।

পৃথিবীকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে এবং গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর নিঃসরণ কমাতে ২০১৫ সালে প্যরিস চুক্তির হয়েছিল, স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল এবং কার্যকর হয়েছিল ৪ নভেম্বর, ২০১৬ সালে। প্যারিস চুক্তি কিয়োটো প্রোটোকলকে (গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর নিঃসরণ কমানো জন্য তৈরি করা একটি পূর্ববর্তী আন্তর্জাতিক চুক্তি) উন্নত ও প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

প্যারিস চুক্তিতে বিশ্বের ১৯৭ টি দেশ স্বাক্ষর করেছে এবং নভেম্বর ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৮০ টি দেশ অনুমোদন করেছে । এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি প্রতিরোধের জন্য বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া জোরদার করা, যাতে এই শতাব্দীতে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে না যায় এবং তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা চালানো ।

কিন্তু হতাশার কথা হলো যে, বিশ্ব মোড়লদের চাপে চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার বৃদ্ধি করে, এমন জিনিসের ব্যবহার কমানোর জন্য মাইলফলক ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিবছর। কিন্তু বাস্তবে এর সিকিভাগও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ সুইডেনের কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গ কোপ-২৫ এ এক বক্তৃতায় পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করেছেন বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাদের এবং বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয়ের বিভিন্ন উদাহরণ টেনে, যুক্তি দিয়েও বিশ্ব মোড়লদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ক্রমাগত পরিবেশ দূষণের ফলে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক গতি হারানোর পথে। বলা যায়, প্রকৃতির এই স্বাভাবিক পথে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুযোগ করে দিয়েছে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে আতঙ্কিত নাম করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)।  

এই ভাইরাসের বিস্তার এত ভয়ংকর যে বিশ্বের ৭০ ভাগ দেশ এর ছোবলের স্বীকার। এই ভাইরাসের বিস্তারের হার অতীতের যেকোনো ভাইরাসের চেয়ে বেশি এবং আশঙ্কার বিষয় হলো এর ধরন প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল, এর ফলে এর স্থায়িত্ব নিয়ে কোনো কিছু এখনই বলা মুশকিল। এই করোনাভাইরাস বিশ্ব মোড়লদের শক্তি শক্তি খেলা কয়েক মাস/বছরের জন্য থামিয়ে দিয়েছে; নেই কোনো আনবিক, পারমাণবিক, হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষামূলক তাণ্ডব।

বায়ুদূষণ কমছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা স্বাভাবিক পর্যায়ে বিদ্যমান, সমুদ্র যেন ফিরে পেয়েছে প্রাণ। সর্বোপরি, প্রকৃতি যেন কত শত-সহস্র বছর পর প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আপন মনে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার  সহ বিশ্বের অন্যান্য সমুদ্র সৈকতে ডলফিন, তিমি ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রজাতির দেখা মেলেনি অনেক বছর, জনমানবশূন্য সমুদ্র সৈকতগুলোতে দেখা মিলছে ডলফিন, তিমি ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রজাতির।

প্রকৃতির কান ফাটানো শব্দ দূষণ থমেকে গেছে, বধির অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে এই সুন্দর প্রকৃতি। ভোরবেলা পাখির সুমধুর কণ্ঠে পৃথিবীর ঘুম ভাঙে এবং ঝামেলাহীন দিন কাটিয়ে আবার রাতে ঘুমাতে যায়। বিশ্ব মোড়লেরা ভুলেই গিয়েছে যে, পৃথিবীর একটা স্বাভাবিক গতি আছে, নিজস্ব নিয়ম আছে; একে বেশি দিন বশে রাখা যায় না। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মকে বাধাগ্রস্থ করলে, এই পৃথিবীর মানুষ এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারবে।

এটা ধারণা করা হয় যে, বর্তমান সভ্যতার আগেও অনেক সভ্যতার আবির্ভাব হয়েছিল এবং বেশির ভাগই প্রকৃতির প্রতিশোধের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির উপর অধিকমাত্রায় অত্যাচার হলেই ভারসাম্য রক্ষার জন্য, প্রকৃতি তার গতিপথ বদল করে এবং এর প্রভাব গোটা মানব জাতিকে বহন করতে হয়।    

লেখক : সহ-প্রধান গবেষক

বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রাম (বিসিসিপি)

সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

advertisement
Evall
advertisement