advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অর্থের জোগান হবে যেভাবে

হারুন-অর-রশিদ
৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২০ ০৮:৩৪
advertisement

নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় প্রায় ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্প মালিকদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল আগেই গঠন করা হয়। নতুন করে ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং ২০ হাজার কোটি টাকার দুটি বড় প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এই অর্থের পুরোটাই জোগান দিতে হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রপ্তানিকারীদের জন্য আরেকটি তহবিল এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বাড়ানো হয়েছে। এসব প্যাকেজ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খুব শিগগির পৃথক নীতিমালা জারি করা হবে। তবে ব্যাংকের ঋণদানের সক্ষমতা ও ক্ষতিগ্রস্ত পর্যায়ে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

গতকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন চারটি প্যাকেজে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টর, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ সুবিধা, এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) সুবিধা বৃদ্ধি এবং প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম চালুর ঘোষণা দেন।

চলতি মূলধনের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দিতে ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ প্যাকেজ করা হবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং মাঝারি শিল্পে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের আরেকটি ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ করা হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে সংশ্লিষ্ট শিল্প ও ব্যবসা

প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ঋণ দেবে। এ ঋণে সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। এর মধ্যে অর্ধেক, অর্থাৎ ৪ দশমিক ৫ শতাংশ পরিশোধ করবে ঋণগ্রহীতা শিল্প/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাকি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সরকার ভর্ভুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে। এসএমই খাতে সরকার সুদ ভর্তুকি দেবে ৫ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই অর্থ পুরোটাই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ হিসেবে বিতরণ করবে। সুদ বাবদ কিছু অর্থ ভর্তুকি দেবে সরকার। এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় ব্যাংকগুলোর ঋণদানের সক্ষমতা। অর্থের টানাটানির কারণে প্রায় বছরদেড়েক ধরে ঋণ বিতরণ কমছে। গত ফেব্রুয়ারিতে এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে কম হয়েছে ঋণ বৃদ্ধির হার। ১ এপ্রিল থেকে নয়-ছয় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে এসএমই খাতে ঋণ বিতরণ করা নিয়ে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া আমানতের বিপরীতে সুদহার কম থাকায় আমানত বাড়ছে না। চলমান সংকটের কারণে আমানত বাড়ার পরিবর্তে কমার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংকট প্রকট হতে পারে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ব্যাংকগুলোর কাছে লাখ কোটি টাকারও বেশি অলস তারল্য রয়েছে, যা বিভিন্ন বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করা আছে। তাই সহসাই অর্থ সংকট হবে না, সংকট হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা দেবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা জানান, প্যাকেজ দুটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তার জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন করা হবে। ওই নীতিমালায়, কাদের কীভাবে ঋণ দেওয়া হবে, আদায়ের পদ্ধতি বলা থাকবে। ৫০ হাজার কোটি প্যাকেজের জন্য পৃথক কোনো তহবিল করা হবে না। ব্যাংকগুলো স্বাভাবিক ঋণের মতো ঋণ দেবে। তবে এ জন্য ব্যাংকের অর্থ সংকট হলে নীতিসহায়তা দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো যেন চাহিদামাফিক ঋণ দিতে পারে এ জন্য নীতিগত পরিবর্তন বা সংশোধন দরকার হলে সেটিও করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের কারণে সংকট রয়েছে। প্রায় ৫৭ হাজার কোটি পুনঃতফসিল করার পরও খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯৭ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। করোনার কারণে জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত সময় ঋণ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ছাড়ও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একদিকে অর্থ আদায় কমে যাওয়া এবং আমানত কমে গেলে অর্থ সংকট তীব্র হবে। এ পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফরাহ মো. নাছের বলেন, এই টাকা ব্যাংকগুলো নিজেরাই দেবে। এ জন্য সার্কুলার জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো কোনো অসুবিধায় পড়লে তা বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দেওয়া হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোকে আগেই কিছু নীতিসহায়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ব্যাংকের সক্ষমতা কিছুটা বাড়িয়েই তাকে ঋণ দিতে বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে নজর রাখতে হবে অর্থের অপচয় যেন না হয়। এ জন্য নিয়মশৃঙ্খলা পরিচালনে কেন্দ্রীয় বাংককে কঠোর হতে হবে। এই অর্থ যেন অন্যকাজে ব্যবহৃত হয়ে নতুন করে খেলাপির সংকট সৃষ্টি না করে। শ্রমিকের বেতন দেওয়ার নামে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে তা যেন অপব্যবহার না করা হয়। বিদেশে শ্রমিকদের সরাসরি সরকার বেতন প্রদান করছে। এখানে যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যথাযথ সহযোগিতা পান সেটিও দেখতে হবে।

ইডিএফ সুবিধা বৃদ্ধি : ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি সুবিধা বাড়াতে ইডিএফের বর্তমান আকার ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। ফলে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ইডিএফ তহবিলে যুক্ত হবে। ইডিএফের বর্তমান সুদের হার লাইবর + ১ দশমিক ৫ শতাংশ (যা প্রকৃতপক্ষে ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ) থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ সরকারি আদেশ পাওয়ার পর সার্কুলার জারি করবে।

প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম : এই নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন তহবিল চালু করবে, যেখান থেকে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে। এই তহবিল থেকে পণ্য রপ্তানি আদেশ পাওয়া থেকে শুরু করে পণ্য বিদেশে পাঠিয়ে অর্থ না পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ঋণ পাবেন উদ্যোক্তারা। এই টাকা দিয়ে শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য খরচ মেটানো যাবে। আগেই আরেকটি ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল করা হয়েছে। আগেরটি মাত্র তিন মাসের বেতন দেওয়ার জন্য। পরেরটি দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন দেওয়ার জন্য। সব মিলিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ পাবেন রপ্তানিকারকরা।

 

advertisement
Evaly
advertisement