advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সাধারণ চিকিৎসা মিলছে না

দুলাল হোসেন
১ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ এপ্রিল ২০২০ ০৯:৩১
advertisement

করোনাভীতির প্রভাব ভয়াবহভাবে পড়েছে চিকিৎসা ক্ষেত্রে। স্বাভাবিক সময়ে যেসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক রোগীতে ঠাসা থাকত সেগুলো এখন রোগীশূন্য। চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ডাক্তার ও নার্সরা আতঙ্কিত দিনযাপন করছেন। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) অভাবে অনেক চিকিৎসক চিকিৎসা দিচ্ছেন না। করোনা ছাড়া বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, চিকিৎসাসেবা না পেয়ে তারাও হাসপাতাল ছাড়ছেন।

এ ছাড়া করোনা আতঙ্কে জটিল রোগী ছাড়া হাসপাতালে যাচ্ছেন না কেউই। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন। হাসপাতালে দায়িত্ব পালনরত অনেক চিকিৎসক রোগী দেখতে ভয় পাচ্ছেন। এ অবস্থায় দেশে চিকিৎসাসেবায় বেহালদশা বিরাজ করছে।

জানা গেছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা কমেছে। আগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আউটডোরে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার রোগী যেত। এখন ২০০ থেকে ২৫০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে যাচ্ছেন। একই অবস্থা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে।

রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা অনেক কমেছে। অনেকে হাসপাতালে গিয়ে করোনায় সংক্রমিত হতে পারেন এমন ভয়ে যাচ্ছেন না। আবার অনেকে চিকিৎসা পাবেন না এমন ভেবে হাসপাতালে যাচ্ছেন না। সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে যারা যাচ্ছেন তারাও সঠিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। করোনা ভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গের সঙ্গে মিল থাকলে বিশেষ করে সর্দি, জ্বর, হাঁচি, কাশি, গলাব্যথায় আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহেতামুলক হক চৌধুরী বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের শুরুর দিকে সর্দি, জ্বর, হাঁচি, কাশি, গলাব্যথায় আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে হয়তো একটু বিশৃঙ্খলা ছিল, এখন নেই। এখন রোগী গেলে সেবা পাচ্ছেন।

তবে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেও পারে। সারা দেশের চিকিৎসকরা রোগীর সেবা দেওয়ার কাজ করছেন। পাশাপাশি রোগীরা যেন চিকিৎসাসেবা পান সে জন্য বিভিন্ন হাসপাতাল, চিকিৎসক সংগঠন, হাসপাতাল টেলিমেডিসিন সেবা শুরু করেছেন। চিকিৎসাসেবা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। মানুষের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়–য়া বলেন, করোনার সংক্রমণ রোধে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম কিছুটা সীমিত করা হয়েছে। আমাদের বৈকালিক বিশেষজ্ঞ চেম্বার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা ছাড়া জরুরি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। করোনার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্দি, জ্বর, হাঁচি, কাশির রোগী অর্থাৎ যাদের মধ্যে করোনার উপসর্গ আছে তাদের জন্য আলাদা সেন্টার চালু করা হয়েছে। আজ বুধবার থেকে করেনা ভাইরাস শনাক্তে পিসিআর টেস্ট শুরু করা হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের হাসপাতালে সকাল ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বহির্বিভাগের দেখা হয়। এখানে গতকাল মঙ্গলবার ২২৩ জন রোগী এসেছেন। আগে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০০ রোগী আসতেন। রোগীর সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। সর্দি, জ্বর, হাঁচি, কাশির রোগী সাধারণত মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা দেখে থাকেন। ওই বিভাগে প্রতিদিন রোগী মাত্র ১৫-২০ জন। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে মানুষ হাসপাতালে আসতে চায় না।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেছেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী কমেছে। অনেকে সংক্রমণের ভয়ে আসছেন না। চিকিৎসকরাও করোনার বিষয়ে একটু ভয় পাচ্ছেন। কারণ করোনা ভাইরাস সংক্রমিত থাকলেও রোগীরা তথ্য গোপন করছেন। কিছু দিন আগে বিদেশ থেকে আসা দুজন রোগী তথ্য গোপন করে আমাদের এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন।

পরে ওই রোগীর করোনা শনাক্ত হওয়ায় পর কয়েকজন চিকিৎসক-নার্সকে কোয়ারেন্টিনে পাঠাতে হয়েছে। অন্য হাসপাতালের চিকিৎসকরাও বিষয়টি জানার পর ভয়ে করোনার লক্ষণ-উপসর্গ রোগী দেখতে যেতে চাইতেন না। এ সময় সবদিকে খেয়াল করা দরকার। তারা যদি তথ্য গোপন করে তাতে চিকিৎসকরা আক্রান্ত হবেন। এতে সমস্যা আরও বাড়বে।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গ হচ্ছে সর্দি, জ্বর, হাঁচি, কাশি, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট। মৌসুম ফ্লুর কারণেও মানুষের সর্দি, জ্বর, হাঁচি, কাশি ও গলাব্যথা হয়ে থাকে। মৌসুম ফ্লু-এর রোগব্যাধিতে মানুষ আগের তুলনায় একটু বেশি হচ্ছে। মৌসুম ফ্লু’র সঙ্গে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গে মিল থাকায় অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। ফলে আক্রান্তদের অনেকে ভয়ে ছুটছেন হাসপাতাল কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎকের প্রাইভেট চেম্বারে। কিন্তু প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন তারা সবাই সেবা পাচ্ছেন না। চিকিৎসাসেবা পেতে অনেকেই নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীরদের অভিযোগ, করোনা সংক্রমণের ভয়ে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর নেই বলে অনেক চিকিৎসক রোগী দেখছেন না। সর্দি, জ্বর, হাঁচি, কাশি থাকা রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারও বন্ধ রয়েছে।

রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা চৌধুরী দীপ বলেন, আমাদের হাসপাতালে সব বিভাগ চালু আছে। আউটডোর সেবা চালু আছে। তবে বিকালে কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাদের প্রাইভেট চেম্বার করছেন না। কেউ চেম্বারের সময় কমিয়ে এনেছেন। এখানে সব ধরনের রোগীর সেবা দেওয়া হয়ে থাকে। যদি কারও সর্দি, কাশি, জ্বর বা গলাব্যথা থাকে আমাদের এখানে তাদের স্ক্রিনিং করছি। যদি স্ক্রিনিং করার পর কারও লক্ষণ-উপসর্গ দেখে করোনার রোগী হিসেবে সন্দেহ করা হয়, তখন তাকে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি। আমরা কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দিচ্ছি না।

এদিকে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে ভোগান্তি, সংক্রমণের ভয় ও প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ থাকায় মানুষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হটলাইনে ফোন করে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। আবার সরকারি-বেসরকারি অনেকে হাসপাতাল ইতোমধ্যে টেলিমেডিসিন সেবা চালু করেছে। মানুষ বাধ্য হয়ে টেলিমেডিসিন সেবায় ঝুঁঁকছেন। তবে করোনার সংক্রমণের আতঙ্কে যারা ভুগছেন তারা পরীক্ষার জন্য আইইডিসিআরের হটলাইনে অনেক চেষ্টা করেও সংযুক্ত হতে পারছেন না। আর যারা পারছেন তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজনের পরীক্ষা করে বাকিদের বাড়িতে আলাদা থাকার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব সারছে আইইডিসিআর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হাসপাতাল বা প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা না পেয়ে অথবা চিকিৎসা পাবেন এমন চিন্তা থেকে ফোন করে চিকিৎসাসেবা নেওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্তরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠনের ফোনে কল করে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে স্বাস্থ্য বাতায়ন নম্বরে ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে ৬৭৭১৯ জন, ৩৩৩ নম্বরে ১৪৭১ জন, আইইডিসিআরের নম্বরে ২৫০৯ জনসহ মোট ৭১৬৯৯ জন ফোনে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ৭৬৬৬০ জন ফোনে চিকিৎসা নিয়েছেন।

মগবাজারের এক বাসিন্দা জানান, তিনি রাজধানীর ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক শিশু বিশেষজ্ঞ তার সন্তানকে নিয়মিত দেখেন। কিন্তু হঠাৎ করে ওই চিকিৎকের চেম্বার বন্ধ। উপায়ন্তর না দেখে তিনি রাজধানীর আরও কয়েকটি জায়গায় চেষ্টা করেও বিশেষজ্ঞের খোঁজ পাননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম সারির বেশ কয়েকজন শিশু বিশেষজ্ঞ রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় প্রাইভেট চেম্বারে বসেন। করোনার সংক্রমণের পর থেকে কিছুদিন ধরে তাদের চেম্বার বন্ধ। ফলে অনেক পিতা-মাতার শিশুসন্তান অসুস্থ হলে বেশ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এ চিত্র শুধু ধানমন্ডি এলাকায় নয়, রাজধানী ও রাজধানীর বাইরের জেলায়গুলোয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাদের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ রেখেছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ থাকার বিষয়টি নজরে পড়েছে সরকারের। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সোমবার আইইডিসিআরের লাইভ ব্রিফিংয়ে যুক্ত হয়ে বলেন, আমরা জেনেছি অনেক চিকিৎসক প্রাইভেট চেম্বারে বসছেন না। যে রোগী প্রাইভেট চেম্বারে যেতেন তারা এখন চিকিৎসক পাচ্ছেন না। এতে চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। আমি চিকিৎসকদের প্রতি অনুরোধ করব, আপনার ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিয়ে প্রাইভেট চেম্বার করবেন।

গতকাল মঙ্গলবার আইইডিসিআরের লাইভ ব্রিফিংয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ রয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা জানতে পেরেছি অনেক চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ। এতে রোগীর সমস্যা হচ্ছে। আপনারা প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখেন। প্রয়োজনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিয়ে যান।

advertisement