advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এক মহান নেতার অপরূপ ছেলেবেলা ও পৃথিবী দেখার চোখ

ড. আতিউর রহমান
১ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ এপ্রিল ২০২০ ০০:৪৩
advertisement

মনোবিদরা বলেন, মানুষ বড় হয়ে কী হবে তার নজির ছেলেবেলাতেই স্থাপন করেন। ফ্রয়েড, ইয়ঙ, কারেন হার্নিসহ অনেক বিখ্যাত মনোবিদই এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। তারা মনে করেন, মানুষের ব্যক্তিত্বের মূল ভিত্তি তার জন্মের প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যায়। আমরাও আমাদের জীবনের পেছন দিকে ফিরে তাকালে খেয়াল করব ছেলেবেলার কথাই আমাদের সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। সেই ছোটবেলায় পৃথিবী দেখার চোখ যেভাবে খুলেছিল তাই হয়েছে আমাদের ভবিষ্যতের পাথেয়। মায়াভরা সে চোখই আমাদের মনে শুভশক্তির উন্মেষ ঘটায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির স্থপতি। তিনি যে হঠাৎ করেই মহান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তা কিন্তু নয়। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, তিনি যে একদিন বড় কিছু হয়ে উঠবেন তার কিছু দৃষ্টান্ত ছোটবেলাতেই স্থাপন করেছিলেন। সাধারণ একটি পরিবারের সন্তান হয়েও ঠিক অন্য আর আট-দশজন সাধারণ ছেলের মতো ছিলেন না তিনি। কেমন ছিল তার ছেলেবেলা? জানা যাক তার কন্যা শেখ হাসিনার এক লেখা থেকে ‘আমার আব্বার শৈশব কেটেছিল টুঙ্গিপাড়ার নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে, মেঠোপথের ধুলোবালি মেখে। বর্ষার কাদাপানিতে ভিজে। বাবুই পাখি বাসা কেমন করে গড়ে তোলে, মাছরাঙা কীভাবে ডুব দিয়ে মাছ ধরে, কোথায় দোয়েল পাখির বাসা, দোয়েল পাখির সুমধুর সুর আমার আব্বাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করত। আর তাই গ্রামের ছোট ছোট ছেলেকে সঙ্গে করে মাঠে-ঘাটে ঘুরে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে বেড়াতে তার ভালো লাগত। ছোট্ট শালিক পাখির ছানা, ময়না পাখির ছানা ধরে তাদের কথা বলা ও শিস দেওয়া শেখাতেন। বানর ও কুকুর পুষতেন, তারা তার কথামতো যা বলতেন তাই করত।’ (শেখ হাসিনা, শেখ মুজিব আমার পিতা, আগামী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-২৬)

শেখ মুজিবুর রহমানও তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি খেলাধুলাও করতাম। ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলতাম। খুব ভালো খেলোয়াড় ছিলাম না, তবুও স্কুলের টিমের মধ্যে ভালো অবস্থান ছিল। এ সময় আমার রাজনীতির খেয়াল তত ছিল না।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল, পৃষ্ঠা ১০)

খেলাধুলা, পাখি ধরা, মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো সত্ত্বেও তিনি সে সময় বাড়িতে খুব পড়াশোনাও করতেন। বিশেষ করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা তিনি নিয়মিতই পড়তেন। বাড়িতে বাবা খবরের কাগজ রাখতেন। আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত। এসবই সে সময়ের জনপ্রিয় পত্রিকা। সে সময়ের শিক্ষিত পরিবারমাত্রই এসব পত্রিকা বাড়িতে রাখতেন। ছোটবেলা থেকে এসব পত্রিকার সঙ্গে পরিচয় থাকার কারণে ছোট্ট মুজিবের সামনে বিশাল পৃথিবীর এক অপরূপ দরজা খুলে গিয়েছিল।

শুধু খেলাধুলা, পড়াশোনা, প্রকৃতির সান্নিধ্যই নয়, ছোটবেলায় তার গভীর এক মানবিক বোধেরও পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। যা তাকে অন্যদের চেয়ে সহজেই আলাদা করে দেয়। সেই ছোটবেলায় তিনি কী করে এতখানি মানবিক হৃদয়ের অধিকারী হলেন সেটা নিঃসন্দেহে একটা আশ্চর্য ব্যাপার। শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘তিনি ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত হৃদয়বান ছিলেন। তখনকার দিনে ছেলেদের পড়াশোনার তেমন সুযোগ ছিল না। অনেকে বিভিন্ন বাড়িতে জায়গির থেকে পড়াশোনা করত। চার-পাঁচ মাইল পথ হেঁটে স্কুলে আসতে হতো। সকালে ভাত খেয়ে স্কুলে আসত। আর সারাদিন অভুক্ত অবস্থায় অনেক দূরে হেঁটে তাদের ফিরতে হতো। যেহেতু আমাদের বাড়িটা ছিল ব্যাংকপাড়ায়, আব্বা তাদের বাড়িতে নিয়ে আসতেন। স্কুল থেকে ফিরে দুধ-ভাত খাবার অভ্যাস ছিল এবং সবাইকে নিয়েই তিনি খাবার খেতেন। দাদির কাছে শুনেছি আব্বার জন্য মাসে কয়েকটি ছাতা কিনতে হতো। কারণ আর কিছুই নয়, কোন ছেলে গরিব, ছাতা কিনতে পারে না, দূরের পথ, রোদ বা বৃষ্টিতে কষ্ট হবে দেখে তাকে ছাতা দিয়ে দিতেন। এমনকি পড়ার বইও মাঝে মাঝে দিয়ে আসতেন।

দাদির কাছে গল্প শুনেছি, যখন ছুটির সময় হতো তখন দাদি আমগাছের নিচে এসে দাঁড়াতেন। খোকা আসবে দূর থেকে রাস্তার ওপর নজর রাখতেন। একদিন দেখেন তার খোকা গায়ের চাদর জড়িয়ে হেঁটে আসছে, পরনের পাজামা-পাঞ্জাবি নেই। কী ব্যাপার? এক গরিব ছেলেকে তার শতছিন্ন কাপড়ে দেখে সব দিয়ে এসেছেন।’ (শেখ মুজিব আমার পিতা, ২৮)

তিনি যে দরিদ্র মানুষের বিপন্নতায় বিচলিত হতেন তার প্রমাণ মেলে ছোটবেলার আরেকটি ঘটনায়। ‘একবার তার গ্রামের চাষিদের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকদের জীবনে নেমে আসে অভাব-অনটন। অনেক বাড়িতেই দুবেলা ভাত রান্না বন্ধ হয়ে যায়। চাষিদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা। তাদের সন্তানরা অভুক্ত। সারা গ্রামেই প্রায়-দুর্ভিক্ষাবস্থা নিয়ে চাপা গুঞ্জন। কিশোর মুজিব এ রকম পরিস্থিতিতে দুঃখভারাক্রান্ত। কিন্তু কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। একটা কিছু করার জন্য তিনি ছটফট করছিলেন। সে সময় যে পথটি তার সামনে খোলা ছিল, তিনি তাই করলেন। নিজের পিতাকে তিনি তাদের গোলা থেকে বিপন্ন কৃষকদের মধ্যে ধান বিতরণের জন্য অনুরোধ জানালেন। তাদের নিজেদের ধানের মজুদ কেমন, এই অনুরোধ তার বাবা রাখতে পারবেন কিনা, সেসব তিনি ভাবেননি। কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখার চিন্তাটিই ছিল তখন তার কাছে মুখ্য।’ (ঙনধুফঁষ ঐধয়, ইধহমধনধহফযঁ ঝযবরশয গঁলরন : অ খবধফবৎ রিঃয ধ উরভভবৎবহপব, জধফরপধষ অংরধ চঁনষরপধঃরড়হ, ১৯৯৬ ২হফ বফরঃরড়হ, ঢ়. ১৩)

সাধারণের জন্য এই কল্যাণচিন্তা তার গোটা রাজনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে। সুযোগ পেলেই তিনি ছুটে গেছেন কৃষকের কাছে, শ্রমিকের কাছে। তাদের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ দিতেন সবাইকে। সময় পেলেই কথা বলতেন ব্যক্তিগত কর্মচারী এবং নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে। তারা যে বেতন পায়, তাই দিয়ে তাদের সংসার চলে কিনা, এ রকম প্রশ্ন তিনি তাদের প্রতিনিয়তই করতেন এবং সাধ্যমতো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেন। তার মানবিক গুণাবলি এই ক্ষুদ্র পরিসরে বলে শেষ করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ ইতিহাসবেত্তারা নিশ্চয়ই এসব গুণাবলি আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন।

গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বাড়িতে গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করা হলো আবদুল হামিদ এমএসসিকে। মুজিবের মানসলোক গঠনে এই শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য। মুজিবের ভাষ্যতেই জানা যাক সেই মাস্টার সাহেবের কথা, “মাস্টার সাহেব গোপালগঞ্জে একটা ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ গঠন করেন, যার দ্বারা গরিব ছেলেদের সাহায্য করতেন। মুষ্টি ভিক্ষার চাল উঠাতেন সব মুসলমান বাড়ি থেকে। প্রত্যেক রবিবার আমরা থলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে চাল উঠিয়ে আনতাম এবং এই চাল বিক্রি করে তিনি গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষা ও অন্যান্য খরচ দিতেন। ঘুরে ঘুরে জায়গিরও ঠিক করে দিতেন। আমাকেই অনেক কাজ করতে হতো তার সঙ্গে। হঠাৎ যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তখন আমি এই সেবা সমিতির ভার নিই এবং অনেক দিন পরিচালনা করি।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-৯)

তিনি ছিলেন ওই সমিতির সাধারণ সম্পাদক। আরেকজন শিক্ষক সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তী জীবনে যে মুজিব আর্তমানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাতেই বোঝা যায়, ছেলেবেলার এ ঘটনা তার জীবনে কতখানি প্রভাব ফেলেছিল। শুধু মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ করা নয়, মুসলিম সেবা সমিতিতে কাজের অভিজ্ঞতা তার সাংগঠনিক দক্ষতাও বাড়িয়েছিল। সমাজসেবায় আত্মনিয়োগের কারণেই তিনি আজীবন সংলগ্ন হতে পেরেছিলেন মাটি ও মানুষের। সাধারণ মানুষের দুঃখ-বঞ্চনা অনুভবের দীক্ষা তিনি ছোটবেলাতেই পেয়েছিলেন। বদিউজ্জামান চৌধুরী রচিত ‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ বই থেকে জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ছোটবেলায় শেখা একটি কবিতার দুটি লাইন প্রায়ই আওড়াতেন :

‘আমার বাংলার মাটি

তোমায় আমি রাখব পরিপাটি’

সত্যি জীবন দিয়েই তিনি বাংলার মাটিকে পরিপাটি রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জীবনটি আমরা জানি। নেতা হিসেবে, জাতির স্থপতি হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, সেদিকেই বেশিরভাগ মানুষের আগ্রহ। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যদি তার ছেলেবেলাটিও আরও গভীরভাবে আবিষ্কার করতে পারি তা হলে এই শিশুটি কীভাবে এবং কেন একদিন এমন মহান মানুষ হয়ে ওঠেন সেটিও আবিষ্কার করতে পারব। বহুমাত্রিক নান্দনিক এক ব্যক্তিত্বের দ্যুতি তার ছেলেবেলাতেই লক্ষ করা যায়। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লেই বোঝা যায় এক ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব বিকাশের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে গ্রামবাংলায় বেড়ে ওঠা এক দেবশিশুর চলনে-বলনে। তিনি ছিলেন এক চিরশিশু, চিরকিশোর। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার ‘আমার দেখা নয়াচীন’। সেখানেও তার শিশুমানসের সাক্ষ্য বহন করে। তিনি যেন এক শিশুর চোখে নতুন একটি দেশ ভ্রমণ করছেন। মজার ব্যাপার সেখানে গিয়েও তিনি শিশুদের সঙ্গে শিশুর মতোই মিশছেন। রাস্তায় একদল শিশু-কিশোরকে খেলা করতে দেখে তাদের ভেংচি কাটলেন। শিশুরা তাকে খেলার সাথীর মতোই গ্রহণ করে নিল। (চলবে)

ড. আতিউর রহমান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement