advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঢাকার ২৯ স্থানে করোনা শনাক্ত
সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি পাঁচ এলাকায়

দুলাল হোসেন
৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২০ ১৮:২২
advertisement

দেশে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) রোগী বেড়েছে দ্বিগুণ। নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৮ জন। এর আগে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯ রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছেÑ দেশের যেসব অঞ্চল থেকে করোনা
ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে ক্লাস্টার বা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল রয়েছে পাঁচটি। সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকায় এসব এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আর আইইডিসিআর বলছেÑ নিয়মকানুন না মানলে পুরো দেশেই ছড়িয়ে পড়তে পারে করোনার সংক্রমণ।
জানা গেছে, দেশের ১১টি জেলায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছেÑ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, গাজীপুর, শরীয়তপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রংপুর, গাইবান্ধা ও চুয়াডাঙ্গা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটেছে ঢাকায়, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা। তবে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে গত ৮ মার্চ, মাদারীপুরে। এর পর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে শনাক্ত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি বিদেশ ফেরত ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীতে স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল রবিবার সকাল পর্যন্ত দেশে ৮৮ রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৫৬ জন ও মহিলা ৩২ জন। এদের মধ্যে ঢাকার ৫৪, নারায়ণগঞ্জের ১১, মাদারীপুরের ১১, গাইবান্ধার ৫ রোগী। এ ছাড়া গাজীপুর, শরীয়তপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রংপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার একজন করে কোভিড-১৯ রোগী রয়েছেন।
আইইডিসিআরের তথ্যমতে, রাজধানীতে দুটি ক্লাস্টার অঞ্চল রয়েছেÑ বাসাবো ও মিরপুরের টোলারবাগ। এর মধ্যে বাসাবোতে ৯ এবং টোলারবাগে পাওয়া গেছে ৬ রোগী। আর সোয়ারীঘাটে ৩ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরা, বসুন্ধরা, ধানম-ি, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর-১০, মোহাম্মদপুর, শাহ আলীবাগ ও পুরানা পল্টন এলাকায় দুইজন করে এবং আশকোনা, বুয়েট, সেন্ট্রাল রোড, ইস্কাটন, গুলশান, গ্রিনরোড, হাজারীবাগ, ঝিগাতলা, কাজীপাড়া, মিরপুর-১১, লালবাগ, মগবাজার, মহাখালী, নিকুঞ্জ, রামপুরা, শাহবাগ, উর্দু রোড ও ওয়ারী এলাকায় রোগী শনাক্ত হয়েছে একজন করে।
আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে। আমরা অনেক জায়গা থেকেই রোগী পাচ্ছি। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন যেগুলো আছে, সেগুলো ক্লাস্টার ভিত্তিতে আছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে আমাদের অবশ্যই জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। তা না হলে ক্লাস্টার ভিত্তিতে যে সংক্রমণ রয়েছে, সেটি পুরো জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া পাঁচটি ক্লাস্টার এরিয়া চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর দুটিÑ মিরপুর ও বাসাবো। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাইবান্ধায় রয়েছে একটি করে। আমরা এসব ক্লাস্টার অঞ্চলের দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখছি।’ ডা. আবুল কালাম আরও বলেন, ‘আমরা জানি না গ্রামের ভেতরে কী হচ্ছে। আমরা কি অবাধে চলাচল করছি, আমরা হাটবাজারে যাচ্ছি, আমরা কি আগের মতোই স¦াভাবিকভাবে চলাফেরা করছিÑ এ বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। এ মুহূর্তে আমরা জানি না যিনি নিজেকে সুস্থ মনে করছেন, তার মধ্যে ভাইরাস আছে কিনা। কাজেই প্রত্যেকেই নিজেকে রক্ষা করবেন। কারও মধ্যে সংক্রমণ থাকলে তিনি যেন না ছড়ান। আমরা উপজেলা পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছি। এখন উপজেলা থেকে যদি বেশি বেশি নমুনা সংগ্রহ করা যায়, তা হলে সেগুলো ল্যাবে পাঠাতে পারব। আমাদের জানা দরকার বাংলাদেশের পরিস্থিতি কী। আমরা তা কিছুটা জানতে পারছি। চেষ্টা করছি সারাদেশে পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দিতে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলছি; কীভাবে দ্রুত সময়ে উপজেলা বা প্রান্তিক পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছি। আমরা যেন একসঙ্গে অনেক মানুষের পরীক্ষা করতে পারি।’
ডিজি বলেন, ‘আমরা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম তারা সেটি ভালোভাবে বুঝতে পারেনি। তাদের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। তারা তথ্য দিতে পারছে না। এ জন্য গতকাল তাদের আবারও প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমরা তাদের নির্দেশনা দিয়েছি তারা যেন পরীক্ষার হার বাড়িয়ে দেয়। বিকল্প কোনো পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা যায় কিনা, পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের যে বুথ আছে সেগুলো বাড়ানো যায় কিনাÑ এ বিষয় নিয়ে কাজ করছি। আমরা অল্প সময়ে পরীক্ষার হার বাড়িয়ে দিতে পারব এবং বিকল্প পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করতে পারব। অনেক মানুষের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কোনো পদ্ধতি বিশ্বে তৈরি হয়ে থাকলে আমরা সেটি বাংলাদেশে এনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। সারাবিশ্বের পরীক্ষা-নিরীক্ষার যে ধরনের খবরই আমরা পাচ্ছি, দেশে সেটি দ্রুত সময়ে চালুর চেষ্টা করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি এ সমস্যা (করোনা) দীর্ঘদিন থাকে, তা হলে এ পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করব, সে বিষয়ে নিজেদের প্রস্তুত করছি। তবে এটি মোকাবিলায় সরকার থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে দায়িত্ব বেশি। সারাদেশের মানুষ যদি নিয়মকানুন না মানেন, যদি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করেন, যার যার ভূমিকা পালন না করেনÑ তা হলে শুধু আমাদের প্রস্তুতি দিয়ে এ ভাইরাস মোকবিলা করা যাবে না। আইন প্রয়োগ করে বা সবসময় কঠোরতা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় না। সবাই যদি নিয়ম মানেন, নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করেন, তা হলেই কেবল এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারব।’
এদিকে গতকাল মিরপুরে দুজন এবং বাসাবোতে সাতজনের দেহে করোনা শনাক্ত হওয়ায় এ দুই এলাকার ১০টি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে। বাড়িগুলোর বাসিন্দাদের বাড়ির বাইরে যেতে এবং বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। সর্বশেষ হিসাবে নতুন নয়জনসহ এ পর্যন্ত ২২ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মিরপুরে এ পর্যন্ত মারা গেছেন তিনজন।
সবুজবাগ থানার ওসি মাহবুব আলম আমাদের সময়কে বলেন, ‘বাসাবোতে এ পর্যন্ত নয়জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে। আইইডিসিআরের পরামর্শ নিয়ে এ এলাকার নয়টি বাড়ি লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। বাড়িগুলো পিস গার্ডেন নামে একটি ছোট্ট হাউজিংয়ের মধ্যে পড়েছে। লকডাউন করে দেওয়ার পর ওই বাড়িগুলোর আশপাশে সাধারণ মানুষের কোনো আনাগোনা নেই। অনেকটা ভুতুড়ে গলিতে পরিণত হয়েছে। বাড়িগুলো থেকে কেউ বাইরে বের হতে পারবেন না। এমনকি বাইরে থেকে ভেতরে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তাদের যে কোনো প্রয়োজনে আমরা সবসময় পাশে আছি। আমি আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে বলেছিÑ যে কোনো প্রয়োজনে আমাকে যেন নক করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করব।’ ওসি আরও বলেন, ‘বাড়িগুলোর বাসিন্দাদের বলা হয়েছেÑ শুধু পুলিশ নয়, তাদের আত্মীয়স্বজনকেও ফোন করে প্রয়োজনের কথা বলতে পারবে। স্বজনরা চাইলে পুলিশের সহায়তা নিয়ে সে চাহিদা মেটাতে পারবেন।’
মিরপুর থানার ওসি মোস্তাজিরুর রহমান আমাদের সময়কে জানান, মিরপুর-১ নম্বর ওভারব্রিজের পাশে তানিম গলিতে এক পরিবারের দুজনের দেহে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গতকাল সকালে বাসা থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে তাদেরকে। এ ঘটনার পর একটি ভবন লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই দুজন দুদিন ধরে জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। পরীক্ষায় তাদের করোনা শনাক্ত হয়। বাড়িগুলোর সামনে পুলিশ মোতায়েন করে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এলাকায় মাইকিং করে জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে। ওই সব বাড়িতে কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না পুলিশ। তবে বিশেষ প্রয়োজনে প্রতি পরিবার থেকে একজন সুরক্ষিত পোশাকে বাইরে যেতে পারছেন।
এদিকে গত শুক্রবার মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি বাড়িতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এক বৃদ্ধের (৬৮) মৃত্যু হয়। পরদিন ওই বাড়িসহ তিনটি ছয়তলা ভবন লকডাউন করে পাহারা বসায় পুলিশ। এর আগে ২১ ও ২২ মার্চ মিরপুরের টোলারবাগে করোনা ভাইরাসে সংক্রমণ হয়ে দুজন মারা যাওয়ার পর ওই এলাকাকে কার্যত লকডাউন করা হয়।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক আহমদুল হাসান আসিক

advertisement