advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনাজয়ী এক চিকিৎসকের গল্প

আফরিন আপ্পি
৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২০ ১৬:১৪
advertisement

সুনসান চারপাশ। যাপিত জীবন আপাতস্বাভাবিক মনে হলেও কার্যত স্থবির; থমকে গেছে। এমন অচলাবস্থা এখন দেশ হতে দেশ দেশান্তরে তথা পুরো বিশ্বে। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক, মৃত্যুর ভয়। এই বুঝি করোনা ভাইরাস কেড়ে নিল প্রাণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিদিনই এ ঘাতক কেড়ে নিচ্ছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ। অকোষী এ ভাইরাসের ভয়ে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি সবাই। শুধু তা-ই নয়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে সেই মৃতের স্বজনরাও হয়ে যাচ্ছেন তার পর। বাবার লাশ হাসপাতালে ফেলে রেখে সন্তানের পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। অতিচেনা, অতিপ্রিয় মানুষও হয়ে যাচ্ছেন অচেনা কেউ, অপ্রিয় কেউ।

এমনই এক প্রতিকূল সময়েও রাত-দিন অসুস্থ রোগীদের পাশে থেকে সেবা দিচ্ছন অকুতোভয় চিকিৎসকরা। নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার ব্রত পালনের যুদ্ধে অবতীর্ণ তারা; মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও হাসিমুখে করে চলেছেন সব। তেমনই একজন আবু ফয়সাল মো. জাহাঙ্গীর আলম।

মানুষের সেবা করাই যেন প্রাণচাঞ্চল্যের প্রাচুর্যপূর্ণ ৩৫ বছর বয়সী তরুণ এ চিকিৎসকের নেশা। সাদা অ্যাপ্রনটা যেদিন প্রথম গায়ে জড়িয়েছিলেন সেদিন থেকেই মহান এ পেশায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, পুরোটা। করোনায় আক্রান্ত রোগীর সেবা দিতে গিয়ে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে তিনি নিজেও আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু দৃঢ় মনোবল আর ধৈর্যশক্তির বদৌলতে করোনার মরণছোবলের পরও বেঁচে আছেন আত্মপ্রত্যয়ী এ চিকিৎসক। কীভাবে? গেই গল্পে যাওয়া যাক-

দিনটি ছিল ১৮ মার্চ। ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের সিনিয়র ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ফয়সাল অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও সকাল থেকেই রোগী দেখছিলেন। হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা এক রোগীর চিকিৎসা দিয়েছিলেন সেদিন। পরদিন সেই রোগীর রক্তের নমুনায় করোনার উপস্থিতি পাওয়া যায়। পরে ২১ মার্চ ভোরে মারা যান আক্রান্ত ওই ব্যক্তি।

এর মাঝে দুদিন কেটে যায়। পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন ফয়সাল। দুদিন পর জ্বর আসে তার। সাথে সাথে যোগাযোগ করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাথে। রক্তের নমুনা সংগ্রহের পর রাতেই আইইডিসিআর থেকে জানানো হয় ফয়সালের শরীরে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের উপস্থিতির কথা।

মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন ফয়সাল। সে জন্য বিন্দুমাত্র ভেঙে না পড়ে ভাবতে থাকেন বাসায় থাকা চিকিৎসক স্ত্রী সামিহা শারমিন মুনিয়া ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে। অবশ্য রক্তের নমুনা পরীক্ষার আগে থেকেই সতর্কতাবশত স্ত্রী-সন্তান থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছিলেন তিনি।

আক্রান্তের সংবাদ পাওয়ার পর আইসোলেশানে বাসায়ই ছিলেন ফয়সাল। বিষয়টি খুব স্বাভাবিকভাবে নিলেও বুঝতে পারেননি ঠিক কী অপেক্ষা করছে তার জন্য। প্রাণঘাতী করোনা পরদিনই ফয়সালকে দেখা দেয় স্বরূপে।

সন্ধ্যায় জ্বরের সাথে শুরু হয় তীব্র শ্বাসকষ্ট। যোগাযোগ করেন আইইডিসিআরে। রাত ১০টার দিকে আইইডিআরের অ্যাম্বুলেন্সে করে ফয়সালকে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরার কুয়েত-মৈত্রী বাংলাদেশ হাসপাতালে।

অ্যাম্বুলেন্সে যাওয়ার সময় যে তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়েছিল সে কথা মনে হলে এখনো শিউরে ওঠেন তরুণ এ চিকিৎসক। ফয়সালের ভাষায়- ‘সে সময় মনে হয়েছিল আমি মারা যাচ্ছি। সেই কষ্টটা ব্যাখ্যা করার কোনো ভাষা নেই। শ্বাসকষ্টের রোগীদের যে কী ভীষণ কষ্ট সেদিন উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।’

হাসপাতালের তৃতীয় তলায় সে রাতে একাই ছিলেন ফয়সাল। নেবুলাইজার আর অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয় সারারাত।

পরদিন সকাল থেকে শুরু হয় ডায়রিয়া। সেই সাথে থেমে থেমে জ্বর; সর্দি-কাশি আর বমি। কখনো জ্বর বেড়ে ১০৩ কখনোবা আবার কমে ১০০। সপ্তাহখানেক এমন যাওয়ার পর একটু একটু করে সুস্থ হতে শুরু করেন তিনি। কমতে থাকে ওষুধের মাত্রাও। ঠিকমতো ওষুধ, নিয়ম মেনে খাওয়া ও মানসিক শক্তির বলে এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ান ফয়সাল।

একাকীত্বের কষ্টটাও ভীষণভাবে উপলব্ধি করেন সে সময়। বেশিরভাগ সময় কাটান স্বজনদের সাথে মুঠোফোনে কথা বলে। আর তিন বছরের ছোট্ট মেয়ে যুমায়মাহ খান যাসীনের সাথে ভিডিও কলে কথা বলে। দীর্ঘ্দিন বাবার স্পর্শ ও আদরবঞ্চিত ছোট্ট যাসীনের শুধু একটাই প্রশ্ন- ‘বাবা তুমি কবে আসবা?’ বাবাও মেয়েকে বলে চলেছেন, ‘এই তো মা; দুদিন পরই চলে আসব।’

দুদিন করতে করতে এরই মাঝে কেটে গেছে ১৫ দিন। এখন ফয়সাল পুরোপুরি সুস্থ। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র মিললেই ফিরে যাবেন মেয়ের কাছে।

সমাজবিচ্ছিন্ন থেকে দীর্ঘ এ সময়টায় কীভাবে মানসিকভাবে এতটা দৃঢ় থাকলেন- এ প্রশ্নের উত্তরে আমাদের সময়কে ফয়সাল বলেন, ‘বই পড়ে, প্রার্থনা করে, সবার সাথে মুঠোফোনে কথা বলে আর সুন্দর সুন্দর চিন্তা করেই কেটেছে সময়। তবে একা থাকাটা মানসিকভাবে ভীষণ কষ্টের।’

করোনা আক্রান্তদের উদ্দেশে এ চিকিৎসক বলেন, ‘একটুও ভয় পাওয়া যাবে না। ভয় পেলেই শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। আর তখনই মৃত্যুর শঙ্কা বেড়ে যায়। এটা যেহেতু একটা কঠিন সময়, তাই ভেঙে না পড়ে দৃঢ় মনোবল দিয়ে এর মোকাবিলা করতে হবে।’

ফয়সাল বলেন, এ ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে মানুষের সংস্পর্র্শ এড়িয়ে চলার কোনো বিকল্প নেই। শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেই চলবে না, সেই সাথে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাটাও জরুরি। এ ছাড়া শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এ ধরনের খাবার বেশি বেশি খেতে হবে এবং সেই সাথে প্রতিদিন শরীর চর্চার জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করতে হবে।

মহামারির চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহান প্রদেশে প্রথম শনাক্ত হয়। রবিবার পর্যন্ত সারাবিশ্বে ১২ লাখের ওপরে মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৬৪ হাজারের বেশি। আক্রান্তদের সেবা দিতে গিয়ে মারা গেছেন প্রায় একশ চিকিৎসক।

advertisement