advertisement
advertisement

মানুষকে ঘরে রাখাই চ্যালেঞ্জ

আহমদুল হাসান আসিক
১ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ এপ্রিল ২০২০ ০১:৪১
ঘরে থাকতে বলা হলেও বাইরে বের হচ্ছেন লোকজন
advertisement

করোনার সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। এটি বিবেচনায় নিয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকে ১০ দিনের (২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। পাশাপাশি করোনার সংক্রমণ রোধে সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বলা হয়, নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ যেন বাইরে বের না হন। এরই মধ্যে সাধারণ ছুটি বেড়ে গেছে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। অন্যদিকে করোনা রোধে সরকারের নির্দেশনা পালনের এক সপ্তাহ পূর্ণ হলো আজ বুধবার। প্রথম দিকে সাধারণ মানুষ সতর্কতার সঙ্গে সরকারের নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেও দিন যত গেছে ততই তা ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। সর্বশেষ পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, নিতান্ত প্রয়োজনে তো বটেই, যাচ্ছেতাই কারণেও মানুষ বেরিয়ে আসছেন ঘর থেকে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ বলছেন, পেটের প্রয়োজনে বের না হয়ে উপায় নেই। অতিদরিদ্ররা দলবেঁধে সাহায্যের আশায় বসে পড়ছেন মোড়ে মোড়ে। তারা বলছেন, ঘরে খাবার নেই বলেই পথে নামতে হয়েছে। নানান ছুতোয় রাস্তায় ভিড় করছেন তরুণরা। এমনকি ঘরে থাকতে থাকতে একঘেয়েমিতে ভুগছেন বলে কেউ কেউ গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হয়ে গেছেন সদলবলে বা সপরিবারে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। অনেকটাই ভেস্তে গেছে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার বিষয়টি; বিশেষ করে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত সর্বত্র দেখা গেছে শত শত মানুষ। দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তাই অনেক বেড়ে গেছে। মানুষকে ঘরে রাখতে পারাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতকাল রাজধানীর সড়কগুলোতে দেখা গেছে, যানবাহনের চাপ বেড়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানম-ি, মোহাম্মদপুর, বিজয় সরণি, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে এবং প্রশাসনের মাঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরবাসীর অনেকেই এখন ছোট-বড় হেতুতে তো বটেই, অহেতুকও ঘর থেকে বের হচ্ছেন। তাদের বলে-কয়েও ঘরে ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না।
মাঠপর্যায়ের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সাধারণ ছুটির প্রথম দুদিন নগরবাসী বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি। দিন যত গড়াচ্ছে, ততই এ সতর্কতায় ঢিলেভাব বাড়ছে। গত সোমবার এবং গতকাল মঙ্গলবার তো মনেই হয়নি, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে কার্যত লকডাউন চলছে রাজধানীতে। প্রথম দিকে প্রশাসন ও পুলিশ জনসাধারণকে ঘরে রাখতে অনেকটাই ছিল কঠোর। তদুপরি নগরবাসীর সতর্কতাও ছিল টান টান। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে অতিউৎসাহী কিছু পুলিশ সদস্য এবং প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার অমানবিক, বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে দেশব্যাপী বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যশোরের মণিরামপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসান তিন বৃদ্ধকে কান ধরে ওঠবস করানোর পর সেই অপমানজনক কা- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়, যার ফলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ছি ছি পড়ে যায়; এ কারণে ওই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। অনেক পুলিশ সদস্যও প্রথম দিকে বলপ্রয়োগ করলে তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এ কারণে পুলিশ সদর দপ্তর এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে নগরবাসীকে ঘরে ফেরাতে এখন আর কেউ ঝুঁকি নিচ্ছেন না। তারা এখন বুঝিয়ে নগরবাসীকে ঘরে ফেরার কৌশলে এগোচ্ছেন। কিন্তু এতে করে তেমন সফলতা আসছে না। এদিকে বলপ্রয়োগের নীতি থেকে সরে এসে কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হুমকিতে ফেলবেন না, এমন কথা বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টও দিচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা আমাদের সময়কে বলেন, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সারাদেশের মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে আইনবহির্ভূত কোনো কর্মকা-ে যেন পুলিশ সদস্যরা জড়িত না হোন, সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতসহ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কাজ করছে পুলিশ।

সরেজমিন চিত্র : মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে মহাখালীর আমতলী ফ্লাইওভারের নিচে ৯-১০ জন নারীর একটি জটলা দেখা গেল। তারা সবাই নিম্নআয়ের মানুষ। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই সাবিনা আক্তার নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী জানালেন, তারা কড়াইল বস্তিতে থাকেন। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। করোনার কারণে তাদের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ঘরে খাবার নেই। উপরন্তু মাসের শেষ হয়ে এলো বলে। মাস পেরোলেই আসবে ঘরভাড়ার চাপ। তাই খাবারের আশায় তারা অবস্থান নিয়েছেন। শুধু আমতলীই নয়, পুরো রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে এমন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে গত দুদিনে এই প্রবণতা অনেক বেড়েছে। নিম্নআয়ের মানুষ সড়কে নেমে আসছে।

এদিকে গতকাল দুপুরে মহাখালীর আইসিডিডিআরবির মিলগেটের দক্ষিণ পাশের গলির মুখে তিনজন পাউরুটি ও সিগারেট ফেরি করছিলেন। সেখানে অন্তত ১৫ জন মানুষের জটলা। কেউ পাউরুটি কিনছেন, কেউবা সিগারেট। পরস্পরের গাঘেঁষেই চলছে কেনাকাটা।

প্রায় ৪০ বছর বয়সী বিক্রেতা আবুল হাশেম জানান, তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে মহাখালী সাততলা বস্তিতে থাকেন। সিগারেট ফেরি করেন। পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পাঁচ দিন ধরে ঘরে থাকলেও জীবিকার তাগিদে তিনি এখন আর পারছেন না। অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি সিগারেট বিক্রি করতে রাস্তায় নেমেছেন। এমন চিত্র রাজধানীর প্রায় সব এলাকাতেই লক্ষ্য করা গেছে।

এদিকে বিকালে ধানমন্ডি, তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মূল সড়ক এবং অলিগলিতে সাধারণ মানুষ কোনোরকম সামাজিক দূরত্ব মানছেন না; স্থানে স্থানে মানুষের জটলা। কোথাও কোথাও চলছে দলবেঁধে আড্ডা। বিশেষ করে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের আশপাশের সড়ক, তাজমহল রোড ও হুমায়ূন রোডে দেখা গেছে, সড়কে শত শত মানুষ। অনেকে আবার শিশুদেরও সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছেন। মগবাজার, মালিবাগ, রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায়ও ছিল একই চিত্র। বিকালে মোহাম্মদপুরের হুমায়ূন রোডে সাইয়া হক নামে এক নারীকে তার তিন বছরের শিশুসন্তানকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে দেখা যায়। জানতে চাইলে তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরে কোথাও করোনা ছড়ায়নি, তাই রাস্তায় বের হয়েছেন।

এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অনেক পাঠাও ও উবার চালকও গতকাল রাস্তায় নেমেছেন। এ বিষয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, অল্প হলেও পাঠাও ও উবারচালক রাস্তায় নামছে। সরেজমিনও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের সামনে দুজনকে দেখা গেল মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রী আহ্বান করছেন। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইলে তারা কিছু বলতে রাজি হননি।

নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় গতকাল গাড়ির চাপও অনেক বেড়েছে। মোহাম্মদপুর এলাকায় দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা গতকাল বিকালে আমাদের সময়কে বলেন, ফাঁকা রাস্তায় অনেকেই নিজস্ব গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন। অনেক তরুণও বের হচ্ছেন মোটরসাইকেল নিয়ে। আজও (মঙ্গলবার) দুই তরুণকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের সতর্ক করে অভিভাবকদের মাধ্যমে বাসায় ফেরত পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে নগরবাসীর বাইরে বের হওয়া কমানোর চেষ্টা করছি। যারা বাইরে বের হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই ওষুধ কেনার অজুহাত দেখাচ্ছেন। প্রেসক্রিপশন চাইলে তারা কমন কিছু ওষুধ যেমন নাপা বা প্যারাসিটামল ওষুধের নাম মুখবুজে বলে দিচ্ছেন। জরুরি কারণ দেখালে আমাদের অনেক সময় কিছুই করার থাকে না। এসব বিষয়ে জোর খাটানোও বারণ। কারণ তাতে আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাম উল্লেখ করে পোস্টও চলে যেতে পারে। এসব পোস্ট ভাইরাল হতে সময় লাগে না। তিনি দুঃখ করে বলেন, আমরা পড়েছি শাঁখের করাতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, সাধারণ ছুটির প্রথম দিকে মানুষ ঘরেই ছিলেন। অনীহা সত্ত্বেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। এর সুফলও আমরা পাচ্ছিলাম। কিন্তু যখন দেখা গেল, আমাদের দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কম, তখন সাধারণ মানুষের মনের উদ্বেগ, শঙ্কা, ভয়ও কমতে শুরু করল। এখন তারা মনে করছেন, তাদের আর কিছু হবে না। এ কারণে তারা বাইরে বেরিয়ে আসছেন। নাগরকিদের ঘরে রাখতে হলে কিছু সামাজিক কৌশল প্রয়োগ করা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন, তাদের সহনশীলতার পাশাপাশি হতে হবে কঠোরও। কারও প্রতি মারমুখী বা তার সামাজিক অবস্থান ক্ষুণœ হবে এমন আচরণ না করে কঠোর হতে হবে অত্যন্ত সতর্কতা ও সহনশীলতার সঙ্গে। তবেই তাদের ঘরে রাখা যাবে। আরেকটি বিষয় হলোÑ ঘর থেকে অপ্রয়োজনে বের হলে আইন করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন যারা অপ্রয়োজনে বের হবেন তাকে দিয়ে করোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সামাজিক কাজ করানো যেতে পারে। পরে তিনি কাজের ভয়ে বা শাস্তির ভয়ে ঘর থেকে বের হবেন না। আর্থিক অবস্থান অনুযায়ী জরিমানাও করা যেতে পারে। এভাবে কিছু কৌশল অবলম্বন না করলে নগরবাসীকে ঘরে রাখা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।

এই সহযোগী অধ্যাপক আরও বলেন, জনপ্রতিনিধিদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খুব বেশিসংখ্যক জনপ্রতিনিধি সক্রিয় নন বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিটি এলাকার জনপ্রতিনিধি তার এলাকার জনগণকে ঘরে রাখতে উৎসাহ দেবেন। প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।

খেটে খাওয়া মানুষের বিষয়ে তৌহিদুল হক বলেন, তাদের তো ঘরে আটকে রাখা যাবে না, যদি খাবারের নিশ্চয়তা না দেওয়া হয়। তাদের খাদ্যের চাহিদা নিশ্চিত করার পরই ঘরে থাকতে চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে। অন্যথা তা হবে খুবই অমানবিক।

advertisement